নভেম্বর মাসে রাতের আকাশে মহাকাশপ্রেমীরা একাধিক মহাজাগতিক ঘটনা দেখার সুযোগ পাবেন। মাসজুড়ে একাধিক উল্কাবৃষ্টি, কয়েকটি গ্রহের কাছাকাছি অবস্থান ও চাঁদের সঙ্গে উজ্জ্বল নক্ষত্রের বিশেষ বিন্যাস দেখার সুযোগ মিলবে। তবে এই মাসের বিশেষ আকর্ষণ হতে যাচ্ছে সূর্যোদয়ের আগে চারটি গ্রহের সারিবদ্ধ অবস্থান আর ২৪ নভেম্বরের সুপারমুন।

নভেম্বরের উল্লেখযোগ্য মহাজাগতিক ঘটনাগুলো সম্পর্কে চলুন জেনে নেওয়া যাক।

২ ও ৩ নভেম্বর: চাঁদ, মঙ্গল ও বৃহস্পতির কাছাকাছি অবস্থান

নভেম্বরের শুরুতেই রাতের আকাশে চাঁদ, মঙ্গল ও বৃহস্পতির আকর্ষণীয় অবস্থান দেখার সুযোগ পেতে পারেন। ২ ও ৩ নভেম্বর মধ্যরাতের দিকে পূর্ব দিগন্তের কাছে এই তিনটি মহাজাগতিক বস্তুকে কাছাকাছি অবস্থানে দেখা যাবে। সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এগুলো আকাশের আরও ওপরে উঠতে থাকবে।

২ নভেম্বর তিনটির মধ্যে কৌণিক দূরত্ব থাকবে প্রায় ৬ ডিগ্রি। দূরবীন ব্যবহার করলে বিহাইভ নক্ষত্রপুঞ্জ পর্যবেক্ষণেরও সুযোগ মিলতে পারে।

৪ থেকে ৫ ও ১১ থেকে ১২ নভেম্বর: টরিড উল্কাবৃষ্টি

নভেম্বরের প্রথমদিকে টরিড উল্কাবৃষ্টির দুটি পর্যায় দেখা যেতে পারে। দক্ষিণ টরিড উল্কাবৃষ্টির সর্বোচ্চ পর্যায় থাকবে ৪ থেকে ৫ নভেম্বর। অন্যদিকে, উত্তর টরিড উল্কাবৃষ্টির সর্বোচ্চ পর্যায় ১১ থেকে ১২ নভেম্বর।

এই দুই উল্কাবৃষ্টি থেকে প্রতি ঘণ্টায় গড়ে প্রায় ৫টি উল্কা দেখা যেতে পারে। তবে টরিড উল্কাবৃষ্টি ধীরগতির অগ্নিগোলকের মতো উল্কার জন্য পরিচিত। অনুকূল পরিবেশে কিছু উজ্জ্বল উল্কা চোখে পড়তে পারে।

উল্কা দেখার জন্য মধ্যরাতের পরের সময়টি তুলনামূলক ভালো। উত্তর ও দক্ষিণ উভয় গোলার্ধ থেকেই এই উল্কাবৃষ্টি পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব।

৯ নভেম্বর: অমাবস্যার অন্ধকার আকাশ

৯ নভেম্বর অমাবস্যা থাকবে। এ সময় চাঁদের আলো না থাকায় রাতের আকাশ তুলনামূলক অন্ধকার থাকবে। তাই দূরের নক্ষত্রপুঞ্জ, গ্যালাক্সি ও নীহারিকা পর্যবেক্ষণের জন্য এটি মাসের অন্যতম সেরা সময় হতে পারে।

বিশেষ করে অ্যান্ড্রোমিডা গ্যালাক্সি ও ওরিয়ন নীহারিকার মতো মহাজাগতিক বস্তু পর্যবেক্ষণের সুযোগ থাকবে। শহর থেকে দূরে গিয়ে দূরবীন ব্যবহার করলে এসব বস্তু আরও ভালোভাবে দেখা যেতে পারে।

১৩ থেকে ২২ নভেম্বর: আকাশে চার গ্রহের সারিবদ্ধ অবস্থান

নভেম্বরের অন্যতম আকর্ষণীয় ঘটনা হতে যাচ্ছে চারটি গ্রহের সারিবদ্ধ অবস্থান। ১৩ থেকে ২২ নভেম্বরের মধ্যে সূর্যোদয়ের আগে বুধ, শুক্র, মঙ্গল ও বৃহস্পতিকে আকাশে কাছাকাছি একটি রেখা বরাবর দেখা যেতে পারে।

এই চারটি গ্রহই খালি চোখে দেখা সম্ভব। তবে সূর্য ওঠার আগেই পর্যবেক্ষণের প্রস্তুতি নিতে হবে। উত্তর গোলার্ধ থেকে এই দৃশ্য তুলনামূলক ভালোভাবে দেখতে পাওয়ার সম্ভাবনা আছে।

