নিজের বাড়িতে ফিরতে না পারলে মানুষ কোথায় আশ্রয় খোঁজে? আফগান চলচ্চিত্র নির্মাতা শাহরভানু সাদাতের কাছে সেই আশ্রয় তাঁর নিজের শরীর। অন্যদিকে নির্বাসিত ইরানি নির্মাতা মোহাম্মদ রাসুলোফের কাছে বড় হয়ে উঠেছে ভাষার সংকট। মাতৃভাষার সূক্ষ্ম অনুভূতি অন্য ভাষায় কতটা প্রকাশ করা সম্ভব? বাস্তুচ্যুতির এই দুই অভিজ্ঞতা উঠে এসেছে তাঁদের নির্মিত দুটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রে।

গত ৩০ অক্টোবর ৩৯তম টোকিও আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের হিউলিক হলে ডিসপ্লেসমেন্ট ফিল্ম ফান্ডের (ডিএফএফ) সহায়তায় নির্মিত পাঁচটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের জাপান প্রিমিয়ার অনুষ্ঠিত হয়। প্রদর্শনী শেষে আলোচনায় অংশ নেন তহবিলের সহপ্রতিষ্ঠাতা অস্ট্রেলীয় অভিনেত্রী কেট ব্ল্যানশেট, ‘সেন্স অব ওয়াটার’-এর পরিচালক মোহাম্মদ রাসুলোফ ও ‘সুপার আফগান জিম’-এর পরিচালক শাহরভানু সাদাত। বিশেষ অতিথি ছিলেন জাপানি অভিনেতা কোজি ইয়াকুশো। ২৬ অক্টোবর শুরু হওয়া উৎসবের এই আয়োজনে গুরুত্ব পায় বাস্তুচ্যুত নির্মাতাদের কাজের সুযোগ ও স্বাধীনভাবে গল্প বলার অধিকার।

প্রদর্শিত পাঁচটি চলচ্চিত্র হলো মারিনা এর গরবাচের ‘রোটেশন’, শাহরভানু সাদাতের ‘সুপার আফগান জিম’, হাসান কাট্টানের ‘অ্যালাইজ ইন এক্সাইল’, মো হারাওয়ের ‘হুইসপার্স অব আ বার্নিং সেন্ট’ এবং মোহাম্মদ রাসুলোফের ‘সেন্স অব ওয়াটার’।

একই দিন টোকিও মিডটাউন হিবিয়া হলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ব্ল্যানশেট ও দুই নির্মাতার সঙ্গে ছিলেন রটারডাম আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্লেয়ার স্টুয়ার্ট এবং ইউনিক্লোর মূল প্রতিষ্ঠান ফাস্ট রিটেইলিংয়ের পরিচালক ও সিনিয়র এক্সিকিউটিভ অফিসার কোজি ইয়ানাই।

যেভাবে শুরু চলচ্চিত্র তহবিলডিসপ্লেসমেন্ট ফিল্ম ফান্ডের ভাবনা আসে কয়েক বছর আগে গ্লোবাল রিফিউজি ফোরামে। সেখানে দেশ ছাড়তে বাধ্য হওয়া কয়েকজন চলচ্চিত্র নির্মাতার কাজ সম্পর্কে জানতে পারেন ব্ল্যানশেট। তাঁদের আবার চলচ্চিত্র নির্মাণের সুযোগ করে দিতেই উদ্যোগটি নেন তিনি। পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ বেশি এবং সীমাবদ্ধতা তুলনামূলক কম হওয়ায় প্রথমে স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রকে বেছে নেওয়া হয়।২০২৫ সালে ব্ল্যানশেট ও রটারডাম আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের হুবার্ট বালস ফান্ড যৌথভাবে অনুদান কর্মসূচি ঘোষণা করে। ওই বছরের ৫৪তম রটারডাম উৎসবে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় ডিএফএফের। কৌশলগত অংশীদার হয় জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর। ব্ল্যানশেট এক দশকের বেশি সময় ধরে সংস্থাটির শুভেচ্ছাদূত হিসেবে কাজ করছেন।

প্রতিষ্ঠাতা অংশীদার হিসেবে যুক্ত হয় মাস্টার মাইন্ড, ইউনিক্লো, ড্রোম এন দাদ, টেমার ফ্যামিলি ফাউন্ডেশন ও আমাহোরো কোয়ালিশন। ইউনিক্লো তহবিলটির প্রচারণায়ও সহযোগিতা করছে।

