উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় এক বিষয়ে ফেল করার আশঙ্কায় মনে হয়েছিল, এই অল্প বয়সেই বুঝি জীবন শেষ হয়ে যাচ্ছে। মা–বাবার প্রত্যাশা, পরিবারের সম্মান আর প্রতিবেশীদের চোখে ছোট হয়ে যাওয়ার ভয় এমনভাবে চেপে বসেছিল যে জীবনের ছোট ছোট আনন্দও একসময় ম্লান হয়ে গিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত সেদিন সত্যিই ফেল করেছিলাম। কিন্তু জীবন থেমে থাকেনি। দুই দশক পর পেছনে ফিরে বুঝি, একটি পরীক্ষার ফল কখনোই মানুষের পুরো জীবনের মাপকাঠি হতে পারে না।

২০০৪ সালের সেপ্টেম্বরের শুরু থেকেই মাঝেমধ্যে পেটের ভেতরটা খামচে ধরত। আশঙ্কাটা অমূলক ছিল না। উচ্চমাধ্যমিকে পদার্থবিজ্ঞান দ্বিতীয় পত্রের পরীক্ষা শেষ হওয়ার পরই প্রায় নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিলাম, আলিফ লায়লার মতো কোনো দৈত্য-দানবের সাহায্য ছাড়া এবার পাস করা সম্ভব নয়।

দুই দশক আগে বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারগুলোতে পাবলিক পরীক্ষার ফল ছিল বিরাট এক বিষয়। পঞ্চম শ্রেণি থেকে শুরু করে প্রতিটি পরীক্ষার আগে-পরে শুনতে হতো, ‘এই পরীক্ষার ফলের ওপরই তোমার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে।’ তবে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা ঘিরে প্রত্যাশার পারদ থাকত সবচেয়ে ওপরে।

ফল প্রকাশের তারিখ ছিল ২৭ সেপ্টেম্বর। দিন যত ঘনিয়ে আসছিল, তত বাড়ছিল উদ্বেগ। রাতে ঘুম ভেঙে বাথরুমে গিয়ে পদার্থবিজ্ঞানের দুই পত্রের প্রশ্নপত্র মিলিয়ে দেখতাম। যোগ-বিয়োগ করে হিসাব করতাম। দিনের বেলাতেও চুপিচুপি একই কাজ করতাম। কিন্তু কোনোভাবেই দুই পত্র মিলিয়ে পাস নম্বরে পৌঁছাতে পারছিলাম না।

দুটি অঙ্কের সমাধান নিয়ে কিছুটা আশা ছিল, কিন্তু ফল মেলেনি। সেগুলোতে যদি পরীক্ষক দু-এক নম্বরও দেন! কিন্তু বিজ্ঞান তো আবেগ বোঝে না, সমাধান চায়। অঙ্কের ফল না মিললে নম্বর পাওয়ার আশাও কম।

তখন বয়স আমার ১৬। ওই বয়সেই মনে হচ্ছিল, জীবনের সবচেয়ে বড় বিপর্যয় বুঝি সামনে অপেক্ষা করছে।

দুই দশক আগে বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারগুলোতে পাবলিক পরীক্ষার ফল ছিল বিরাট এক বিষয়। পঞ্চম শ্রেণি থেকে শুরু করে প্রতিটি পরীক্ষার আগে-পরে শুনতে হতো, ‘এই পরীক্ষার ফলের ওপরই তোমার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে।’ তবে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা ঘিরে প্রত্যাশার পারদ থাকত সবচেয়ে ওপরে।

ফলাফল ভালো হলে ভালো কলেজ, ভালো বিশ্ববিদ্যালয়, তারপর ভালো চাকরি। আর ফল খারাপ হলে? সমাজের চোখে যেন সব শেষ। এই ফল থেকেই সমাজ সিদ্ধান্ত নিত, ওই কিশোর বা কিশোরী শিক্ষার্থী কি দেশ–রাষ্ট্র–সমাজের মুখ উজ্জ্বল করবে নাকি গোল্লায় যাবে!

ফল প্রকাশের তারিখ ছিল ২৭ সেপ্টেম্বর। দিন যত ঘনিয়ে আসছিল, তত বাড়ছিল উদ্বেগ। রাতে ঘুম ভেঙে বাথরুমে গিয়ে পদার্থবিজ্ঞানের দুই পত্রের প্রশ্নপত্র মিলিয়ে দেখতাম। যোগ-বিয়োগ করে হিসাব করতাম। দিনের বেলাতেও চুপিচুপি একই কাজ করতাম। কিন্তু কোনোভাবেই দুই পত্র মিলিয়ে পাস নম্বরে পৌঁছাতে পারছিলাম না।

নব্বইয়ের দশকে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা খুব ভালো ছিল না। মঙ্গার খবর প্রতিবছর সংবাদপত্রে প্রকাশিত হতো। নিম্নমধ্যবিত্ত ও দরিদ্র পরিবারের অনেক মা–বাবার কাছে শিক্ষিত সন্তানই ছিল দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসার সবচেয়ে বড় আশ্রয়। নিজেরা খেয়ে না খেয়ে, পুরোনো বা ছেঁড়া জামা পরে তাঁরা সন্তানদের পড়াশোনার খরচ জোগাতেন। বিনিময়ে সন্তানের কাছ থেকে প্রত্যাশা করতেন ভালো ফল।

আমার পরিবারেও এর ব্যতিক্রম ছিল না। আমার ওপরও ছিল দারিদ্র্যের গল্প, মা–বাবার স্বপ্ন আর প্রত্যাশার ভার। কিন্তু সেই আমিই কি না ফেল করতে যাচ্ছি!

