ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি, রুশ তেল আমদানির বিষয়ে শুল্কের চাপ এবং পাকিস্তানের সঙ্গে ওয়াশিংটনের ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতা ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সমীকরণ বদলে দিয়েছে। এক সময়ের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ দুই মিত্রের সম্পর্কের মাঝে এখন বাসা বেঁধেছে গভীর অবিশ্বাস। এই প্রেক্ষাপটে মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ফলাফল কি এই সম্পর্কের গতিপথ নতুন কোনো মোড় দেবে, তা এখন বড় প্রশ্ন।
এক সময় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পাশে দাঁড়িয়ে প্রবল প্রশংসায় মেতেছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ২০১৯ সালে টেক্সাসের হিউস্টনের একটি স্টেডিয়ামে দুই নেতা এক যৌথ সমাবেশে বক্তব্য প্রদান করেন। সেই অনুষ্ঠানে ৫০ হাজারের বেশি ভারতীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক উপস্থিত ছিলেন। ট্রাম্পের ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে মোদি বলেছিলেন, “যখনই আমাদের দেখা হয়েছে, তাঁকে একই রকম মনে হয়েছে—উষ্ণ, বন্ধুত্বপূর্ণ, সহজে কাছে টানা যায়, প্রাণবন্ত এবং রসবোধে ভরপুর।”
ঘটনাটি ছিল ২০২০ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগের কথা। তখন দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার জন্য এক কঠিন নির্বাচনী লড়াইয়ের মুখে ছিলেন ট্রাম্প। কার্যত যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত ভারতীয়দের মধ্যে ট্রাম্পের জন্য সমর্থন সংগ্রহের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছিলেন মোদি। উল্লেখ্য, ভারতীয় বংশোদ্ভূত এই জনগোষ্ঠী যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে ধনী প্রবাসী গোষ্ঠী হিসেবে পরিচিত।
মোদি নিজের নির্বাচনী প্রচারের একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় স্লোগান ট্রাম্পের জন্য ধার করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, “আব কি বার, ট্রাম্প সরকার!” হিন্দি এই স্লোগানের অর্থ হলো, “এবার ট্রাম্প সরকার!” তবে শেষ পর্যন্ত সেই নির্বাচনে পরাজিত হন ট্রাম্প।
সাত বছর পর বর্তমান পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে এখন কঠিন রাজনৈতিক পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছেন ট্রাম্প। ধারণা করা হচ্ছে, এই নির্বাচনে কংগ্রেসে তাঁর দলের আসন সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে, যা তাঁর আইন প্রণয়নের পরিকল্পনাগুলোকে বড় ধরনের বাধার মুখে ফেলবে। এমন এক সময়ে নয়াদিল্লি ও ওয়াশিংটনের সম্পর্কের সমীকরণ পুরোপুরি বদলে গেছে।
বর্তমানে ভারত আর ট্রাম্পের প্রতি সমর্থন জানাচ্ছে না। বরং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের একের পর এক ধাক্কার মুখে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ট্রাম্প প্রশাসনের সমালোচনায় আগের চেয়ে অনেক বেশি সরব হয়েছেন ভারতীয় কর্মকর্তারা। অনেক বিশ্লেষকের মতে, মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের দল আসন হারালে তাঁর ক্ষমতা ও প্রভাব কিছুটা হ্রাস পাবে, যা মোদি সরকারের জন্য স্বস্তির কারণ হতে পারে।
দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলেরই সমর্থন পেয়ে আসছে ভারত। তবে ঐতিহাসিকভাবে নয়াদিল্লির কৌশলগত মহল রিপাবলিকান প্রেসিডেন্টদের শাসনকালে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেছে। স্নায়ুযুদ্ধের শেষ দিকে প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যানের আমলে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের নতুন গতি সঞ্চারিত হয়। মস্কোর সঙ্গে নয়াদিল্লির ঘনিষ্ঠতার কারণে কয়েক দশক ধরে বিদ্যমান অবিশ্বাস কাটিয়ে সম্পর্ক পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল তখন।
