বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রিপ্টোকারেন্সি এক্সচেঞ্জ বাইন্যান্স থেকে ৬৩০ কোটি মার্কিন ডলার অথবা ৪৭০ কোটি পাউন্ড চুরির ঘটনায় উত্তর কোরিয়া সরকার সমর্থিত একটি হ্যাকার গ্রুপকে দায়ী করা হচ্ছে। দুটি শীর্ষস্থানীয় ব্লকচেইন অ্যানালিটিকস প্রতিষ্ঠানের গোয়েন্দা তথ্যের বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে যে, এই বিশাল অংকের অর্থ চুরির নেপথ্যে উত্তর কোরিয়ার সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। টিআরএম ল্যাবস এবং চেইনালাইসিস নামের প্রতিষ্ঠান দুটি জানিয়েছে, ল্যাজারাস গ্রুপ বা ট্রেডারট্রেটর নামক উত্তর কোরিয়ার একটি সাইবার ইউনিট এই হ্যাকিং প্রক্রিয়ায় জড়িত ছিল। ইন্টারনেট ব্যবহারের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ এবং চরম দারিদ্র্য থাকা সত্ত্বেও উত্তর কোরিয়ার এই সাইবার তৎপরতা আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। বিশেষজ্ঞদের দাবি, উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং–উনের সরকার রাষ্ট্রীয় কোষাগার পূরণের লক্ষ্যে এই ধরনের অনৈতিক সাইবার অপরাধের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। তবে পিয়ংইয়ং কর্তৃপক্ষ দীর্ঘ সময় ধরে এই ধরনের অভিযোগগুলো অস্বীকার করে আসছে।
ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (এফবিআই) একটি তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির সেই দুঃসাহসিক ঘটনার পেছনেও ছিল কুখ্যাত এই ল্যাজারাস গ্রুপ। আন্তর্জাতিক ব্যাংকগুলোর আন্তঃলেনদেন নেটওয়ার্ক সুইফটের নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে তারা তৎকালীন সময়ে ওই অপারেশনটি চালিয়েছিল।
এর আগে ২০১৪ সালে সনি পিকচার্সে সাইবার হামলা চালিয়ে কর্মকর্তাদের হাজার হাজার ই-মেইল ফাঁস করার ঘটনায় উত্তর কোরিয়াকে দায়ী করা হয়েছিল। এছাড়া এফবিআই এর আগে জানিয়েছিল যে, বাইবিট এক্সচেঞ্জ থেকে ১৫০ কোটি ডলার চুরির পেছনেও উত্তর কোরিয়ার হাত ছিল। এফবিআই-এর তথ্যমতে, ট্রেডারট্রেটর গ্রুপটি চুরি করা অর্থ অত্যন্ত দ্রুততার সাথে বিটকয়েন এবং অন্যান্য ডিজিটাল সম্পদে রূপান্তর করে তা নগদ টাকায় পরিণত করে। ধারণা করা হয়, উত্তর কোরিয়া তাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে মেধাবী শিক্ষার্থীদের বাছাই করে গোয়েন্দা সংস্থার অধীনে বিশেষ হ্যাকার দল গঠন করে। গত কয়েক বছরে এই হ্যাকাররা মোট ৬২ কোটি ডলারের বেশি মূল্যের ক্রিপ্টোকারেন্সি চুরি করেছে। বাইন্যান্সের সাম্প্রতিক এই হামলায় উত্তর কোরিয়ার এজেন্টরা একটি বিশেষ অনুমোদনের সুযোগ নিয়ে ইন্টারনেট সংযুক্ত হট ওয়ালেট থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে হ্যাকারের নিজস্ব অ্যাকাউন্টে অর্থ স্থানান্তর করে নেয়।
শুরুতে ধারণা করা হয়েছিল যে, একজন কম্পিউটার প্রকৌশলীর ল্যাপটপ হ্যাক হওয়ার মাধ্যমে এই ঘটনাটি ঘটেছে, তবে পরবর্তীতে দেখা যায় এর পরিধি আরও বিস্তৃত ছিল। বাইন্যান্সের কো-সিইও রিচার্ড টেং বলেন, ‘আমাদের গভীর তদন্তে অননুমোদিত প্রবেশাধিকারের বিভিন্ন বিষয় জানা গেছে। যদিও চুরি হওয়া সম্পদের প্রায় ৮০ শতাংশ উদ্ধার ও সুরক্ষিত করা গেছে। তবে বাকি অর্থ এখনো পাওয়া যায়নি।’ বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পুরো অভিযানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির ব্যবহারের সম্ভাবনা রয়েছে। চেইনালাইসিস আরও জানিয়েছে, হ্যাকাররা অর্থ পাচারের জন্য এমন কিছু নতুন মানি লন্ডারিং পদ্ধতি বা প্যাটার্ন ব্যবহার করেছে, যা এর আগে কখনো দেখা যায়নি।