নব্বইয়ের দশকে বেড়ে ওঠা আমার বয়সী অনেকের মতো পড়াশোনার মূল লক্ষ্য ছিল মা–বাবার স্বপ্ন পূরণ করা। নিজেরা কী চাইতাম, তা হয়তো কখনো ভেবেই দেখিনি। শুধু জানতাম, ভালো ফল করতে হবে, ভালো চাকরি পেতে হবে। চাকরির বেতন দিয়ে নিজের জীবন চালাতে হবে, পরিবারকে সাহায্য করতে হবে।

‘আমার জীবনের লক্ষ্য’ রচনায় যা-ই লিখি না কেন, জীবনের আসল লক্ষ্য ছিল মা–বাবাকে খুশি করা।

সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে মনে হতো, কোথাও পালিয়ে যেতে পারলে বাঁচতাম। শৈশবে একবার ঢাকা আসার পথে ফরিদগঞ্জ লঞ্চঘাটে হারিয়ে গিয়েছিলাম। ওই দিনগুলোতে বারবার মনে হতো, সেবার মা–বাবা যদি আমাকে আর খুঁজে না পেতেন, তাহলে হয়তো ভালোই হতো!

ভাবতাম, আশপাশের মানুষ কী বলবে? বাবা পরদিন অফিসে গিয়ে সহকর্মীদের কী বলবেন? মা প্রতিবেশীদের মুখোমুখি হবেন কীভাবে? পরিবারের মধ্যে প্রথম ফেল করা শিক্ষার্থী হতে যাচ্ছি আমি। আমার রাগী বাবার সামাজিক সম্মানও কি এতে ক্ষুণ্ন হবে না?

সে সময় পরীক্ষার ফল প্রকাশের দিন অনেক পরিবারে মিষ্টি বিতরণ করা হতো। ভালো ফলের আনন্দ ভাগাভাগি করতে আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীদের মিষ্টি খাওয়ানো হতো। আর মিষ্টি না গেলে সবাই বুঝে নিত, ওই বাড়ির ছেলে বা মেয়ের ফল ভালো হয়নি। ব্যর্থতার খবর যেন সবার জানা হয়ে যেত।

২৭ সেপ্টেম্বর যত এগিয়ে আসছিল, ততই অস্থির হয়ে উঠছিলাম। নামাজ শেষে দীর্ঘ সময় মোনাজাত করতাম। সিন্দাবাদ আর আলিফ লায়লার গল্প দেখে বড় হয়েছি। গল্পের চরিত্রগুলো কতবার যে বিপদ থেকে বেঁচে ফিরেছে! মনে হতো, কোনো দৈত্য-দানব কি আমাকে এবার বাঁচাতে পারবে না?

২৫ সেপ্টেম্বরের দিকে মাথায় আরও ভয়ংকর চিন্তা আসতে শুরু করে। আত্মহত্যা করার সাহস বা ইচ্ছা কোনোটাই ছিল না। মাঠে ক্রিকেট খেলা, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, প্রেমের অনুভূতি, শুক্রবারে মায়ের হাতের মাংস রান্না—জীবনের এসব ছোট ছোট আনন্দ আমার খুব প্রিয় ছিল।

আমাদের বাসার পাশ দিয়ে রেললাইন চলে গেছে। ঘণ্টায় ঘণ্টায় ট্রেন যেত। একসময় মনে হয়েছিল, কোনোভাবে ট্রেনের আঘাতে গুরুতর আহত হলে হয়তো সবাই পরীক্ষার ফলের কথা ভুলে যাবে। আহত আমাকে নিয়েই ব্যস্ত থাকবে। কিন্তু সেই চিন্তার মধ্যেও ভয় ছিল। আজ এত বছর পর ভাবলে শিউরে উঠি, মাত্র ১৬ বছর বয়সে একটি পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ার আশঙ্কা আমাকে কতটা অসহায় করে তুলেছিল।

ফল প্রকাশ হলো ২৭ সেপ্টেম্বর। আশঙ্কাই সত্যি হলো। এক বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছি।

ফল জানার পর প্রথমেই মা–বাবার মুখ মনে পড়ল। বাসায় ফিরব কীভাবে? পরীক্ষায় ফেল করার চেয়েও বেশি কষ্ট হচ্ছিল এই ভেবে যে আমার কারণে সবাইকে সামাজিকভাবে বিব্রত হতে হবে। নিজেকে তখন পরিবারের জন্য বোঝা মনে হচ্ছিল।

