সাড়ে তিন বছর আগে শখের বশে নিজের হাতে তৈরি নকশি পিঠার ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে পোস্ট করেছিলেন নিপা ইসলাম। সেই ছবিগুলো দেখে অনেকেই অনলাইনে পিঠার অর্ডার দিতে শুরু করেন। ক্রেতাদের কাছ থেকে দারুণ সাড়া পেয়ে মা ও ভাইয়ের সহযোগিতায় তিনি হয়ে ওঠেন একজন সফল নারী উদ্যোক্তা।
ফেসবুকে একটি পেজ খুলে তিনি তার উদ্যোগের নাম দেন ‘পিঠা ঘর’। নিজের বাড়িতেই গড়ে তোলেন পিঠা তৈরির কারখানা। বর্তমানে এই প্রতিষ্ঠানে ৪৩ জন নারী ও পুরুষ কর্মরত ছিলেন। মাসে প্রায় ৮ থেকে ১০ লাখ টাকার পিঠা বিক্রি করতেন তিনি।
তবে নরসিংদীর শিবপুরের এই নারী উদ্যোক্তার সব স্বপ্ন এবং উপার্জনের একমাত্র অবলম্বন শত্রুতার আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। গতকাল শুক্রবার দিবাগত রাত তিনটার দিকে নিপার পিঠা তৈরির কারখানায় পেট্রল ঢেলে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। মুহূর্তেই আগুন তাঁর থাকার ঘরসহ আশপাশের মোট পাঁচটি ঘরে ছড়িয়ে পড়ে। এতে পিঠা তৈরির কারখানা, প্রয়োজনীয় সব সরঞ্জাম, আসবাবপত্রসহ বিভিন্ন মালামাল সম্পূর্ণ পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।
এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আজ শনিবার দুপুর ১২টার দিকে নিপা ইসলাম বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে শিবপুর থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন। শিবপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কোহিনূর মিয়া মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
নারী উদ্যোক্তা নিপা ইসলাম শিবপুরের বাসস্ট্যান্ড-সংলগ্ন পশ্চিমপাড়া এলাকার প্রয়াত আফসার উদ্দিনের কন্যা। ২০১৮ সালে ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করার পর তিনি আর পড়াশোনা করেননি এবং বিয়েও করেননি। অনলাইনে পিঠা বিক্রির মাধ্যমে অর্জিত আয় দিয়ে তিনি তাঁর অসুস্থ মায়ের সেবা এবং প্রতিবন্ধী ভাইয়ের সংসার চালিয়ে আসছিলেন।
ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার দিবাগত রাত তিনটার দিকে নিপার বাড়ির একটি ঘরে আগুন ধরে। দ্রুত সেই আগুন পাশের আরও চারটি ঘরে ছড়িয়ে পড়ে। খবর পেয়ে শিবপুর ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে এক ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। তবে ততক্ষণে পিঠা তৈরির কারখানা ও সরঞ্জামসহ সবকিছু পুড়ে ছাই হয়ে যায়।
চোখের সামনে নিজের স্বপ্ন পুড়ে যেতে দেখে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন নিপা ইসলাম। তাঁর ভাষ্যমতে, যে ঘরে আগুন দেওয়া হয়েছে, সেটিতে কোনো গ্যাস বা বিদ্যুতের সংযোগ নেই। তাই এটি কোনো দুর্ঘটনাবশত অগ্নিকাণ্ড নয়, বরং পরিকল্পিত শত্রুতার আগুন। রাত দুইটা পর্যন্ত তাঁর ভাই পাশের ঘরে কাজ করেছেন এবং রাত তিনটার দিকে আগুন লাগে। ঘরটির পেছনের দিক থেকে পেট্রল ঢেলে আগুন দেওয়া হয়েছে বলে তিনি মনে করেন। নিপা ইসলাম বলেন, ‘কোনো বিষয়ে কারও সঙ্গে আমার কোনো শত্রুতা ছিল না। কার আগুনে আমার স্বপ্ন পুড়িয়ে দিল বুঝতে পারছি না। এখন আমার ভাত খাওয়ার প্লেটটাও নাই। সব পুড়ে গেছে।’
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, নিপা ইসলামের নকশি পিঠার সুনাম সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছিল। তিনি নিজে স্বাবলম্বী হওয়ার পাশাপাশি অনেক নারীর কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিয়েছিলেন। অনেক কঠোর পরিশ্রম করে তিনি এই পর্যায়ে এসেছিলেন, কিন্তু গত রাতের আগুনে সব শেষ হয়ে গেল। এখন নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানো তাঁর জন্য অত্যন্ত কঠিন হবে।
শিবপুর ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘খবর পেয়ে আমরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছাই। প্রায় এক ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনি। আগুনের সূত্রপাত ঠিক কীভাবে, তা এখনো জানা যায়নি। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ তদন্ত শেষে বলা যাবে। তবে অন্তত ১০ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।’
শিবপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কোহিনূর মিয়া জানান, ‘পিঠা ঘর’ নামে একটি ফেসবুক পেজের মাধ্যমে ঐতিহ্যবাহী নকশি পিঠাসহ নানা ধরনের পিঠা বাজারজাত করেন ওই নারী উদ্যোক্তা। তাঁর কারখানায় আগুন লাগার বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। যদি দুর্ঘটনা না হয়ে থাকে, তবে দ্রুত জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা হবে।