প্রথম পর্যায়ে ২০২৫ সালে অনুদান পান পাঁচ নির্মাতা—মারিনা এর গরবাচ, মো হারাওয়ে, হাসান কাট্টান, মোহাম্মদ রাসুলোফ ও শাহরভানু সাদাত। তাঁদের চলচ্চিত্রগুলোর বিশ্ব প্রিমিয়ার হয় ২০২৬ সালের রটারডাম উৎসবে।দ্বিতীয় পর্যায়ে এ বছরের কান চলচ্চিত্র উৎসবে নতুন পাঁচ নির্মাতার নাম ঘোষণা করা হয়। তাঁরা হলেন মোহাম্মদ আমের, আনেমারি জাসির, আকুয়ল দে মাবিয়র, বাও নগুয়েন ও রিথি পান।

নির্বাসনে ভাষা, নিজের শরীরে আশ্রয়ইরানি নির্মাতা মোহাম্মদ রাসুলোফের কাছে অভিবাসন নতুন মানুষ ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ। কিন্তু নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে দেশ ছাড়তে হলে সেই অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। নির্বাসনের বিচ্ছিন্নতাবোধ থেকেই তিনি নির্মাণ করেছেন ‘সেন্স অব ওয়াটার’।সংবাদ সম্মেলনে রাসুলোফ জানান, তিন বছর আগে তাঁকে ইরান ছেড়ে নির্বাসনে যেতে হয়। বিদেশে বসবাস শুরুর প্রায় দেড় বছর পর ডিএফএফ তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করে।দেশ ছাড়ার পর ভাষার গুরুত্ব নতুন করে উপলব্ধি করেন তিনি। তাঁর মতে, ভাষা ও সংস্কৃতি শুধু বক্তব্যের অর্থ নয়, অনুভূতির গভীরতাও বহন করে। অনুবাদে মাতৃভাষার সূক্ষ্মতা হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তাঁকে ভাবিয়েছে। সেই অভিজ্ঞতাই চলচ্চিত্রে তুলে ধরেছেন।

আফগান নির্মাতা শাহরভানু সাদাতের ‘সুপার আফগান জিম’ তৈরি হয়েছে অন্য এক উপলব্ধি থেকে। শরণার্থী জীবনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমার মতো যার ফেরার কোনো ঘর নেই, তার কাছে আমার আসল ঘর ছিল আমার নিজের শরীর।’ইরানে জন্ম নেওয়া সাদাত পরে আফগানিস্তানে ফিরে যান। কিন্তু প্রতিকূল পরিস্থিতিতে আবার দেশ ছাড়তে হয় তাঁকে। আশ্রয় নেন জার্মানিতে।সাদাত জানান, আফগানিস্তানসহ বিভিন্ন জায়গায় লিঙ্গবৈষম্য ও পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার কারণে নারী হিসেবে নিজের ওপর আস্থা রাখতে পারেননি। ১৯ বা ২০ বছর বয়সে ফ্রান্সে গিয়ে নারীদের মাথা উঁচু করে হাঁটতে দেখে তাঁর ভাবনায় পরিবর্তন আসে।নিজের শরীরে স্বাচ্ছন্দ্য ফিরে পাওয়া এবং নিজের মধ্যে আশ্রয় খোঁজার অভিজ্ঞতাই ‘সুপার আফগান জিম’-এর বিষয়। সাদাতের মতে, এটি শুধু তাঁর ব্যক্তিগত গল্প নয়; আফগানিস্তানসহ বিশ্বের বহু নারীর অভিজ্ঞতার সঙ্গেও মিলে যায়। নিজের জায়গা হারানো মানুষের অনুভূতি তুলে ধরতে চান তিনি।পর্দায় যুদ্ধের ক্ষত ও মানুষের সহনশীলতাআলোচনায় জাপানি অভিনেতা কোজি ইয়াকুশো পরেছিলেন ইউনিক্লোর দাতব্য প্রকল্প ‘পিস ফর অল’-এর টি-শার্ট। তিনি জানান, এই প্রকল্পের টি-শার্ট বিক্রির অর্থ শরণার্থী সহায়তায় ব্যয় হবে।রাসুলোফের ‘সেন্স অব ওয়াটার’ সম্পর্কে ইয়াকুশো বলেন, ছবিটির শান্ত বর্ণনায় ভালোবাসা, যন্ত্রণা ও প্রধান চরিত্রের গভীর মানসিক ক্ষত ফুটে উঠেছে।পাঁচটি চলচ্চিত্রের মধ্যে সাদাতের কাজটি বিশেষ ভারসাম্য এনেছে বলেও মনে করেন তিনি। দীর্ঘ যুদ্ধের ক্ষত বহন করা কাবুলে মানুষের স্বাস্থ্য নিয়ে সংগ্রামের দৃশ্য তাঁকে মনে করিয়ে দিয়েছে মানুষের সহনশীলতার কথা।