পরবর্তীতে ২০০৬ থেকে ২০০৮ সালের মধ্যে প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের আমলে দুই দেশের মধ্যে একটি ঐতিহাসিক বেসামরিক পরমাণু চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তিতে (এনপিটি) স্বাক্ষর না করা সত্ত্বেও ভারত এর মাধ্যমে বৈশ্বিক পরমাণু প্রযুক্তি ও জ্বালানি ব্যবহারের সুযোগ পায়। বুশের সময়েই বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সামরিক চুক্তি হয়, যার ফলে মার্কিন জাহাজ ও উড়োজাহাজের জন্য ভারতের সামরিক ঘাঁটিতে জ্বালানি ও রসদ সংগ্রহের সুবিধা নিশ্চিত করা হয়।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্টদের প্রশাসনকে ভারত প্রায়ই মানবাধিকার পরিস্থিতির বিষয়ে অধিক সমালোচনামুখর হিসেবে দেখেছে। ট্রাম্পের আমলেও রিপাবলিকানদের সঙ্গে ভারতের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে বলে মনে হয়েছিল। বর্তমান প্রেসিডেন্ট ও মোদির মধ্যে প্রকাশ্য ঘনিষ্ঠতা ছিল চোখে পড়ার মতো। এমনকি ট্রাম্পকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, তিনি “হোয়াইট হাউসে ভারতের সবচেয়ে ভালো বন্ধু”।
কিন্তু ভারতের দৃষ্টিতে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে প্রশাসন আগের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। পরিস্থিতি এতটাই পরিবর্তিত হয়েছে যে, দীর্ঘদিনের একটি কূটনৈতিক চর্চা থেকে সরে এসেছে নয়াদিল্লি। সাধারণত বন্ধুত্বপূর্ণ দেশের সঙ্গে মতবিরয়ে ভারত পর্দার আড়ালে আলোচনা করে, কিন্তু বর্তমান টানাপোড়েনের কারণে হোয়াইট হাউসের সমালোচনায় এবার প্রকাশ্যেই কঠোর অবস্থান নিয়েছে দেশটি।
বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে আলোচনা এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখান থেকে আর ছাড় দেওয়া বা নেওয়া—দুটিই খুব কঠিন হতে পারে। গত মাসে নিউইয়র্কের এক অনুষ্ঠানে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর ট্রাম্প প্রশাসন সম্পর্কে সরাসরি ও স্পষ্ট মূল্যায়ন প্রদান করেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, “‘সন্ত্রাসবাদ’ নিয়ে ভারতের উদ্বেগের প্রতি ট্রাম্প প্রশাসন সংবেদনশীল আচরণ করেনি; ভারতের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানের সঙ্গে তারা ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়েছে; নিজেদের স্বার্থকেন্দ্রিক বাণিজ্যনীতি অনুসরণ করেছে, যার অসামঞ্জস্যপূর্ণ চাপ পড়েছে বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর ওপর।”
জয়শঙ্কর আরও বলেন, “দেশগুলোর এতটা আত্মকেন্দ্রিক হওয়া উচিত নয় যে তারা নিজেদের জগতে বাস করবে, নিজের সিদ্ধান্ত নেবে এবং বলবে, “আপনার জীবন কঠিন করে তোলা আমার উদ্দেশ্য ছিল না।””
দুই দেশের রাজধানীর মধ্যে বড় বিরোধের অন্যতম কারণ বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে অনিশ্চয়তা। এই চুক্তি বাস্তবায়িত হলে ট্রাম্পের শুল্কনীতির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম ভারত কিছুটা স্বস্তি পেতে পারত। চলতি মাসের শুরুতে ভারতের অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমণ জানান, বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে আলোচনা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখান থেকে আর ছাড় দেওয়া বা নেওয়া—দুটিই খুব কঠিন হতে পারে।
ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ (মাগা) আন্দোলনের প্রভাবও পড়েছে ভারতীয়দের ওপর। অভিযোগ তোলা হয়েছে যে, এইচ-১বি ভিসার মতো কর্মসূচির মাধ্যমে ভারতীয় বংশোদ্ভূতরা মার্কিন নাগরিকদের চাকরি কেড়ে নিচ্ছেন। মার্কিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভারতবিরোধী বক্তব্য এখন চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পরপরই ট্রাম্প অনেক অনথিভুক্ত ভারতীয় অভিবাসীকে হাতকড়া ও শিকল পরিয়ে দেশে ফেরত পাঠান, যা ভারতে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়।
ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের দক্ষিণ এশিয়া কর্মসূচির পরিচালক মিলান বৈষ্ণব বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের কোনো প্রশাসনের সঙ্গে প্রকৃত নীতিগত মতপার্থক্য ভারত সরকার সহ্য করতে পারে। তবে তিনি বলেন, এ প্রশাসন এবং সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক মিত্রের কাছ থেকে ভারত ও ভারতীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিকদের বিরুদ্ধে যেসব আক্রমণ আসছে, তা স্পর্শকাতর জায়গায় আঘাত করেছে।
