সরকারি আবাসন পরিদপ্তরের পক্ষ থেকে হঠাৎ একদিন খবর এল যে তারা ফ্ল্যাট পরিদর্শনে যাচ্ছেন। এই সংবাদটি শোনার পর আমার ভাড়াটে যতটা আতঙ্কিত হয়ে পড়ল, তার চেয়ে অনেক বেশি অবাক হলাম আমি নিজে।

আসলে সরকারি ফ্ল্যাট বরাদ্দ পাওয়ার পর থেকেই আমি পুরো বিষয়টিকে একটু আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখতে শুরু করি। সরকারি আবাসন পরিদপ্তর হয়তো মনে করেছে তারা আমাকে থাকার একটি জায়গা দিচ্ছে। কিন্তু আমি ভেবেছি, তারা আমাকে আসলে একটি দারুণ সুযোগ করে দিয়েছে। তারা আমাকে দিয়েছে ফ্ল্যাট, আর আমি সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে পেয়েছি একজন ভাড়াটে। দুই পক্ষের মধ্যে এই বোঝাপড়া বেশ চমৎকারভাবেই চলছিল।

সরকারি ফ্ল্যাটটি কাগজে-কলমে আমার নামেই বরাদ্দ; তবে আমি সেখানে বাস করি না। সেখানে থাকেন অন্য একজন ব্যক্তি। এখন এতে দোষের কী থাকতে পারে? ফ্ল্যাট কি আর কোনো রক্ত-মাংসের মানুষ যে তাকে প্রতিদিন দেখতে হবে? বরং আমি সেখানে না থাকায় ফ্ল্যাটটি একা পড়ে নেই, বরং একজন মানুষকে আশ্রয় দিতে পারছে। আমার দৃষ্টিতে এটি এক ধরনের সামাজিক দায়িত্ব পালন মাত্র!

আমার এক বন্ধু এই অদ্ভুত বিষয়টি শুনে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “ফ্ল্যাটটা তোমার নামে, থাকো না কেন?”

আমি তাকে উত্তর দিলাম, “ফ্ল্যাটটার বরাদ্দ আমার নামে, থাকার দায়িত্বটা অন্যের।”

বন্ধুটি অবাক হয়ে জানতে চাইল, “মানে?”

আমি বুঝিয়ে বললাম, “মানে, সরকারি চাকরিতে দায়িত্ব ভাগ করে নিতে হয়। অফিসের কাজ যেমন সহকর্মীরা ভাগ করে করি, ফ্ল্যাটে থাকাটাও একজনকে দায়িত্ব দিয়েছি।”

বন্ধু তখন প্রশ্ন করল, “কিন্তু ভাড়াটা?”

আমি আত্মবিশ্বাসের সাথে বললাম, “ওটা আমার দায়িত্ব। দায়িত্বের বিনিময়ে কিছু সম্মানী তো থাকতেই পারে!”

আমার এই অভিনব আবাসন-দর্শন বুঝতে সম্ভবত তার আরও কিছুদিন সময় লাগবে, তাই সে আর কথা বাড়াল না।

সরকারি আবাসন পরিদপ্তর হয়তো ভেবেছিল তারা আমাকে থাকার জায়গা দেবে, কিন্তু আমি সেটিকে একটি ব্যবসায়িক সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করেছি। তারা দিয়েছে ফ্ল্যাট, আমি পেয়েছি ভাড়াটে। দুই পক্ষের মধ্যে এই সমঝোতা বেশ ভালোই চলছিল। কিন্তু হঠাৎ একদিন শুনলাম, সরকারি আবাসন পরিদপ্তরের লোকজন নাকি ফ্ল্যাট পরিদর্শনে যাচ্ছেন। খবরটা শুনে আমার ভাড়াটে যতটা ভয় পেল, আমি তার চেয়ে বেশি অবাক হলাম। পরিদর্শকেরা ফ্ল্যাট দেখতে আসবেন, সেটা ভালো কথা; কিন্তু ফ্ল্যাটে আমি থাকি না বলে এত অস্বস্তির কি আছে? আমি তো ফ্ল্যাটটাকে অবহেলা করিনি; বরং নিয়মিত ভাড়া দিয়ে সচল রেখেছি।

আমি জানতে পেরেছি, পরিদর্শকেরা সম্ভবত জানতে চাইবেন যে বরাদ্দ প্রাপক কোথায়? প্রশ্নটা শুনে আমার মনে হলো, এ কেমন প্রশ্ন! বরাদ্দ প্রাপককে কেনই বা ফ্ল্যাটে থাকতে হবে? বরাদ্দ প্রাপক তো বরাদ্দ পেয়েছেন। থাকা আর বরাদ্দ পাওয়া কি একই বিষয়?

