জ্ঞানী, বিনয়ী এবং দৃঢ়চেতা ব্যক্তিত্বের অধিকারী সাংবাদিক মাহফুজ আনাম বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের অত্যন্ত পরিচিত এক নাম। উপমহাদেশের প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ, লেখক ও সাংবাদিক আবুল মনসুর আহমদের সন্তান মাহফুজ আনাম দীর্ঘ সময়ে নিজেকে একজন সংবেদনশীল সাংবাদিক এবং সুনাগরিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। দেশে ও বিদেশে তিনি বিশেষ পরিচিতি পেয়েছেন ভয়হীন সাংবাদিকতা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার লড়াইয়ের মাধ্যমে। তাঁর দক্ষ নেতৃত্ব ও পেশাদারিত্বের ফলেই ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টার আজ অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে।
প্রজ্ঞাবান এই সাংবাদিকের পরিচয় দিতে গিয়ে দেশবরেণ্য শিক্ষাবিদ সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী উল্লেখ করেছেন, ‘অধ্যাপনায় মাহফুজকে খুবই মানাত, কিন্তু আরও বেশি মানিয়েছে সাংবাদিকতায়। কর্মজীবনের শুরুতেই সে পথপ্রদর্শক হিসেবে পেয়েছিল এস এম আলীকে।…আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে শুরু করে, পরবর্তী সময়ে ঢাকায় এসে এস এম আলীর সঙ্গেই ছিল মাহফুজ আনাম। এস এম আলীর মৃত্যুর পরে দ্য ডেইলি স্টার-এর জন্য তৈরি শূন্যতা পূরণ করার মতো সবচেয়ে যোগ্য লোক ছিল তরুণ মাহফুজ আনাম। ৩০ বছর ধরে সে তার যোগ্যতার প্রমাণ রেখে চলেছে। তার সম্পাদনায় ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত বাংলাদেশের পত্রিকাগুলোর মধ্যে দ্য ডেইলি স্টার যে সর্বশ্রেষ্ঠ, তাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। শুধু তা-ই নয়, ওই পত্রিকা এখন আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত ও সম্মানিত।’ (মুখবন্ধ, সময় ও দুঃসময়ের কথা: মাহফুজ আনামের কথা ও কথোপকথন)
মাহফুজ আনামের জীবন ও কর্মজীবনের আলেখ্য নিয়ে রচিত হয়েছে ‘সময় ও দুঃসময়ের কথা’ গ্রন্থটি। এই বইটিতে একদিকে যেমন তরুণ মাহফুজ আনামের সোনালি দিনগুলোর স্মৃতি ফুটে উঠেছে, তেমনি বস্তুনিষ্ঠ ও আপসহীন সাংবাদিকতার পথে তাঁর নিরন্তর সংগ্রামের কথা বর্ণিত হয়েছে। ১৯৭৩ সালে মাত্র ৩০০ টাকা মাসিক বেতনে দ্য বাংলাদেশ অবজারভার-এ তাঁর সাংবাদিকতা জীবনের শুরু এবং পরবর্তীতে কীভাবে তিনি দ্য ডেইলি স্টারের প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হলেন, সেই রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা ৬টি অধ্যায়ে বিন্যস্ত করা হয়েছে। বইটির পাঁচটি পর্বে মাহফুজ আনামের কথা থেকে সংগৃহীত মোট ৩৬টি লেখা স্থান পেয়েছে। এর অধ্যায়গুলো হলো— আত্মজৈবনিক, সাংবাদিকতা ও বাক্স্বাধীনতা, জীবন ও জগৎ-ভাবনা, গণতন্ত্র ও বিবিধ এবং ভাষণ।
বইটির আত্মজৈবনিক অংশে তরুণ মাহফুজ আনামের শুরুর দিকের জীবনচিত্র উঠে এসেছে। জাতীয় রাজনীতির অন্যতম ব্যক্তিত্ব আবুল মনসুর আহমদের সন্তান হয়েও তিনি রাজনীতিতে আগ্রহী ছিলেন। এই প্রসঙ্গে তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, ‘আমার জীবনে পিতা-মাতা, পরিবারের পর সবচেয়ে বেশি প্রভাব ছাত্র ইউনিয়নের। আমার দেশপ্রেমের পূর্ণাঙ্গতা দিয়েছে সংগঠনটি।’ (পৃষ্ঠা: ৫) এছাড়া পাকিস্তান আমলের সেই উত্তাল দিনগুলো তাঁর জীবনের গতিপথ নির্ধারণে বড় ভূমিকা রেখেছিল বলে তিনি অকপটে স্বীকার করেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ, দেশপ্রেম, সমাজচেতনা—সব মিলিয়ে একটা সোনালি সময় পার করেছি।’ (পৃষ্ঠা:৬)
