মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক (এমটিবি) তাদের প্রতিষ্ঠার ২৭তম বছর উদ্যাপন করেছে। এই বিশেষ মুহূর্তটিকে সামনে রেখে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার এবং বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সৈয়দ মাহবুবুর রহমান। মুক্তকণ্ঠের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক সানাউল্লাহ সাকিব তাঁর এক একান্ত সাক্ষাৎকারে এই বিষয়গুলো তুলে ধরেন।
সাক্ষাৎকারে বর্তমান সরকারের সামনে থাকা চ্যালেঞ্জ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে সৈয়দ মাহবুবুর রহমান জানান, সরকার উত্তরাধিকার সূত্রে একটি বিপর্যস্ত অর্থনীতি ও ব্যাংক খাতের দায়িত্ব পেয়েছে। তিনি বলেন, “আমাদের অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরেই খারাপের দিকে যাচ্ছিল। ২০২০ সালে কোভিড-১৯ মহামারি, এরপর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত একের পর এক ধাক্কা দিয়েছে। তবে গত ১৭ বছরে ব্যাংক খাতেরই সবচেয়ে বড় ক্ষতি করেছে। বিশেষ করে ২০১৭ সালে ইসলামী ব্যাংক জোরপূর্বক অধিগ্রহণের পর পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। একসময় খেলাপি ঋণ ছিল ২২ হাজার কোটি টাকা, এখন তা ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এর মধ্যে ৭০-৭৫ শতাংশ ঋণ নেওয়া হয়েছে সরকারি ও রাজনীতিসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ১০-১২টি ব্যাংক থেকে। এসব ঋণের বিপরীতে পর্যাপ্ত জামানত না থাকায় বড় অঙ্কের অর্থ ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা কম।”
অর্থনীতির অন্যতম প্রধান সমস্যা হিসেবে জ্বালানি সংকটের কথা উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর মতে, দীর্ঘ সময় ধরে দেশে গ্যাস অনুসন্ধানে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। তিনি অভিযোগ করেন, কৃত্রিমভাবে জিডিপি এবং বেসরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি দেখানো হয়েছে, কিন্তু সেই ঋণের অর্থ কোথায় ব্যয় হয়েছে তার কোনো জবাবদিহিতা ছিল না। উদাহরণ হিসেবে তিনি ঢাকা-গাজীপুর বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্পের কথা বলেন, যেখানে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের পর নকশার ত্রুটির কারণে সম্প্রতি প্রকল্পটি বাতিল করা হয়েছে। এছাড়া কর্ণফুলী টানেল নির্মাণের অর্থনৈতিক সুফলও এখনো দৃশ্যমান হয়নি বলে তিনি মনে করেন। এই অনিয়মগুলোর জন্য কাউকে জবাবদিহির আওতায় আনা হয়নি বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সৈয়দ মাহবুবুর রহমান আরও জানান, গত সরকারের শেষ সময়ে অর্থ পাচারের ফলে বৈদেশিক মুদ্রার তীব্র সংকট তৈরি হয় এবং রিজার্ভ কমতে থাকে, যার ফলে কর্মসংস্থানের সুযোগও তেমন বাড়েনি। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গভর্নর আহসান এইচ মনসুর দায়িত্ব নেওয়ার পর বিভিন্ন সংস্কার উদ্যোগের ফলে ডলার বাজার স্থিতিশীল হয়েছে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, “এসব সংস্কার সম্পন্ন করতে আরও পাঁচ বছর লাগবে। এরপর অর্থনীতিতে সুফল আসতে পারে।”
ব্যাংকিং খাতের সংস্কারের পাশাপাশি সামগ্রিক অর্থনীতির টানাপোড়েন এবং ৬২ হাজার কোটি টাকার নতুন প্রণোদনা প্যাকেজের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, “শুধু ব্যাংকিং খাত দিয়ে পুরো অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে না। আমাদের অন্যতম দুর্বলতা রাজস্ব খাত। কর-জিডিপির অনুপাত ৭ শতাংশের নিচে নেমেছে। সরকারের নিজস্ব আয় দিয়ে পরিচালন ব্যয় মেটানো কঠিন হয়ে পড়েছে। সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতা সমন্বয়ের প্রয়োজন ছিল, কিন্তু রাজস্ব আয় না থাকায় পরিচালন ব্যয়ের জন্য ব্যাংক থেকে বিপুল ঋণ নিতে হচ্ছে।”
