বনাঞ্চল কমে যাওয়ায় এবং খাবারের প্রাকৃতিক উৎস হ্রাস পাওয়ায় তীব্র খাদ্যসংকটের মুখে পড়েছে যশোরের কেশবপুরের বিরল প্রজাতির কালোমুখো হনুমানগুলো। ক্ষুধার তাড়নায় তারা এখন নিয়মিত লোকালয়ে ভিড় করছে। খাবারের সন্ধানে দল বেঁধে এই প্রাণীগুলো ঢুকে পড়ছে সরকারি অফিস, হাসপাতাল, সাধারণ মানুষের বাসাবাড়ি এবং বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে। এমনকি দোকান থেকে বিস্কুট ও চিপসসহ বিভিন্ন খাবারের প্যাকেট ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনাও ঘটছে। এই পরিস্থিতিতে কেউ তাদের খাবার দিয়ে সাহায্য করছেন, আবার কেউ লাঠি দিয়ে তাড়িয়ে দিচ্ছেন, যার ফলে অনেক হনুমান আহত হচ্ছে। কখনো কখনো বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে প্রাণ হারাচ্ছে এই প্রাণীগুলো। এমনকি গুরুতর আহত অবস্থায় চিকিৎসার জন্য মানুষের কাছে সাহায্য চাইতে দেখা যাচ্ছে তাদের।

কেশবপুরের এই ঐতিহ্যবাহী কালোমুখো হনুমানদের দেখতে প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দর্শনার্থীরা ভিড় করছেন। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই বিরল প্রাণীদের প্রকৃত সংখ্যা কত, সে বিষয়ে সরকারি কোনো সঠিক হিসাব নেই এবং তদারকিরও যথেষ্ট অভাব রয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের ধারণা, বর্তমানে কেশবপুর ও এর আশপাশের এলাকায় প্রায় চার শতাধিক হনুমান বিচরণ করছে। গত বছর এই সংখ্যা ছিল ২৫০ থেকে ৩০০ এর মধ্যে। বন বিভাগ থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ খাবার সরবরাহ করা হলেও তা সীমিত কিছু এলাকায় পৌঁছাচ্ছে, যার ফলে সামগ্রিক খাদ্যসংকট আরও বাড়ছে। এই অবস্থায় স্থানীয়রা দাবি জানিয়েছেন, দ্রুত হনুমান গণনা করে তাদের বিচরণস্থল অনুযায়ী পর্যাপ্ত খাবারের ব্যবস্থা করতে এবং নিরাপদ আবাসস্থল নিশ্চিত করতে হবে।

স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, আদিকাল থেকেই কেশবপুরের ভোগতী, বালিয়াডাঙ্গা, মধ্যকুল, ক্ষতিয়াখালী, সুজাপুর, ব্রহ্মকাটি, আলতাপোল, বায়সা, রামচন্দ্রপুর ও মাগুরাডাঙ্গা এলাকায় কালোমুখো হনুমানের বিচরণ ছিল। পাশাপাশি মণিরামপুর উপজেলার মুজগুন্নী ও দুর্গাপুর এলাকাতেও তাদের দেখা যায়। কিন্তু বনজ সম্পদ ও প্রাকৃতিক খাদ্যের উৎস কমে যাওয়ায় হনুমানগুলো এখন আগের চেয়ে বেশি লোকালয়মুখী হচ্ছে এবং কেশবপুরের গণ্ডি পেরিয়ে আশপাশের এলাকাতেও ছড়িয়ে পড়ছে।

বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, প্রতিদিন হনুমানদের জন্য ৪৭ কেজি ২০০ গ্রাম কলা, ৬ কেজি ৭০০ গ্রাম পাউরুটি, ৭ কেজি ৩৫০ গ্রাম বাদাম ও ৭ কেজি সবজি সরবরাহ করা হয়। তবে এই পরিমাণ খাবার থাকা সত্ত্বেও তা সব বিচরণস্থলে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না। খাদ্য সরবরাহকারী ভ্যানচালক আতিয়ার রহমান জানান, উপজেলা সদর, হাসপাতাল, বালিয়াডাঙ্গা, ক্ষতিয়াখালী, মাগুরাডাঙ্গা ও বাঁকাবর্শী-নতুনহাট এলাকায় খাবার পৌঁছে দেওয়া হয়। এর বাইরে অন্য এলাকায় নিয়মিত খাবার সরবরাহ করা সম্ভব হয় না।