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে মাহফুজ আনাম বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন এবং তিনি কমিশন পাওয়া অফিসারদের দ্বিতীয় ব্যাচের সদস্য ছিলেন। তবে স্বাধীনতার পর তিনি সামরিক পেশা ছেড়ে সাংবাদিকতায় মনোনিবেশ করেন এবং আন্তর্জাতিক সংস্থা ইউনেস্কোতে কাজ করেন। এরপর তাঁর জীবনে আসে দ্য ডেইলি স্টারের মোড়। বিদেশের নিরাপদ ও আকর্ষণীয় চাকরি ত্যাগ করে বরেণ্য সাংবাদিক এস এম আলীর সঙ্গে মিলে দ্য ডেইলি স্টার প্রতিষ্ঠা করা এবং সেটিকে একটি শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করানো তাঁর জীবনের অন্যতম বড় সাফল্য ও সংগ্রামের অধ্যায়। ১৯৯১ সালের ১৪ জানুয়ারি এই পত্রিকার যাত্রা শুরু হয়। এরপর নানা প্রতিবন্ধকতা ও প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে এটি এগিয়েছে। বইটির ‘সাংবাদিকতা ও বাক্স্বাধীনতা’ অংশে থাকা ৯টি লেখা কেবল তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা নয়, বরং বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসের এক অনন্য দলিল হিসেবে গণ্য হবে।
গ্রন্থটির চতুর্থ অধ্যায়ে মাহফুজ আনামের ১০টি ভাষণ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যার অধিকাংশ বিষয়ই সাংবাদিকতা কেন্দ্রিক। স্বাধীন সাংবাদিকতা ও বাকস্বাধীনতা নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিদের জন্য এই ভাষণগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ‘সাংবাদিকরা কেবল সাংবাদিকতাকে বাঁচাতে পারেন’—শিরোনামের লেখাটি বাংলাদেশের সাংবাদিকতার টিকে থাকার লড়াইয়ে এক বিশেষ সংযোজন এবং এটি একটি অমোঘ বার্তা বহন করে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক বিশেষ মোড় হলো জুলাই গণ-অভ্যুত্থান। পরিণত বয়সে অত্যন্ত তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে এই ঘটনা পর্যবেক্ষণ করেছেন মাহফুজ আনাম। পাঁচটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে তাঁর বিশ্লেষণ ও প্রত্যাশা বাংলাদেশের প্রতিটি সংবেদনশীল নাগরিকের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন হিসেবে ধরা দিয়েছে। সম্ভবত তিনিই বাংলাদেশের একমাত্র সাংবাদিক, যিনি ১৯৬৯, ১৯৯০ এবং ২০২৪ সালের তিনটি বড় গণ-অভ্যুত্থান খুব কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করেছেন। এই সাক্ষাৎকারগুলোতে অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক এবং বাংলাদেশ সম্পর্কে ছড়িয়ে পড়া মিথ্যা, গুজব ও অপতথ্যের ভয়াবহতা নিয়ে তিনি বিশ্লেষণ করেছেন। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, ‘কিছু ইসলামিক ঘটনা দেখে, দয়া করে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হবেন না যে আমরা একটি মৌলবাদী দেশে পরিণত হচ্ছি। এটি একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ এবং এখানে খুব নিবেদিতপ্রাণ মুসলমান রয়েছে। যারা ধর্মে বিশ্বাস করে, তারা দিনে পাঁচবার মসজিদে যায়। এটি দেখে তাদের পুরো দৃষ্টিভঙ্গিকে সংজ্ঞায়িত করা উচিত নয়। এর অর্থ এই নয় যে তারা একটি চরমপন্থী গোষ্ঠী বা অন্য কিছুর অংশ।’ (পৃষ্ঠা:২১৭)
মাহফুজ আনাম একজন প্রগতিশীল, প্রজ্ঞাবান এবং অত্যন্ত বিনয়ী মানুষ হিসেবে পরিচিত। তাঁর জীবন নিয়ে লেখা ‘সময় ও দুঃসময়ের কথা’ পাঠকদের চিন্তার দুয়ার উন্মুক্ত করবে এবং আনন্দ দেবে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সাংবাদিকতার ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হলেন তিনি। তবে বইটিতে বিভিন্ন সময়ের কিছু প্রাসঙ্গিক ছবি যুক্ত করা হলে তা আরও সমৃদ্ধ হতো। এছাড়া বইটির দাম কিছুটা বেশি মনে হতে পারে। সাংবাদিকতা শিক্ষার সাথে যুক্ত শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য এটি একটি অবশ্যপাঠ্য গ্রন্থ। তাই ভবিষ্যতে সাশ্রয়ী মূল্যে পেপারব্যাক সংস্করণ প্রকাশের কথা বিবেচনা করতে পারে প্রকাশনা সংস্থা দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড।
বইয়ের বিবরণ:
সময় ও দুঃসময়ের কথা : মাহফুজ আনামের কথা ও কথোপকথন
গ্রন্থনা ও সম্পাদনা: ইমরান মাহফুজ
প্রকাশক: দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড
প্রকাশ: এপ্রিল ২০২৬
প্রচ্ছদ: পরাগ ওয়াহিদ
পৃষ্ঠা: ২৫২; মূল্য: ৯৫০ টাকা