চূড়ান্ত বিজয় ঘোষণা করার জন্য হয়তো এখনই সঠিক সময় নয়, তবে ভিক্টর অরবান, আলেকসান্দার ভুচিচ এবং ফ্লাভিও বলসোনারোর সাম্প্রতিক নির্বাচনী পরাজয়ের ঘটনাপ্রবাহ আমাকে গভীরভাবে ভাবতে বাধ্য করছে: ২০২৬ সালে কি তবে গণতন্ত্র ঘুরে দাঁড়িয়েছে?

এমনকি ইসরায়েলের রাজনৈতিক অঙ্গনেও পরিবর্তন দেখা গেছে। সেখানে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন জোট সংসদে তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছে এবং আরব দলগুলোর এক অভূতপূর্ব উত্থান লক্ষ্য করা গেছে। যদিও বিরোধীরা এখনো সরকার গঠন করতে সক্ষম না–ও হতে পারে, তবে তাদের পার্লামেন্টারি ব্লকটি এখন আয়তনে বড়।

এই পরিবর্তনের সূচনা হয়েছিল গত এপ্রিলে হাঙ্গেরির এক বিস্ময়কর নির্বাচনের মাধ্যমে। সব পূর্বাভাসকে ভুল প্রমাণ করে ইইউর সবচেয়ে শক্তভাবে গেড়ে বসা স্বৈরাচারী শাসক অরবানকে পরাজিত করেন তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী পিটার মাজিয়ার। দীর্ঘমেয়াদি ক্ষমতায় থাকাকালে অরবান তাঁর কর্তৃত্ববাদী শাসনকে সুসংহত ও স্থায়ী করতে সম্ভাব্য সবকিছুই করেছিলেন। তা সত্ত্বেও মাজিয়ার দলের চারপাশে একটি বৃহৎ নাগরিক আন্দোলন গড়ে ওঠে এবং শেষ পর্যন্ত তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করতে সক্ষম হয়।

একই ধরনের আনন্দ দেখা গিয়েছিল গত রবিবার রাতে বেলগ্রেডে। সেখানে সার্বিয়ায় ‘স্টুডেন্ট লিস্ট’ নামে ছাত্র, শিক্ষাবিদ এবং ক্ষুব্ধ নাগরিকদের একটি তৃণমূল জোট অপ্রত্যাশিতভাবে ভুচিচকে বিদায় করে দেয়। ২০১৪ সাল থেকে ভুচিচ ক্ষমতার ওপর শক্ত নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছিলেন—প্রথমে প্রধানমন্ত্রী এবং পরে রাষ্ট্রপতি হিসেবে। তিনি ডানপন্থী আস্ফালন, আর্থিক কেলেঙ্কারি এবং আইনের শাসনের প্রতি অবজ্ঞার একটি মিশেল ব্যবহার করেছিলেন। কিন্তু নাগরিকেরা ঠিক কতটা সহ্য করবে তারও একটি সীমা থাকে। ২০২৪ সালে নোভি সাদ ট্রেন স্টেশনের নতুন নির্মিত ছাদ ধসে ১৬ জন নিহত হওয়ার পর ভুচিচের ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে যায়; এই ঘটনাটি রাষ্ট্রীয় দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যাপক জনক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল।

এরপর গত সোমবার সকালে আসে সবচেয়ে বড় খবরটি—যখন লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা সব পূর্বাভাস উড়িয়ে দিয়ে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিজয়ী হিসেবে আবির্ভূত হন। প্রথম পর্বে ফ্লাভিও বলসোনারো এগিয়ে ছিলেন এবং প্রায় প্রতিটি জরিপ ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল যে তিনি রান-অফে জয়ী হবেন। কিন্তু লুলা সবাইকে অবাক করে দিয়ে চতুর্থবারের মতো লাতিন আমেরিকার বৃহত্তম অর্থনীতির দেশটির দায়িত্ব ছিনিয়ে নেন।

