স্যুভেনির তৈরির ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠান (এসএমই) হাতবাক্স বেসরকারি একটি ব্যাংকে ২০ লাখ টাকার সিসি ঋণের (ব্যবসা পরিচালনার ঋণ) আবেদন করে। কিন্তু ব্যাংকটি ৪–৫ লাখ টাকার বেশি ঋণ দিতে চায় না। জামানত দিলে সম্পদমূল্যের ৭০–৮০ শতাংশ পর্যন্ত ঋণ দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন ব্যাংকটির কর্মকর্তারা। অথচ আড়াই বছর আগেই দুটি ব্যাংক থেকে চাহিদামতো ঋণ পেয়েছিলেন তিনি, সেই ঋণের নিয়মিত সুদ দিয়ে যাচ্ছেন।
হাতবাক্সের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) শাফাত কাদির মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা নতুন উদ্যোক্তা; আমাদের সম্পদ নেই। তবে দৈনিক লেনদেন ও চলমান ঋণের কিস্তি নিয়মিত পরিশোধ করছি। তারপরও আমরা যে পরিমাণ ঋণের আবেদন করেছি, তার চার ভাগের এক ভাগ দিতে চাইছে ব্যাংক। এই অল্প টাকায় আমাদের কিছুই হবে না। আরেকটি ব্যাংকে সাপ্লাই চেইন ঋণ চেয়েও তিন মাসে পাইনি। ব্যবসার প্রয়োজনের সময় ঋণ না পেলে কীভাবে ব্যবসা বড় করব।’
শাফাত কাদিরের মতো অনেক ব্যবসায়ী ব্যাংক থেকে চাহিদা অনুযায়ী ঋণ পাচ্ছেন না। আবার বড় ব্যবসায়ীরাও বিনিয়োগে আগ্রহী কম। সরকারের নানা উদ্যোগের পরও বন্ধ শিল্পকারখানাগুলো সেভাবে চালু হয়নি। ফলে কয়েক বছর ধরে বেসরকারি খাতে যে মন্দাবস্থা তৈরি হয়েছিল, তা আরও প্রকট হচ্ছে।
এদিকে দেশের অর্ধেকের বেশি ব্যাংক শিল্পঋণের ক্ষেত্রে হাত গুটিয়ে বসে আছে। এসব ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ নতুন করে কোনো ঝুঁকি নিতে চাইছেন না। ফলে বেসরকারি খাতে ব্যাংকঋণের প্রবৃদ্ধি ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। টানা ছয় মাস বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের নিচে রয়েছে। অথচ গড়ে ১০ শতাংশ সুদহার হলেও ঋণের প্রবৃদ্ধি সমপরিমাণ হওয়ার কথা।
আর্থিক খাতে গতি ফেরাতে গত মে মাসে বাংলাদেশ ব্যাংক ৬২ হাজার কোটি টাকা প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে। এর মধ্যে ২০ হাজার কোটি টাকা বন্ধ কলকারখানা চালু করার জন্য। বন্ধ কারখানা চালুর জন্য ঘোষিত তহবিল থেকে ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত বিতরণ হয়েছে ৫৬১ কোটি টাকা। আর ৬২ হাজার কোটি টাকার পুরো তহবিল থেকে ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত ছাড় হয়েছে প্রায় ১১ হাজার ৯৬০ কোটি টাকা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত মার্চে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ দশমিক ৭২ শতাংশ। এপ্রিলেও প্রবৃদ্ধি একই পর্যায়ে ছিল। মে মাসে ঋণ প্রবৃদ্ধি সামান্য বেড়ে ৪ দশমিক ৯৮ শতাংশ হয়। এরপর জুন ও জুলাইয়ে আবার কমে যায়। আগস্টে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ। ফলে ছয় মাস ধরে ৫ শতাংশের নিচেই রয়েছে বেসরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি। গত ২০২৫–২৬ অর্থবছরেও ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশ।
ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, যারা বিনিয়োগ করেছে, তারা এখন অনিশ্চয়তায় আছে। ফলে নতুন বিনিয়োগে তেমন গতি নেই। শিল্প খাতে ঋণ যাচ্ছে খুবই কম। যা ঋণ বিতরণ হচ্ছে, তার বড় অংশ ভোগ্যপণ্য ও কাঁচামাল আমদানির জন্য। এ ছাড়া কিছু ভোক্তাঋণ বিতরণ হচ্ছে। ঋণের প্রবৃদ্ধি বাড়াতে হলে বেসরকারি খাতকে চাঙা হতে হবে। তখন ঋণ বিতরণ বাড়বে। অতীতে বেনামে অনেক ঋণ গেছে, যা বিনিয়োগে তেমন একটা কাজে লাগেনি। ফলে ব্যাংক খাত খারাপ হয়েছে।
