আগামীকাল শনিবার জার্মানির বিভিন্ন শহরে বড় ধরনের বিক্ষোভ কর্মসূচি পালনের ডাক দেওয়া হয়েছে। মূলত শিক্ষা খাতের উন্নয়ন, জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় এবং সামরিক খাতে সরকারি ব্যয়ের অস্বাভাবিক বৃদ্ধির প্রতিবাদে তরুণ প্রজন্মের এই আন্দোলনের আয়োজন বলে জানা গেছে। তবে এই ‘জেন-জি’ আয়োজিত বিক্ষোভের প্রতি অনেকে সংহতি প্রকাশ করলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংগঠনগুলো এখন পর্যন্ত এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হতে রাজি হয়নি।
সম্প্রতি ফ্রান্সসহ ইউরোপের বেশ কিছু দেশে বিক্ষোভ কর্মসূচি সহিংস রূপ নেওয়ায় জার্মানিতেও আগামীকালের কর্মসূচি ঘিরে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি যাতে নিয়ন্ত্রণের বাইরে না যায়, সেজন্য বিভিন্ন শহরের প্রশাসন ও কর্তৃপক্ষ সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ইউরোপের বিভিন্ন প্রান্তে একের পর এক গণবিক্ষোভের ঢেউ দেখা গেছে। ফ্রান্স, ইতালি, স্পেন, পর্তুগাল ও আলবেনিয়ায় হাজার হাজার মানুষ রাজপথে নেমেছেন। এসব আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া। তবে অনেক ক্ষেত্রে এই বিক্ষোভগুলো সহিংস হয়ে ওঠে, যেখানে দোকানপাটে লুটতরাজ, ব্যারিকেডে অগ্নিসংযোগ এবং নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলার মতো ঘটনা ঘটেছে।
জার্মানিতে এই আন্দোলনের নেপথ্যে কারা রয়েছেন, তা এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। ‘জেন–জি’ নামের একটি উদ্যোগের মাধ্যমে বিক্ষোভের ডাক দেওয়া হলেও এর সাংগঠনিক কাঠামো নিয়ে রহস্য রয়ে গেছে। এমনকি বিক্ষোভ উদ্যোক্তাদের ওয়েবসাইটে দেওয়া যোগাযোগের ঠিকানা গত এক সপ্তাহের মধ্যে দুইবার পরিবর্তন করা হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার সেখানে সুইজারল্যান্ডের একটি ঠিকানার উল্লেখ ছিল।
আগামীকালের এই কর্মসূচি ছড়িয়ে দিতে টিকটক, ইনস্টাগ্রাম এবং টেলিগ্রামের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে দেশব্যাপী এবং স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক প্রচার চালানো হচ্ছে।
জার্মানির এআরডি টেলিভিশন অনলাইন সংবাদে জানিয়েছে, বিক্ষোভকারীদের সাংগঠনিক কাঠামোর এই অস্পষ্টতার কারণে জার্মানির ফেডারেল ছাত্রপ্রতিনিধি সংগঠন ‘বুন্দেশ সুলার কনফারেন্স’ প্রস্তাবিত এই বিক্ষোভ থেকে নিজেদের সরিয়ে নিয়েছে। তবে তারা আগামী ২০ নভেম্বর বার্লিনে নিজস্ব উদ্যোগে একটি পৃথক প্রতিবাদ কর্মসূচি পালনের পরিকল্পনা করছে, যেখানে শিক্ষক এবং অন্যান্য যুব আন্দোলনের প্রতিনিধিরাও অংশ নেবেন বলে জানা গেছে।
বার্লিনের ফ্রাই ইউনিভার্সিটির আন্তবিষয়ক শান্তি ও সংঘাত গবেষণাকেন্দ্রের গবেষক ইয়ানিস ইউলিয়ান গ্রিমের মতে, নতুন কোনো প্রতিবাদ আন্দোলনের ক্ষেত্রে শিথিল সাংগঠনিক কাঠামো অস্বাভাবিক কোনো বিষয় নয়। তিনি বলেন, “বিশেষ করে আন্দোলনের প্রাথমিক পর্যায়ে ব্যক্তিগত যোগাযোগ, অনানুষ্ঠানিক নেটওয়ার্ক এবং ডিজিটাল যোগাযোগমাধ্যমের ভিত্তিতেই বিক্ষোভের সূচনা হয়। সুস্পষ্ট দায়িত্ব বণ্টন, নির্দিষ্ট মুখপাত্র, পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক কর্মসূচিসহ একটি সুসংগঠিত কাঠামো তৈরি হতে অনেক সময় লাগে।” উদাহরণ হিসেবে তিনি ‘ ফ্রাইডে ফর ফিউচার’ আন্দোলনের কথা উল্লেখ করেন।