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) হ্রাস পেয়েছে, প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি কমেছে এবং সহজ শর্তে ঋণ পাওয়ার সুযোগ সংকুচিত হয়েছে। এর ফলে দেশি ও বিদেশি উভয় উৎস থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে। শিল্পকারখানায় জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা এখন চরম পর্যায়ে। বৈশ্বিক মন্দা ও আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্যস্ফীতিও দেশের ওপর প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে রেমিট্যান্সের প্রায় ৩০ শতাংশ আসা সৌদি আরবের অর্থনীতি শ্লথ হলে লেনদেনের ভারসাম্যে বড় চাপ পড়তে পারে বলে তিনি আশঙ্কা করেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রণোদনা প্যাকেজ সময়োপযোগী হলেও ঋণগ্রহীতার যাচাই-বাছাই ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তৈরিতে ব্যাংকগুলোর দুই থেকে তিন মাস সময় লাগে, তাই রাতারাতি ঋণ বিতরণ সম্ভব নয় বলে তিনি জানান।
অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে সরকারের অগ্রাধিকার নিয়ে তিনি বলেন, সরকারকে স্থানীয় বিনিয়োগ ও রপ্তানি বাড়ানো এবং দ্রুত গ্যাস অনুসন্ধানসহ আট-দশটি প্রধান চালিকা শক্তি চিহ্নিত করে সেগুলোতে মনোযোগ দিতে হবে। তাঁর মতে, দেশীয় বিনিয়োগ না বাড়লে বিদেশে রোডশো করে বিনিয়োগ আনা সম্ভব হবে না। এলএনজি টার্মিনালের সক্ষমতা নিয়ে কথা বলে তিনি বলেন, বিশ্বজুড়ে ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের ৫০-৬০ শতাংশ সক্ষমতা ব্যবহার স্বাভাবিক হলেও আমরা ঝুঁকি নিয়ে ৮০-৯০ শতাংশ সক্ষমতায় চালাচ্ছি। এতে যেকোনো সময় বড় বিঘ্ন ঘটতে পারে। এছাড়া বৈদেশিক বাণিজ্য ও প্রবাসী আয়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ১০-২০টি দেশ চিহ্নিত করে সেখানে দক্ষ ও দেশপ্রেমিক কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি, যাতে প্রবাসী শ্রমিকরা পাসপোর্ট নবায়নসহ অন্যান্য সেবা সহজে পেতে পারেন।
বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা এবং ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপের অগ্রগতি সম্পর্কে তিনি জানান, পাচার হওয়া অর্থ চিহ্নিত করে তা ফেরত আনতে পাঁচটি আন্তর্জাতিক আইনি প্রতিষ্ঠানকে সম্পৃক্ত করার কাজ চলছে। তিনি বলেন, “ইতিবাচক দিক হলো, তারা ‘সাকসেস ফি’ ভিত্তিতে কাজ করবে। অর্থ উদ্ধার করতে পারলেই তারা সেখান থেকে ফি নেবে। প্রক্রিয়াটি দীর্ঘমেয়াদি হলেও এতে দোষীদের কাছে বার্তা যাবে, টাকা মেরে দিয়ে বিদেশে আরামে থাকা যাবে না।”
গভর্নরের নেওয়া আরেকটি পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিভিন্ন আদালতে ব্যাংকগুলোর যেসব মামলা বছরের পর বছর আটকে থাকে, সেগুলো বাংলাদেশ ব্যাংক নিবিড়ভাবে তদারক করছে। আগে অনেক সময় ব্যাংকগুলোর অজান্তে একতরফা স্থগিতাদেশ দেওয়া হতো। এটি ঠেকাতে অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়কে প্রয়োজনীয় ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, যাতে আদালতের যেকোনো স্থগিতাদেশের বিরুদ্ধে সরকারের আইনজীবীরা তাৎক্ষণিকভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষে দাঁড়াতে পারেন।
খেলাপি ঋণ ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়া এবং শীর্ষস্থানীয় করপোরেট গ্রুপগুলোর ব্যবসায়িক স্থবিরতার প্রভাব নিয়ে তিনি বলেন, অতীতে অনেকে সক্ষমতার চেয়ে বড় প্রকল্প নিয়েছেন। যেমন দেশে বছরে স্টিলের চাহিদা ৪০-৫০ লাখ মেট্রিক টন হলেও উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তোলা হয়েছে প্রায় এক কোটি মেট্রিক টন। সরকারি মেগা প্রকল্পের সময়ে এসব কারখানা চললেও এখন প্রকল্প বন্ধ থাকায় কোম্পানিগুলো চাপে পড়েছে। অনেক পোশাক কারখানাও বন্ধ হয়ে গেছে। তবে নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর পণ্যের চাহিদা সব সময় থাকে, তাই ব্যাংক হিসেবে তারা এখনো তাদের ঋণপত্র (এলসি) খুলে উৎপাদন সচল রাখছে। তবে ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় পণ্যের মোড়ক ছোট হয়ে আসছে; যেমন ২০০ গ্রামের প্যাকেট একই দামে ১০০ গ্রাম করা হচ্ছে।