বৈষ্ণবসহ আরও কয়েকজন বিশ্লেষক আল-জাজিরাকে জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক সময়ে নয়াদিল্লি থেকে এমন সমালোচনা এলেও প্রতিক্রিয়া দেখানোর ক্ষেত্রে “প্রশংসনীয় সংযম” দেখিয়েছে মোদি সরকার।
২০২৫ সালে ট্রাম্প পুনরায় ক্ষমতায় ফেরার পর থেকে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে একের পর এক সংকট দেখা দিয়েছে, যার শেষ যেন নেই। এই টানাপোড়েনের কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর শুল্ক আরোপ, বাণিজ্য আলোচনা স্থবির হওয়া, রাশিয়ার কাছ থেকে ভারতের তেল কেনা বন্ধে ওয়াশিংটনের চাপ এবং ২০২৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধবিরতিতে মধ্যস্থতার বিষয়ে ট্রাম্পের বারবার দাবি, যা নয়াদিল্লি প্রত্যাখ্যান করেছে। এছাড়া ‘সন্ত্রাসবাদ’ নিয়ে ভারতের উদ্বেগ সত্ত্বেও পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠতা বাড়ানো এবং এইচ-১বি ভিসার ফি বৃদ্ধি ও অভিবাসনবিরোধী কঠোর পদক্ষেপ ভারতীয় কর্মীদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
“‘সন্ত্রাসবাদ’ নিয়ে ভারতের উদ্বেগের প্রতি ট্রাম্প প্রশাসন সংবেদনশীল আচরণ করেনি; দেশটির চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানের সঙ্গে তারা ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়েছে; নিজেদের স্বার্থকেন্দ্রিক বাণিজ্যনীতি অনুসরণ করেছে, যার অসামঞ্জস্যপূর্ণ চাপ পড়েছে বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর ওপর।”
একপর্যায়ে ট্রাম্পের আরোপ করা সর্বোচ্চ শুল্কের মুখে পড়া দেশগুলোর একটি হয়ে ওঠে ভারত। তবে গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট বহু দেশের ওপর ট্রাম্পের ব্যাপক শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত বাতিল করে দেন। এরপর দ্রুত বিকল্প পদক্ষেপ হিসেবে বিশ্বজুড়ে পণ্যের ওপর নতুন করে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে তাঁর প্রশাসন।
গত মাসে ট্রাম্প এমন একটি আইনে স্বাক্ষর করেন, যার আওতায় রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনা ভারতের মতো দেশগুলোর ওপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করতে পারে যুক্তরাষ্ট্র। তবে নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কায় এই পদক্ষেপ স্থগিত রাখেন তিনি। একই সঙ্গে ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার সঙ্গে আলোচনা চালু রাখার চেষ্টা করেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও চলতি সপ্তাহে ভারতের বাণিজ্যিক কেন্দ্র মুম্বাই সফর করলেও রাজধানী নয়াদিল্লি যাননি। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রুবিও দাবি করেন, “এসব শুল্কের কোনোটিই ভারতকে শাস্তি দেওয়া বা ক্ষতিগ্রস্ত করার উদ্দেশ্যে আরোপ করা হয়নি।”
রুবিওর যুক্তি, যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর পররাষ্ট্রনীতির হিসাবে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধও জড়িত। তিনি আরও বলেন, “ট্রাম্প শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত স্থগিত করার অন্যতম কারণ হলো, তিনি বুঝতে পেরেছেন, ওই পদক্ষেপে ভারতের সঙ্গে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্কে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ত।” তবে ভবিষ্যতে একই ধরনের পদক্ষেপের সম্ভাবনা নাকচ করেননি রুবিও। তাঁর ভাষায়, “আমার মনে হয়, প্রেসিডেন্ট এ বিষয়ে ভারসাম্য রক্ষার জন্য খুব চেষ্টা করছেন। তবে এটি বড় এক চ্যালেঞ্জ।”
ব্রাসেলসভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক প্রবীণ ডনথি আল-জাজিরাকে বলেন, “ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে ওয়াশিংটনে ভারত নিয়ে দুই দলের (ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান) মধ্যে যে ঐকমত্য ছিল, তা যেন শেষ হয়ে গেছে।”
২০২৫ সালে ট্রাম্প আবার ক্ষমতায় ফেরার পর থেকে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে একের পর এক সংকট দেখা দিয়েছে। এসব সংকটের যেন শেষ নেই।
