সুনামগঞ্জে পুলিশের হেফাজতে থাকাকালীন শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের এক নেতার পরিবারের। তবে পুলিশ এই অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করে দাবি করেছে, ওই যুবক আগে থেকেই শারীরিক দুর্বলতা এবং খিঁচুনির সমস্যায় ভুগছিলেন। থানাহাজতে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় তিনি হঠাৎ পড়ে যান বলে পুলিশ জানিয়েছে।

অভিযোগের কেন্দ্রে থাকা ওই ছাত্রলীগ নেতার নাম শাহনেওয়াজ চৌধুরী প্রিন্স (১৯)। তিনি সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন বলে জানা গেছে। তার বাবার নাম শাহরুখ রাজা চৌধুরী। তাদের আদি নিবাস সুনামগঞ্জ শহরের তেঘরিয়া এলাকায় হলেও বর্তমানে তারা শহরের নতুনপাড়া আবাসিক এলাকায় বসবাস করছেন।

পরিবারের সদস্যদের দাবি, গত বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) রাতে নতুনপাড়ার বাসা থেকে শাহনেওয়াজকে আটক করে সুনামগঞ্জ সদর মডেল থানায় নিয়ে যায় পুলিশ। সেখানে থাকাকালীন তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। গভীর রাতেই তাকে প্রথমে সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং পরবর্তীতে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিলেটে স্থানান্তর করা হয়। বর্তমানে তিনি সিলেটের সুবিদবাজার এলাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন বলে জানিয়েছে তার পরিবার।

শাহনেওয়াজের বাবা শাহরুখ রাজা চৌধুরী জানান, বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে সদর মডেল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) জাকারিয়ার নেতৃত্বে একদল পুলিশ তাদের নতুনপাড়ার বাসায় উপস্থিত হয়। ওসি রতন শেখের সঙ্গে দেখা করানোর কথা বলে তার ছেলেকে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়।

তিনি বলেন, “রাত দেড়টার দিকে পরিচিত একজনের কাছ থেকে জানতে পারেন, তার ছেলে অচেতন অবস্থায় হাসপাতালে পড়ে আছেন।” খবর পেয়ে পরিবারের সদস্যরা দ্রুত হাসপাতালে ছুটে যান। পরে আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাকে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে যথাযথ চিকিৎসার ব্যবস্থা না হওয়ায় তাকে সুবিদবাজারের কুইন্স নামের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয় বলে দাবি করেন তিনি।

শাহরুখ রাজা চৌধুরীর অভিযোগ, তার ছেলে জামিনে থাকা সত্ত্বেও বাসা থেকে ধরে নিয়ে যাওয়ার প্রায় দুই ঘণ্টার মধ্যেই অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে পড়ে ছিলেন। তার দাবি, ছেলে বর্তমানে রাজনীতির সঙ্গে জড়িত নন। চলতি বছর সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছেন তিনি। এর আগে একটি মামলায় আটক অবস্থায় কারাগার থেকে পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন বলেও জানান তার বাবা।

নির্যাতনের অভিযোগ অস্বীকার পুলিশের

সুনামগঞ্জ সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রতন শেখ এই নির্যাতনের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, শাহনেওয়াজ চৌধুরীর বিরুদ্ধে তিনটি মামলা রয়েছে। এসব মামলার আসামি হিসেবে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

তিনি বলেন, “সে দুর্বল ও আগে থেকেই খিঁচুনির রোগী ছিল। থানাহাজতে দাঁড়ানো অবস্থায় পড়ে যায়। তার শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন নেই। তাকে কোনো নির্যাতন করা হয়নি।”

ওসি আরও দাবি করেন, থানার সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে শাহনেওয়াজের থানায় আসা এবং পড়ে যাওয়ার ঘটনার দৃশ্য সংরক্ষিত রয়েছে। তার ভাষ্যমতে, বৃহস্পতিবার রাতে অসুস্থ হয়ে পড়লে শাহনেওয়াজকে প্রথমে সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে চিকিৎসক তাকে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তরের পরামর্শ দেন। তবে পরিবার তাকে একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা করাচ্ছে বলে জানান তিনি।

গ্রেপ্তারের আগের ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে

এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে দেখা যায় বাসা থেকে গ্রেপ্তারের আগে শাহনেওয়াজ পুলিশ সদস্যদের বলছেন, “স্যার, আমি কয়েক দিন পর আত্মসমর্পণ করব।” জবাবে এক পুলিশ সদস্যকে বলতে শোনা যায়, “বোকা ছেলের মতো কথা বলো। দুদিন পরে তুমি পাশ করলে আমরা মিষ্টি খাওয়াব, সমস্যা নাই।”

শাহনেওয়াজ যখন নিজের ক্যারিয়ার নষ্ট হওয়ার আশঙ্কার কথা বলেন, তখন ওই পুলিশ সদস্যকে বলতে শোনা যায়, “ক্যারিয়ার তো এমনিতেই নাই। ক্যারিয়ার তো শেষ হয়ে গেছে।”

অন্যদিকে, শাহনেওয়াজের ছোট ভাই ফাহিম রাজা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ওসিকে গালিগালাজ ও হুমকি দিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়ে ওসি রতন শেখ জানান, এমন ঘটনা ঘটে থাকলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।