ইয়াকুশোর মন্তব্যের পর তাঁর সঙ্গে আবার কাজ করার ইচ্ছা জানান ব্ল্যানশেট।টোকিওর আগে চলচ্চিত্রগুলো সাও পাওলো ও লন্ডনের আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয়েছে বলে জানান ব্ল্যানশেট। সংবাদ সম্মেলনে তিনি রটারডাম, সান সেবাস্তিয়ান ও এল গুনায় প্রদর্শনীর কথাও উল্লেখ করেন।বাস্তুচ্যুতিকে বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, যত বেশি সম্ভব দর্শকের কাছে চলচ্চিত্রগুলো পৌঁছানো প্রয়োজন।

গল্প বলার স্বাধীনতাই সবচেয়ে জরুরিব্ল্যানশেটের বক্তব্যে বারবার উঠে আসে বাস্তুচ্যুত মানুষের বহুমাত্রিক পরিচয়ের কথা। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতি ৬৭ জনের একজন বাস্তুচ্যুত। কিন্তু তাঁদের জীবন শুধু সংকটের গল্পে সীমাবদ্ধ নয়। প্রত্যেকের পেশা, ব্যক্তিগত জীবন, সম্পর্ক ও স্বপ্ন রয়েছে।কোজি ইয়ানাইয়ের সঙ্গে আলোচনায় চলচ্চিত্রগুলোকে মূলধারার দর্শকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেছেন বলে জানান ব্ল্যানশেট। এ কারণেই ডিএফএফের অনুদানপ্রাপ্ত নির্মাতাদের বিষয় নির্বাচনে পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে। তাঁদের চলচ্চিত্র যে শুধু বাস্তুচ্যুতি নিয়েই হতে হবে, এমন কোনো শর্ত নেই। নিজেদের অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধি থেকে অন্য গল্পও বলতে পারেন তাঁরা।আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির প্রসঙ্গও আসে সংবাদ সম্মেলনে। শরণার্থী পরিচালক ও প্রযোজকদের চলচ্চিত্র অস্কারে জমা দেওয়ার নিয়ম পরিবর্তন নিয়ে এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে ব্ল্যানশেট বলেন, বাস্তুচ্যুতির কারণে যাঁদের কর্মজীবন বাধাগ্রস্ত হয়েছে, তাঁদের কাজের স্বীকৃতি ছোট পদক্ষেপ মনে হলেও এর গভীর তাৎপর্য রয়েছে। যৌথ প্রযোজনা ও সাংস্কৃতিক কূটনীতির মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের সহযোগিতা আরও বাড়বে বলে আশা করেন তিনি।

দীর্ঘমেয়াদি সহায়তার ওপর গুরুত্ব দেন কোজি ইয়ানাই। তিনি জানান, ইউনিক্লো ২০ বছরের বেশি সময় ধরে শরণার্থীদের সহায়তা করছে। ডিএফএফের কাজের প্রচার ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিতেও সহযোগিতা অব্যাহত রাখতে চান তাঁরা। একাডেমির মতো আন্তর্জাতিক পরিসরে তহবিলটির কাজের স্বীকৃতি পাওয়ার উদ্যোগেও সমর্থন দিতে আগ্রহী তিনি।টোকিওতে পাঁচটি চলচ্চিত্রের এই প্রদর্শনী তাই শুধু বাস্তুচ্যুতির অভিজ্ঞতা তুলে ধরেনি, সামনে এনেছে ঘর হারানো মানুষের নিজের গল্প বলার অধিকারও। রাসুলোফ খুঁজেছেন মাতৃভাষার অনুভূতি ধরে রাখার পথ, সাদাত খুঁজেছেন নিজের শরীরে আশ্রয়। ডিএফএফ তাঁদের হারানো বাড়ি বা শহর ফিরিয়ে দিতে পারে না, কিন্তু চলচ্চিত্র নির্মাণের সুযোগ করে দেয়। সেই সুযোগেই নিজেদের গল্প বলার নতুন আশ্রয় খুঁজে পান বাস্তুচ্যুত নির্মাতারা।