বিশেষ করে ১৪ থেকে ১৬ নভেম্বর মঙ্গল ও বৃহস্পতিকে একে অপরের খুব কাছাকাছি দেখা যাবে। ১৬ নভেম্বর তাদের মধ্যকার দূরত্ব সবচেয়ে কম হবে। এ ছাড়া বুধ ও শুক্র দক্ষিণ-পূর্ব দিগন্তের উপরে অবস্থান করবে।

১৭ থেকে ১৮ নভেম্বর: লিওনিড উল্কাবৃষ্টি

নভেম্বরের সবচেয়ে আলোচিত উল্কাবৃষ্টিগুলোর একটি হলো লিওনিড। ১৭ থেকে ১৮ নভেম্বর এই উল্কাবৃষ্টির সর্বোচ্চ পর্যায় দেখা যাবে।

লিওনিড উল্কা দ্রুতগতির জন্য পরিচিত। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের সময় এগুলো উজ্জ্বল আলোর রেখা তৈরি করে। অনুকূল পরিবেশে প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ১৫টি উল্কা দেখা যেতে পারে।

মধ্যরাতের পর থেকে ভোরের আগ পর্যন্ত উল্কাবৃষ্টি পর্যবেক্ষণের ভালো সুযোগ থাকবে। উল্কাগুলো আকাশের বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই কোনো নির্দিষ্ট নক্ষত্রের দিকে না তাকিয়ে খোলা আকাশের দিকে নজর রাখতে পারেন।

২৪ নভেম্বর: বছরের প্রথম সুপারমুন

নভেম্বরের সবচেয়ে আকর্ষণীয় মহাজাগতিক ঘটনাগুলোর একটি হতে যাচ্ছে সুপারমুন। ২৪ নভেম্বর পূর্ণিমার চাঁদ সুপারমুন হিসেবে দেখা যাবে। জানুয়ারির পর এটিই হবে বছরের প্রথম সুপারমুন। চাঁদ পৃথিবীর তুলনামূলক কাছাকাছি অবস্থানে থাকায় স্বাভাবিক পূর্ণিমার তুলনায় কিছুটা বড় ও উজ্জ্বল দেখাবে।

স্টারওয়াকের তথ্য অনুযায়ী, সাধারণ পূর্ণিমার তুলনায় চাঁদ প্রায় ৬ দশমিক ৫ শতাংশ বড় ও ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি উজ্জ্বল দেখাতে পারে।

নভেম্বরের এই পূর্ণিমাকে বিভার মুন বা বিভারের চাঁদও বলা হয়। শীতের প্রস্তুতি হিসেবে বিভার প্রাণীরা এ সময় বাঁধ ও বাসা তৈরি করে বলে উত্তর আমেরিকার প্রচলিত নামকরণ থেকে এই নাম এসেছে।

সুপারমুন দেখার জন্য চাঁদ ওঠার সময়টি বিশেষ আকর্ষণীয় হতে পারে। দিগন্তের কাছাকাছি থাকলে দৃষ্টিভ্রমের কারণে চাঁদকে স্বাভাবিকের তুলনায় আরও বড় দেখায়।

২৫ নভেম্বর: ইউরেনাস পৃথিবীর বিপরীত পাশে থাকবে

২৫ নভেম্বর ইউরেনাস অপজিশন বা বিরোধ অবস্থানে পৌঁছাবে। এ সময় পৃথিবী সূর্য ও ইউরেনাসের মাঝখানে অবস্থান করে। ফলে গ্রহটিকে রাতের আকাশে তুলনামূলক ভালোভাবে পর্যবেক্ষণের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

ইউরেনাস সূর্য থেকে সপ্তম গ্রহ ও পৃথিবী থেকে অনেক দূরে অবস্থিত। তাই সাধারণত খালি চোখে এটি শনাক্ত করা কঠিন। ভালো মানের দূরবীন বা টেলিস্কোপ ব্যবহার করলে গ্রহটি দেখা যেতে পারে।

মহাজাগতিক ঘটনাগুলো ভালোভাবে উপভোগ করার জন্য শহরের অতিরিক্ত আলো থেকে দূরে গিয়ে খোলা জায়গা বেছে নেওয়া যেতে পারে। আকাশ পরিষ্কার থাকলে পর্যবেক্ষণ সহজ হয়।

উল্কাবৃষ্টি দেখার জন্য সব সময় টেলিস্কোপের প্রয়োজন হয় না। খালি চোখেই আকাশের বিস্তৃত অংশ দেখা যায়। তবে ইউরেনাস, নীহারিকা ও দূরের গ্যালাক্সির মতো বস্তু দেখতে দূরবীন বা টেলিস্কোপ প্রয়োজন হতে পারে।

আরেকটি বিষয় মনে রাখা জরুরি, জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ঘটনার তারিখ ও সময় অঞ্চলভেদে কিছুটা পরিবর্তিত হতে পারে। তাই বাংলাদেশ থেকে পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রে স্থানীয় সময় অনুযায়ী চাঁদ ওঠা, চাঁদ ডোবা ও সূর্যোদয়ের সময় জেনে নেওয়া ভালো।

তথ্যসূত্র: ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক , স্টারওয়াক