ঋণ পরিশোধের নীতিমালা নিয়ে তিনি জানান, সরকার এককালীন ঋণ পরিশোধের নীতিমালা করলেও বড় গ্রুপগুলোর পক্ষে এই সুবিধা নেওয়া অসম্ভব। বর্তমান বাজারে ২০ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প কিনে নেওয়ার মতো ক্রেতা নেই, তাই ঋণ পুনর্গঠনের মাধ্যমে এসব প্রতিষ্ঠানকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
উচ্চ মূল্যস্ফীতির মাঝে আমানতের সুদের হার কমে সাড়ে ৭ থেকে সাড়ে ৮ শতাংশে নামার বিষয়ে তিনি ব্যাখ্যা করেন, নতুন বিনিয়োগ ও ঋণের চাহিদা না থাকলে ব্যাংক অতিরিক্ত আমানত দিয়ে কী করবে? সরকারি ট্রেজারি বিলের সুদের হারও কমে ৮ থেকে সাড়ে ৯ শতাংশে নেমেছে। ব্যাংককে নিজের তহবিল ৮-৯ শতাংশে বিনিয়োগ করতে হলে আমানতকারীকে এর চেয়ে বেশি সুদ দেওয়া সম্ভব নয়। সাধারণ সঞ্চয়কারীদের প্রতি তাঁর পরামর্শ, “বেশি সুদের লোভে দুর্বল প্রতিষ্ঠানে টাকা রাখবেন না। অতীতে অনেকে বেশি সুদের আশায় দুর্বল আর্থিক প্রতিষ্ঠানে টাকা রেখে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এমনকি যাঁরা একসময় শরিয়াহ ব্যাংক ছাড়া টাকা রাখতেন না, তাঁরাও মূল অর্থ ফেরত না পেয়ে প্রচলিত ধারার ভালো ব্যাংকে আমানত রাখছেন। যেসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ১৫-২০ শতাংশ ছাড়িয়েছে, বর্তমান মন্দার বাজারে নতুন ব্যবসা ছাড়া তাদের পক্ষে মুনাফা করে টিকে থাকা প্রায় অসম্ভব।”
চ্যালেঞ্জিং এই সময়ে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবসায়িক কৌশল নিয়ে তিনি বলেন, ২০১৯-২০ সালের দিকে তাদের আমানত ছিল ১৯ হাজার কোটি টাকা, যা এখন বেড়ে ৩৩-৩৪ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। আগে তাদের ঋণের ৮৯-৯০ শতাংশ ছিল বড় করপোরেট ঋণ, যা পরিকল্পিতভাবে কমিয়ে প্রায় ৮০ শতাংশে আনা হয়েছে। আগামী পাঁচ বছরে করপোরেট ঋণ ৭০ শতাংশে নামিয়ে রিটেইল ও কটেজ, মাইক্রো ও ক্ষুদ্র (সিএমএস) খাতে ঋণের হিস্যা ৩০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে। মাঝারি শিল্পের ঋণ খেলাপি হওয়ার হার বেশি হওয়ায় তারা এখন ছোট উদ্যোক্তাদের বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে। প্রযুক্তির ক্ষেত্রে তারা নিজস্ব ডিজিটাল ব্যাংকিং টিমের মাধ্যমে অ্যাপস সংস্কার করেছে এবং ফিনটেক পার্টনারশিপের মাধ্যমে ‘মুঠোপে’ (মোবাইলকে পয়েন্ট অব সেল বা পোজ মেশিন হিসেবে ব্যবহারের প্রযুক্তি) চালু করেছে।
দীর্ঘ ৩৭ বছরের ব্যাংকিং জীবন শেষে দেশের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ সম্পর্কে তিনি বলেন, “১৯৯০-এর দশক থেকে শুরু করে পরবর্তী ৩৭ বছর ধরে মূলত প্রবৃদ্ধিশীল বাজার দেখে এসেছি। কিন্তু এবারই প্রথম দেশের অর্থনীতিকে প্রকৃত মন্দার মুখোমুখি হতে দেখলাম। জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে মধ্যবিত্তের অনেকে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাচ্ছেন, যা বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।”
ভবিষ্যতে ব্যাংকিং খাতে বড় ধরনের একত্রীকরণ বা কনসোলিডেশন অনিবার্য বলে মনে করেন তিনি। বর্তমানে দেশে ৫৭টি ব্যাংক থাকলেও সবকটি টিকবে না; তাঁর মতে দেশের অর্থনীতির জন্য শীর্ষ ২০-২৫টি ব্যাংকই যথেষ্ট। ৫০০ বিলিয়ন ডলারের এই অর্থনীতিতে টিকে থাকতে ব্যাংকগুলোর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে পর্যাপ্ত মূলধন নিশ্চিত করা এবং দক্ষ ও মানসম্পন্ন মানবসম্পদ ধরে রাখা। পরিশেষে তিনি বলেন, এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সহায়তার পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ আর্থিক কাঠামোর ব্যাপক সংস্কার প্রয়োজন। শক্ত নীতিনির্ধারণ ও সুশাসন নিশ্চিত করা গেলে সংকট কাটিয়ে আবার স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধিতে ফেরা সম্ভব হবে।