সরকারি ফ্ল্যাটের বরাদ্দপত্রে নিশ্চয়ই কোথাও লেখা নেই যে— “বরাদ্দ পাওয়ার পর প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে নিজের ফ্ল্যাটে উপস্থিতি দিতে হবে!” তা ছাড়া আমার নামেই ফ্ল্যাট, আমার নামেই বিদ্যুৎ বিল এবং আমার নামেই বরাদ্দের সব কাগজ। এতকিছুর পরও আমাকে সেখানে শারীরিকভাবে উপস্থিত থাকতে হবে, এটা তো চরম বাড়াবাড়ি!

আমি শুনেছি, রাজধানীতে সরকারি বাসার সংখ্যা ১৯ হাজার ৯১টি। এতগুলো বাসার সব কটিতেই যদি বরাদ্দ প্রাপক নিজে থাকতেন, তবে ভাড়াটেদের কী হতো? তাঁদেরও তো মাথা গোঁজার ঠাঁই দরকার। আমি অন্তত একজনের আবাসনের সমস্যা সমাধান করে দিয়েছি। আমার মনে হয়, রাষ্ট্রের উচিত আমাকে ধন্যবাদ দেওয়া, নোটিশ দেওয়া নয়!

আমার একটি প্রস্তাব আছে, ভবিষ্যতে সরকারি ফ্ল্যাট বরাদ্দের সঙ্গে দুটি আলাদা কাগজ দেওয়া হোক। একটিতে থাকবে বরাদ্দ প্রাপকের নাম এবং অন্যটিতে থাকবে প্রকৃত বাসিন্দার নাম। আর যদি সেখানে ভাড়াটে থাকে, তবে তৃতীয় কাগজে লেখা থাকবে, ‘সরকারি ফ্ল্যাটের বেসরকারি ব্যবস্থাপক’। তাহলে আর কোনো বিভ্রান্তি থাকবে না।

তবে পরিদর্শনের খবর আসার পর আমি আমার ভাড়াটেকে বলেছি আপাতত একটু সতর্ক থাকতে। কেউ যদি বরাদ্দ প্রাপকের খোঁজ করে, তবে সে বলবে যে তিনি বাইরে গেছেন। আর কত দিনের জন্য বাইরে গেছেন তা জিজ্ঞাসা করলে সে বলবে, “সরকারি চাকরিতে বদলির কোনো ঠিক নেই!”

ভাড়াটে অবশ্য কৌতূহলী হয়ে জানতে চেয়েছে, “স্যার, আপনি কি কখনো এখানে উঠবেন?”

আমি তাকে আশ্বস্ত করে বলেছি, “অবশ্যই। সরকারি নির্দেশনা তো অমান্য করা যায় না। তবে তার আগে একটু দেখে নিই, ভাড়াটে সরানোর নির্দেশনাটা কতটা স্থায়ী হয়!”

বন্ধু আবারও সতর্ক করে বলল, “তোমার তো বরাদ্দ বাতিল হয়ে যেতে পারে!”

আমি উত্তরে বললাম, “তা হলে কী আর করা! ফ্ল্যাটটা চলে যাবে; কিন্তু অভিজ্ঞতা তো থাকবে। সরকারি ফ্ল্যাটে না থেকেও সরকারি ফ্ল্যাটের সুবিধা ভোগ করার অভিজ্ঞতা সবার হয় না।”

তবে একটি বিষয় আমি বুঝতে পারছি না। সরকারি ফ্ল্যাটে থাকতে হলে যদি বরাদ্দ প্রাপককেই থাকতে হয়, তবে বরাদ্দ দেওয়ার সময়ই তাঁকে একবার দেখে নেওয়া উচিত নয়? ফ্ল্যাটের চাবি দেওয়ার আগে অন্তত জিজ্ঞাসা করা যেতে পারে, “আপনি এখানে থাকবেন তো, নাকি শুধু নাম রাখবেন?”

আমি আবারও প্রস্তাব করছি, ভবিষ্যতে সরকারি ফ্ল্যাট বরাদ্দের সঙ্গে দুটি কাগজ দেওয়া হোক। একটিতে থাকবে বরাদ্দ প্রাপকের নাম, অন্যটিতে প্রকৃত বাসিন্দার নাম। আর ভাড়াটে থাকলে তৃতীয় কাগজে লেখা থাকবে, ‘সরকারি ফ্ল্যাটের বেসরকারি ব্যবস্থাপক’। তাতে আর কোনো বিভ্রান্তি থাকবে না।

কারণ, সরকারি ফ্ল্যাটের ব্যাপারে আমার এখন একটাই নীতি—ফ্ল্যাট বরাদ্দ আমার, বাসিন্দা অন্য জন; শুধু ভাড়া যেন ভুল করে অন্য কারও কাছে না যায়!