ভাষ্যকাররা বলছেন, লুলার এই বিজয় লাতিন আমেরিকাজুড়ে ডানপন্থী পপুলিস্টদের বিজয়ের ধারায় ছেদ টেনেছে। এটাও সত্য, তবে প্রেক্ষাপটকে আরও বড় করে দেখলে একটি ব্যাপক রূপরেখা ফুটে ওঠে। এটি মূলত বাম বনাম ডানের কোনো গল্প নয়, বরং এটি হলো ডেমোক্র্যাট বনাম পোস্ট–ডেমোক্র্যাটদের মধ্যকার লড়াই।

হাঙ্গেরির মাজিয়ার মোটেও বামপন্থী নন; তিনি একজন মধ্যডানপন্থী নেতা, যিনি একসময় অরবানের নিজস্ব দলের সদস্য ছিলেন। সার্বিয়ায় 'স্টুডেন্ট লিস্ট'-এর নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ইলিজা সর্দানোভিচ, একজন হৃদ্রোগ বিশেষজ্ঞ ও বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাপক, যাঁর কোনো স্পষ্ট রাজনৈতিক আদর্শিক পরিচয় নেই। যদিও উদারনৈতিক মূল্যবোধকে সমর্থন করেন, কসোভো ইস্যুতে তাঁর অবস্থান ঐতিহ্যবাহী সার্বিয়ান জাতীয়তাবাদের সঙ্গেই মেলে।

রাজনীতিতে নানা মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও মাজিয়ার, সর্দানোভিচ এবং লুলার মধ্যে যে মিল তা হচ্ছে —গণতান্ত্রিক খেলার নিয়মগুলোকে সম্মান জানানোর প্রতি তাদের বিশ্বাস। নির্বাচন অবশ্যই সুষ্ঠু হতে হবে, বিচারক এবং সাংবাদিকদের স্বাধীনভাবে কাজ করতে হবে। ক্ষমতার ভারসাম্যের একটা ব্যবস্থাও রাখতে হয়।

প্রেক্ষাপটকে আরও বড় করে দেখলে একটি ব্যাপক রূপরেখা ফুটে ওঠে। এটি মূলত বাম বনাম ডানের কোনো গল্প নয়, বরং এটি হলো ডেমোক্র্যাট বনাম পোস্ট–ডেমোক্র্যাটদের মধ্যকার লড়াই।

এর বিপরীতে পোস্ট-ডেমোক্র্যাটরা আইন ও আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলোকে কেবল পরামর্শ বা সুবিধাজনক পলিসি হিসেবে দেখে, যা থেকে তারা ইচ্ছামতো সুবিধা বেছে নিতে পারে। তারা ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য নির্বাচনকে ব্যবহার করে, কিন্তু অফিসে বসার পর তারা গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভেতর থেকে ফাঁপা করে ফেলে এবং তাদের ব্যক্তিগত ব্যবসার মুনাফা সর্বোচ্চ করে তোলে। বিরোধী কণ্ঠগুলোকে স্তব্ধ করতে হয় এবং সমালোচনামূলক গণমাধ্যমকে অভিযুক্ত করতে হয়। পোস্ট-ডেমোক্র্যাটরা গণতন্ত্রের কেবল বাইরের খোলসটুকুই টিকিয়ে রাখে।

কয়েক বছর ধরে এই পোস্ট-ডেমোক্র্যাটদের উত্থান ঘটছে এবং এটি অত্যন্ত আতঙ্কজনক। ২০০০ সাল থেকে আমরা প্রতিটি মহাদেশজুড়ে গণতান্ত্রিক অর্জনগুলোর একটি ধারাবাহিক ও সুপরিকল্পিত ধ্বংসযজ্ঞ দেখেছি। ভি-ডেম ইনস্টিটিউট প্রকাশিত সর্বশেষ আন্তর্জাতিক ‘ডেমোক্রেসি রিপোর্ট’ পড়লে যে কেউ হতাশ হয়ে পড়বেন। সার্বিক গণতান্ত্রিক স্বাস্থ্যের দিক থেকে রিপোর্টে বলা হয়েছে, আমরা কার্যকরভাবে ১৯৭৮ সালের স্তরে পিছিয়ে গেছি। বিশ্বের মাত্র ৭ শতাংশ মানুষ এখন উদার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বসবাস করে।