বন্ধু জিটু সেদিন আমাকে বাসায় পৌঁছে দিয়েছিল। পরে আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একই বিভাগের সহপাঠী ছিলাম। সেদিন আমার কান্না না থামা পর্যন্ত সে বাসায় ছিল। জিটুও মেধাবী ছাত্র ছিল, তবে তার ফলও প্রত্যাশা অনুযায়ী হয়নি।

বাসায় ফিরে দেখলাম, কেউ কোনো কথা বলছেন না। পুরো বাড়িতে নেমে এসেছে অদ্ভুত নীরবতা। দুই কক্ষের সেই বাসায় আমরা ছয়জন থাকতাম। সেদিন রাতে কিছু না খেয়েই ঘরের এক কোণে গুটিসুটি মেরে শুয়ে পড়েছিলাম।

ফল প্রকাশের পর কয়েক দিন নিজেকে গৃহবন্দী করে রাখলাম। কিন্তু তাতেও রেহাই ছিল না। প্রতিবেশীরা দেখতে আসতেন। তাঁদের কেউ কেউ সহানুভূতি দেখিয়েছেন, আবার কারও কারও কথায় কষ্ট আরও বেড়েছে।

এক প্রতিবেশী এসে মা–বাবাকে পরামর্শ দিয়েছিলেন, ‘ওরে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলায়া পিটান, দেখবেন ঠিক হয়ে যাবে।’

আবার কম বয়সী কয়েকজন স্বজনের কথাও মনে আছে। পাঁচ-ছয় বছরের দুটি শিশু অন্য ঘরে দাঁড়িয়ে একজন আরেকজনকে বলছিল, ‘ভাইয়া ফেল করছে, ওই রুমে যাইস না।’

কথাগুলো হয়তো তারা না বুঝেই বলেছিল। কিন্তু আমার কাছে মনে হয়েছিল, ফেল করার সঙ্গে সঙ্গে আমি যেন সমাজের একেবারে নিচের শ্রেণিতে নেমে গেছি। বাসার সবাই টেলিভিশন দেখছেন, সেখানে গিয়ে দুই মিনিট বসলে কেউ বলে উঠতেন, ‘ফেল করছে! আবার টিভি দেখে!’

এক সপ্তাহ পর যখন বাসা থেকে বের হলাম, মনে হচ্ছিল, রাস্তার দুই পাশের সব মানুষের চোখ আমার দিকে। সবাই যেন আমাকে দেখে হাসছে। হয়তো বাস্তবে কেউ তাকাচ্ছিলও না। কিন্তু নিজের ভেতরে এমন এক লজ্জা ও হীনম্মন্যতা তৈরি হয়েছিল, যা থেকে বের হতে পারছিলাম না।

আজ এত বছর পর পেছনে ফিরে তাকালে বুঝি, সেই সময়ের সবচেয়ে বড় সংকট ছিল পরীক্ষায় ফেল করা নয়; বরং ফেল করার পর কী হবে, সেই ভয়। পরিবার, আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীরা কী বলবেন, সমাজে মুখ দেখাব কীভাবে—এসব ভাবনা একটি পরীক্ষার ফলকে আমার কাছে জীবনের চেয়েও বড় করে তুলেছিল।

অথচ জীবন তো থেমে থাকেনি। আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছি। পড়াশোনা করেছি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছি, কর্মজীবনে প্রবেশ করেছি। জীবনে আরও অনেক অভিজ্ঞতা হয়েছে। এখন বুঝি, একটি পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়া মানে একজন মানুষের মেধা, যোগ্যতা কিংবা ভবিষ্যৎ শেষ হয়ে যাওয়া নয়।

চাকরিজীবনে কোনো পরীক্ষার ফল প্রকাশ হলে সহকর্মীদের প্রায়ই বলতাম, ‘আমাদের সমাজে যে জীবনে পাবলিক পরীক্ষায় ফেল করেনি, সে বড় একটি অভিজ্ঞতা থেকে বঞ্চিত হয়েছে।’

এখনো হয়তো অনেক পরিবারে পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে আগের মতোই প্রত্যাশা ও চাপ আছে। মা–বাবারা সন্তানের ভালো ফল চান, ভালো ভবিষ্যৎ চান। কিন্তু সেই প্রত্যাশার ভার যেন কোনো কিশোর-কিশোরীর কাছে অসহনীয় হয়ে না ওঠে।

আমি নিজে পাবলিক পরীক্ষায় ফেল করেছিলাম। একসময় মনে হয়েছিল, এই ব্যর্থতা নিয়ে আর বেঁচে থাকা সম্ভব নয়। আজ আমি বেঁচে আছি, কাজ করছি, জীবনের আনন্দ উপভোগ করছি।

ফেল করলেও জীবন শেষ হয়ে যায় না। আবার শুরু করা যায়, ঘুরে দাঁড়ানো যায়। মনে রেখো, জীবন অনেক সুন্দর। পাবলিক পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়ার চেয়েও অনেক বেশি সুন্দর।