ডনথি আরও বলেন, “ওয়াশিংটনের এই মনোভাব এতটাই জোরালো যে একে শুধু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ব্যক্তিগত অবস্থান বলা ভুল হবে; এটি প্রকৃতপক্ষে মার্কিন নীতিনির্ধারক মহলের সামগ্রিক মানসিকতারই বহিঃপ্রকাশ।” এই বিশ্লেষকের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের পদক্ষেপগুলো “ভারতের কৌশলগত মহলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি পুরোনো অবিশ্বাস ফিরিয়ে এনেছে”, যার শিকড় স্নায়ুযুদ্ধের সময়কার উত্তেজনায় প্রোথিত।
যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচন ট্রাম্পের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মেয়াদের শেষ দুই বছরে এসে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারালে প্রশাসনের নীতি ও কর্মকাণ্ডের ওপর নজরদারিতে ডেমোক্র্যাটদের ক্ষমতা বাড়বে। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের বাধানো ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়ে জ্বালানিসংকট তৈরি হয়েছে এবং চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে। এমন পরিস্থিতিতে ট্রাম্প তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে কম জনসমর্থনের মুখে পড়েছেন।
“ওয়াশিংটনের এই মনোভাব (ভারতবিরোধী) এতটাই জোরালো যে একে শুধু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ব্যক্তিগত অবস্থান বলা ভুল হবে; এটি প্রকৃতপক্ষে মার্কিন নীতিনির্ধারক মহলের সামগ্রিক মানসিকতারই বহিঃপ্রকাশ।”
কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের মিলান বৈষ্ণব বলেন, “ট্রাম্পের দাপট কিছুটা কমলে তা ভারতের স্বার্থের অনুকূল হবে।” তিনি আরও বলেন, “কংগ্রেসে অনেক ডেমোক্র্যাট, এমনকি রিপাবলিকানও আছেন, যাঁরা ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক সামলানোর ক্ষেত্রে এ প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে ক্ষুব্ধ। ভারতের রাজনীতি, অর্থনীতি ও পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে তাঁদের সমালোচনা থাকতে পারে। তবে শক্তিশালী ভারত-যুক্তরাষ্ট্র অংশীদারত্বের যৌক্তিকতায় সত্যিই বিশ্বাস করেন তাঁরা।”
বৈষ্ণবের মতে, কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের প্রাধান্য থাকলে ওয়াশিংটনের পররাষ্ট্রনীতিতে “ভারসাম্য আনার প্রভাব” পড়তে পারে। তবে ওয়াশিংটনভিত্তিক দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক বিশ্লেষক মাইকেল কুগেলম্যান মনে করেন, নির্বাচনের ফলাফলে ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতিতে পরিবর্তন আসবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। বিশেষ করে ভারতের ক্ষেত্রে এমন পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম বলে মনে করেন তিনি।
কুগেলম্যান বলেন, ট্রাম্প তাঁর মেয়াদের শেষ পর্যায়ে প্রবেশ করছেন এবং আইন অনুযায়ী তৃতীয় মেয়াদে নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না। তাই নয়াদিল্লির সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে তিনি এমন নীতিই অনুসরণ করবেন, যা তাঁর বিবেচনায় যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক স্বার্থ সবচেয়ে ভালোভাবে এগিয়ে নেবে। তিনি আরও বলেন, “যদি তাঁর (ট্রাম্প) মনে হয়, ভারতের ওপর আরও শুল্ক আরোপের হুমকি দিলে সেই স্বার্থ এগিয়ে নেওয়া যাবে, তাহলে তিনি তা-ই করবেন।”
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের প্রবীণ ডনথি আল-জাজিরাকে বলেন, ট্রাম্প ক্ষমতা ছাড়ার পর ভারত আশা করবে যে দুই দেশের সম্পর্কের উন্নতি হবে এবং ওয়াশিংটন আরও ধৈর্যশীল ও কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এগোবে। তবে এর মধ্যবর্তী সময়ে ট্রাম্পের ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়লেও ভারত যে স্বস্তি পাবে, তা নিশ্চিত নয়। কারণ, ট্রাম্পপন্থী রিপাবলিকানদের মধ্যে ভারতকে চাপে রাখার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বৃহত্তর ঐকমত্য রয়েছে বলে মনে হচ্ছে।
নয়াদিল্লির কাছে এই পরিস্থিতি মাত্র কয়েক বছর আগের তুলনায় বড় ধরনের পরিবর্তন। ২০২৪ সালের নির্বাচনে ট্রাম্প জয়ের কয়েক দিন পর ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করকে হাসিমুখে বলতে শোনা গিয়েছিল, “আজ যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়ে অনেক দেশই উদ্বিগ্ন। তবে খোলাখুলি বললে, আমরা (ভারত) তাদের মধ্যে নেই।”
আজ সেই হাসি আর নেই।