তবে বৈশ্বিক গণতান্ত্রিক পশ্চাদপসরণ সম্পর্কে বছরের পর বছর ধরে চলা উদ্বেগজনক সংবাদের পর বুদাপেস্ট, বেলগ্রেড এবং ব্রাসিলিয়ার এই খবরগুলো অন্ধকারের মাঝে আশার আলো দেখায়। ঠিক যেমনটা দেখা গেছে এই বছর ভারত ও ফিলিপাইন থেকে আলবেনিয়া, আর্জেন্টিনা এবং চিলি পর্যন্ত জেন-জিদের অভূতপূর্ব প্রতিবাদ সমাবেশে।

উদারপন্থী গণতন্ত্র কি তবে তার নতুন শক্তি ফিরে পাচ্ছে? স্বৈরাচারী ও কর্তৃত্ববাদী শাসকগোষ্ঠীকে পরাজিত করা কি শেষ পর্যন্ত সত্যিই সম্ভব? এটি কি একটি গণতান্ত্রিক পুনর্জাগরণের সূচনা হতে পারে, যা আগামী সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রেও প্রসারিত হতে পারে?

এদিকে চলতি সপ্তাহে ইসরায়েলে আরব ভোটারদের রাজনৈতিকভাবে অবৈধ প্রমাণের যে চেষ্টা চলেছে, তা আমাদের ব্যালট বাক্সের মাধ্যমে পরিবর্তনের সীমাবদ্ধতার কথা মনে করিয়ে দেয়। নির্বাচন আমাদের পোস্ট-ডেমোক্র্যাটদের কাছ থেকে মুক্তি পেতে সাহায্য করতে পারে, তবে গভীরভাবে বিভক্ত সমাজে নিছক একটি ভোটপ্রক্রিয়াই ক্ষত নিরাময়ের জন্য যথেষ্ট নয়। একক, নীরব ভোটদানের প্রক্রিয়াকে যৌথ আলাপ-আলোচনা ও চিন্তাভাবনার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পরিপূরক করতে হবে।

তা সত্ত্বেও বৈশ্বিক পরিসরে ২০২৬ সালটি সিকি শতাব্দীরও বেশি সময়ের মধ্যে গণতন্ত্রের জন্য সেরা বছর হিসেবে গণ্য হতে পারে। এটিই কি তবে সেই কাঙ্ক্ষিত টার্নিং পয়েন্ট?

সামনের বছরে ইউরোপের কিছু বৃহৎ সদস্যরাষ্ট্র—ফ্রান্স, স্পেন, জার্মানি এবং পোল্যান্ডের গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনের আগে এই ঘটনাগুলো আমাদের কী বার্তা দেয়, তা অনুমানের বিষয়। জার্মানিতে এএফডির গতি দেখলে বোঝা যায় যে পোস্ট-ডেমোক্রেটিক প্রবণতাযুক্ত ডানপন্থী পপুলিস্ট দলগুলো ইউরোপে এখনো বেশ দাপটের সঙ্গেই টিকে আছে। তবে হাঙ্গেরি, সার্বিয়া এবং ব্রাজিল আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা মনে করিয়ে দিয়েছে: স্বৈরাচারীদের উত্থান এবং ক্ষমতায় তাদের স্থায়িত্ব কোনো অলঙ্ঘনীয় প্রাকৃতিক নিয়ম নয়।

ডেভিড ভ্যান রেইব্রুক একজন বেলজিয়ান লেখক। এই লেখাটি দ্য গার্ডিয়ান থেকে সংক্ষেপে অনূদিত।