ব্যবসায়ীরা ঋণ পাচ্ছেন না
নিট পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সদস্য এনএইচ অ্যাপারেলস, মুন্সি অ্যাটায়ার্স, ডিকে নিটওয়্যার, ফতুল্লা ফ্যাশনসহ ৭৮টি বন্ধ কারখানা চালু করতে প্রণোদনা তহবিল থেকে ঋণ চেয়ে আবেদন করেছে। এ ছাড়া ১০৯টি আংশিক বন্ধ কারখানাও প্রণোদনা তহবিল থেকে ঋণ চায়। তবে তেমন সাড়া পাচ্ছেন না এসব কারখানার মালিকেরা।
এ বিষয়ে বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের জানামতে, এখন পর্যন্ত নিট পোশাক খাতের কোনো প্রতিষ্ঠান প্রণোদনা তহবিল থেকে ঋণ পায়নি। আংশিক চালু দু–চারটি কারখানার ঋণ বিষয়ে ব্যাংকের বোর্ডে সিদ্ধান্ত হয়ে তা কেন্দ্রীয় ব্যাংকে গেছে। তবে একটি বন্ধ কারখানার জন্য ঋণের বিষয়টি কোনো ব্যাংকের বোর্ডে পাস হয়নি।’ তিনি আরও বলেন, সরকার ব্যবসা–বাণিজ্যে গতি ফেরাতে চাইছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক আন্তরিক। তবে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো এ ক্ষেত্রে যথাযথভাবে এগিয়ে আসছে না।
চট্টগ্রামের হিফস অ্যাগ্রো ফুড ইন্ডাস্ট্রিজ একটি বেসরকারি ব্যাংকে ২০ কোটি টাকার সিসি ঋণ চেয়ে আবেদন করে। তাদের তিন–চার কোটি টাকা ঋণ দেওয়ার প্রস্তাব দেয় ব্যাংক। তবে এই টাকায় চাহিদা মিটবে না বলে ঋণের বিষয়ে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না প্রতিষ্ঠানটি।
হিফস অ্যাগ্রো ফুড ইন্ডাস্ট্রিজের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ছৈয়দ মুহাম্মদ শোয়াইব হাছান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, বর্তমানে জামানতের ৭০–৮০ শতাংশের বেশি ঋণ দিতে আগ্রহ দেখাচ্ছে না কোনো ব্যাংক। অথচ আগে ১২০ শতাংশ বা তার বেশি ঋণ দিয়েছে ব্যাংক। তিনি বলেন, ‘আমাদের পণ্য আগে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে যেতে ৪৫ দিন লাগত। এখন তিন মাস লাগছে। ফলে আগের চেয়ে পুঁজি বেশি লাগছে। কিন্তু ব্যাংক থেকে সহায়তা পাচ্ছি না। সে কারণে আমাদের ব্যবসা হাতছাড়া হচ্ছে।’
ইস্পাত খাতের আরআরএম গ্রুপের দুটি প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা পরিচালনার জন্য ব্যাংকে ৬০০ কোটি টাকার ঋণসীমা অনুমোদন আছে। তবে ডলারের দাম বেড়ে যাওয়ায় ঋণপত্রের সীমা হ্রাস এবং ব্যবসার অন্যান্য খরচ বেড়ে যাওয়ায় গ্রুপটি আরও ২০০ কোটি টাকা বাড়তি ঋণসীমা চেয়েছে। ব্যাংক সেটির অনুমোদন দিচ্ছে না।
বিষয়টি নিশ্চিত করে আরআরএম গ্রুপের চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব সুমন চৌধুরী মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ইস্পাত খাতের ৯০ শতাংশ বাজার হিস্যা ৪৮টি কোম্পানির দখলে। তার মধ্যে ৩০–৩২টি কোম্পানি বাড়তি ঋণসীমা চেয়ে পায়নি। অর্থের অভাবে কোম্পানিগুলো অর্ধেক সক্ষমতায় উৎপাদন করছে। এভাবে চলতে থাকলে শিল্প খাত ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না।
অতীতে ঋণের গতি