সম্প্রতি খাবারের সন্ধানে বেরিয়ে আহত একটি হনুমান কেশবপুর শহরের ত্রিমোহিনী মোড়ে এসে মানুষের সাহায্য চাইতে থাকে। স্থানীয় সংবাদকর্মী আব্দুর রহমান কাছে যেতেই হনুমানটি তার কাঁধে উঠে বসে। পরে তিনি দ্রুত পাশের একটি ফার্মেসিতে নিয়ে হনুমানটির চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন। এই ঘটনাটি স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। তাদের মতে, খাদ্যসংকট ও বিচরণস্থলের নিরাপত্তাহীনতার কারণে হনুমানগুলো প্রতিনিয়ত ঝুঁকির মুখে পড়ছে।

কেশবপুর শহরের সাহাপাড়ার খ্রিস্টান মিশন-সংলগ্ন মুদি দোকানি বিশ্বজিৎ বলেন, ‘সম্প্রতি আমাদের এলাকায় হনুমানের সংখ্যা অনেক বেড়েছে। প্রায়ই দোকান থেকে বিস্কুট, পটেটো চিপস ও বাজারের প্যাকেট নিয়ে যায়। আগের তুলনায় অনেক বেশি হনুমান এসেছে। পর্যাপ্ত খাবার না পেয়ে তারা দোকানেও হানা দিচ্ছে। এতে দোকানদারদেরও ভোগান্তি হচ্ছে।’

কেশবপুরে হনুমান দেখতে আসা দর্শনার্থী মিল্টন শেখ বলেন, “এখানকার কালোমুখো হনুমান দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এগুলো দেখতে আসে। কিন্তু লোকালয়ে খাবারের জন্য তাদের ছোটাছুটি করতে দেখে খারাপ লাগে। পর্যাপ্ত খাবার ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।”

আরেক দর্শনার্থী সাবেরুল হক বলেন, “হনুমানগুলোকে রাস্তাঘাট, দোকানপাট ও মানুষের বাড়িতে খাবারের সন্ধানে ঘুরতে দেখা যাচ্ছে। কেউ খাবার দিচ্ছেন, আবার কেউ তাড়িয়ে দিচ্ছেন। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে। বন বিভাগ ও প্রশাসনের উচিত নিয়মিত খাবার সরবরাহের পাশাপাশি তাদের নিরাপত্তায় কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া।”

দর্শনার্থী শারমিন সুলতানা ও মৌলি আক্তারের ভাষ্য মতে, কেশবপুর নাম আসলে সবার আগে কালোমুখি হনুমান নাম আসে। কিন্তু তাদের রক্ষণাবেক্ষণ বা দেখা শোনার অভাবে বিরল প্রজাতি এ হনুমান আজ হুমকির মুখে পড়েছে।

উপজেলা বন বিভাগের কর্মকর্তা সমীরণ বিশ্বাস বলেন, “সম্প্রতি কেশবপুরে হনুমানের সংখ্যা বেড়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, বর্তমানে চার শতাধিক হনুমান রয়েছে। আনুষ্ঠানিকভাবে গণনা করা হলে সঠিক সংখ্যা জানা সম্ভব হবে। আমরা চেষ্টা করছি বিরল প্রজাতি এ হনুমানগুলোর সঠিকভাবে দেখাশোনা করার।”

এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন বলেন, “উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় হনুমান ছড়িয়ে পড়ছে। উপজেলা প্রশাসন বা বিভিন্ন গবেষণা দলের মাধ্যমে তাদের সংখ্যা ও পরিস্থিতি সম্পর্কে খোঁজ নেওয়া হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী হনুমানের খাবারের ব্যবস্থা করতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে উদ্যোগ নেওয়া হবে।”