বিক্ষোভকারীরা তাদের দাবির কথা জানিয়ে ওয়েবসাইটে ছয়টি নির্দিষ্ট পয়েন্ট তুলে ধরেছেন। প্রথম দাবি হলো, “শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মাদকাসক্তি নিরাময় সহায়তা এবং মনোচিকিৎসার জন্য অর্থ বরাদ্দ বাড়াতে হবে; এসব খাতে বাজেট কমানো চলবে না।” দ্বিতীয় দাবি হিসেবে বলা হয়েছে, “সবার জন্য জীবনযাত্রার ব্যয় সহনীয় করতে হবে। সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন সংকট ও উদ্বেগকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।” তৃতীয় দাবিতে বলা হয়েছে, “তরুণ প্রজন্মের ওপর সাশ্রয়ের বোঝা চাপিয়ে না দিয়ে সমাজের সব শ্রেণির মধ্যে ব্যয়ের দায়িত্ব ন্যায্যভাবে বণ্টন করা হচ্ছে”। চতুর্থ দাবিটি হলো, “সামরিক খাতে ব্যয় হ্রাস ও বাধ্যতামূলকভাবে ১৮ বছর বয়স পার হলে, সামরিক প্রশিক্ষণে নিয়োগের বিরোধিতা বা তরুণদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে তাদের মতামত ছাড়া কোনো সিদ্ধান্ত না নেওয়া।” পঞ্চম দাবিতে বলা হয়েছে, “মৌলিক অধিকার রক্ষা করতে নজরদারি ব্যবস্থা ক্রমাগত সম্প্রসারণ করা চলবে না।” এবং ষষ্ঠ ও শেষ দাবিটি হলো, “ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এখনই কার্যকর জলবায়ু সুরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।”
ইউরোপের তরুণদের মধ্যে রাজনৈতিক অসহায়ত্ব ও অনিশ্চয়তার একটি সাধারণ অভিজ্ঞতা কাজ করছে বলে মনে করেন গবেষক গ্রিম। তিনি বলেন, “বিগত কয়েক বছর ধরে সামাজিক বৈষম্য ক্রমশ বাড়ছে, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং অনেক দেশে শিক্ষাব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে পর্যাপ্ত অর্থায়নের অভাবে সংকটে রয়েছে। অন্যদিকে জলবায়ু সংকটের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব, আগামীতে সবচেয়ে বেশি বহন করতে হবে তরুণ প্রজন্মকে।”
অন্যদিকে, জার্মানির পরিবেশবাদী সবুজ দলের সভাপতি ফেলিক্স বানাসাক আন্দোলনকারীদের সন্দেহভাজন হিসেবে দেখার বিরুদ্ধে সতর্ক করেছেন। জার্মানির সংবাদমাধ্যম নেটওয়ার্ক আরএনডির সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, আগেভাগেই এই বিক্ষোভকে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড হিসেবে তুলে ধরা এবং আন্দোলনকারীদের সহিংস গোষ্ঠীর সঙ্গে এক করে দেখার প্রবণতা বরং কিছু মানুষকে আরও উগ্রপন্থার দিকে ঠেলে দিতে পারে। তাঁর মতে, এর পরিবর্তে তরুণদের ন্যায্য দাবিগুলো নিয়ে রাজনৈতিকভাবে গঠনমূলক আলোচনা করা উচিত।
নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ সম্ভাব্য সব পরিস্থিতি বিবেচনা করলেও এখন পর্যন্ত বিশেষ উদ্বেগের কথা জানায়নি। জার্মানির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, বিক্ষোভে সহিংসতার জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো আহ্বান এখন পর্যন্ত তাদের নজরে আসেনি। তবে বামপন্থী চরমপন্থী কিছু গোষ্ঠী এবং বিদেশের কয়েকটি সংগঠন এই বিক্ষোভের আহ্বানকে সমর্থন করে প্রচার চালাচ্ছে এবং জার্মানিতেও ওই ধরনের সহিংস আন্দোলনের প্রচারে যুক্ত হয়েছে বলে জানা গেছে।