গত ২০১০–১১ অর্থবছরে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ২৫ দশমিক ৮৪ শতাংশ, যা পরের অর্থবছরে কমে হয় ১৯ দশমিক ৭২ শতাংশ। গত ২০২৩–২৪ ও ২০২৪–২৫ অর্থবছরে ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল যথাক্রমে ৯ দশমিক ৮৪ শতাংশ এবং ৬ দশমিক ৪৯ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০১৪ ও ২০১৮ সালে জাতীয় নির্বাচনের আগে ও পরে ঋণের গতি বেড়ে গিয়েছিল।
বেসরকারি খাত চাঙা করতে নতুন উদ্যোগ
বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ যাতে বাড়ে, সে জন্য সরকার প্রণোদনার পাশাপাশি নতুন নীতি নিয়েছে। এ জন্য ২১ মাস পর নীতি সুদহার কমিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। রেপো রেট বা নীতি সুদহার ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে সাড়ে ৯ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।
ফলে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ব্যাংকগুলোর অর্থ সংগ্রহের খরচ কিছুটা কমেছে। এতে ধীরে ধীরে ঋণের সুদ কমার সুযোগও তৈরি হয়েছে। তবে ঋণের সুদ কমলে তা বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে সহায়ক হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। যদিও গ্যাস-বিদ্যুৎসহ অবকাঠামোকে প্রধান প্রতিবন্ধকতা মনে করেন উদ্যোক্তারা। এ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও বিবেচনায় আনেন উদ্যোক্তারা। আর করনীতি, ঘুষ–দুর্নীতির মতো পুরোনো সমস্যা তো আছেই।
পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আলী মুক্তকণ্ঠকে বলেন, অনেকগুলো ব্যাংক সমস্যায় পড়ায় ঋণ কার্যক্রম কমিয়ে এনেছে। এ ছাড়া নতুন বিনিয়োগ তেমন একটা নেই। তবে প্রণোদনা প্যাকেজের বিতরণ শুরু হওয়ায় ঋণ প্রবৃদ্ধিও ধীরে ধীরে বাড়বে।
অর্থনীতির গতি কি ফিরবে
অর্থনীতির গতি বাড়াতে একদিকে সুদহার কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। অন্যদিকে ঋণ বিতরণ বাড়াতে রাষ্ট্রমালিকানাধীন সোনালী ব্যাংকে ঋণসীমাও তুলে নিয়েছে। ফলে ব্যাংকটি গ্রাহকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ইচ্ছেমতো ঋণ দিতে পারবে।
বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার লক্ষ্য ঘোষণা করা হয়েছে। এই লক্ষ্য অর্জনে বিনিয়োগবান্ধব নীতির অংশ হিসেবে সুদহার কমানোর বিষয়টিও আলোচনায় ছিল। এখন অনেক ভালো উদ্যোক্তা ১০ শতাংশের কম সুদে ঋণ পাচ্ছেন।
ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি এবং এ কে খান অ্যান্ড কোম্পানির ভাইস চেয়ারম্যান আবুল কাসেম খান প্রথম আলোকে বলেন, অর্থনীতির গতি বাড়াতে সরকারি পদক্ষেপগুলো ভালো। ব্যবসার জন্য অনেক সংস্কার করা হয়েছে ও হচ্ছে। তবে এর প্রভাব পড়তে সময় লাগবে। এখন বিশ্ব পরিস্থিতিও ইতিবাচক নয়। ফলে ব্যবসায়ীদের মধ্যে আস্থা ফিরে আসেনি।
আবুল কাসেম খান আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের ব্যবসার পরিবেশ এখনো উন্নত হয়নি। ব্যবসা শুরুর জন্য প্রক্রিয়া শেষ করতেই বছর চলে যায়। যে কাজ এক দিনে হওয়ার কথা, তাতে এক বছর সময় লেগে যাচ্ছে। অথচ চীন, থাইল্যান্ডসহ অন্য দেশগুলো কোথায় চলে গেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই যুগে ব্যবসার পরিবেশ ঠিক করতে আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে। আমরা সৌরবিদ্যুতে উৎসাহ দিচ্ছি, কিন্তু কোনো প্রণোদনা দিচ্ছি না। অনেক দেশ সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারে প্রণোদনা দিচ্ছে।’