যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পাদিত বাণিজ্যচুক্তি এবং চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ইজারা দেওয়ার চুক্তিসহ সকল অসম বৈদেশিক চুক্তি বাতিলের দাবিতে এক বিশাল সমাবেশ করেছে সাম্রাজ্যবাদ ও যুদ্ধবিরোধী জোট। আজ শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এই সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।

সমাবেশ থেকে ফুলবাড়ীতে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লাখনি খননের উদ্যোগ এবং সুন্দরবনের পরিবেশ ধ্বংস করে এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনার তীব্র প্রতিবাদ জানানো হয়। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সামরিক জোটে বাংলাদেশকে অন্তর্ভুক্ত করার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা অবিলম্বে বন্ধ করার দাবি জানান বক্তারা।

আন্দোলনের অংশ হিসেবে আগামী দুই মাসব্যাপী জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সভা-সমাবেশ, পদযাত্রা এবং ব্যাপক গণসংযোগ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। জোটের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই সময়ের মধ্যে তাদের দাবিগুলো মানা না হলে আগামী ২৯ ডিসেম্বর ঢাকায় এক মহাসমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। সেই সমাবেশ শেষে বিক্ষোভ মিছিল করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় অভিমুখে যাত্রা এবং স্মারকলিপি পেশ করার কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে।

সমাবেশটির সভাপতিত্ব করেন সাম্রাজ্যবাদ ও যুদ্ধবিরোধী জোটের সমন্বয়ক ও বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ। অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন জোটের কেন্দ্রীয় নেতা ও বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সভাপতি সাজ্জাদ জহির চন্দন, ফ্যাসিবাদবিরোধী বাম মোর্চার সমন্বয়ক ও সাম্যবাদী আন্দোলনের সমন্বয়ক শুভ্রাংশু চক্রবর্ত্তী, বাংলাদেশের বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগের সাধারণ সম্পাদক ইকবাল কবির জাহিদ, বাংলাদেশ জাসদের স্থায়ী কমিটির সদস্য মুশতাক হোসেন, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (মার্ক্সবাদী)-এর প্রধান সমন্বয়ক মাসুদ রানা, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টির সাধারণ সম্পাদক মোশরেফা মিশু, বাসদের (মাহবুব) নেতা হারুনার রশীদ ভূঁইয়া, বাংলাদেশের সোশ্যালিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক পার্টির নির্বাহী সভাপতি আবদুল আলী এবং জাতীয় গণফ্রন্টের রজত হুদা। পুরো সমাবেশটি পরিচালনা করেন সিপিবির সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ আল ক্কাফী রতন।

এই সমাবেশে প্রবীণ বামপন্থী নেতা মঞ্জুরুল আহসান খান, খালেকুজ্জামান, মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, মো. শাহ আলম, অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ, সিপিবির রুহিন হোসেন (প্রিন্স), কবি মোহন রায়হানসহ বিভিন্ন ছাত্র, যুব, নারী, শ্রমিক, কৃষক, সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। সমাবেশে লিখিত ঘোষণা, প্রস্তাবনা ও বিস্তারিত আন্দোলনের কর্মসূচি পাঠ করেন বজলুর রশীদ ফিরোজ।

সমাবেশে বক্তারা অভিযোগ করেন যে, অন্তর্বর্তী সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যে অধীনতামূলক বাণিজ্যচুক্তি করেছে, তা দেশের অর্থনীতি, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় নিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ফেলেছে। তাঁদের দাবি, বর্তমান বিএনপি সরকার জনমতকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে ওই চুক্তি বাস্তবায়ন করছে। জামায়াতে ইসলামী এবং এনসিপিসহ ১১–দলীয় জোটও এই চুক্তির বিরোধিতা না করে কার্যত একে সমর্থন দিচ্ছে বলে তাঁরা মন্তব্য করেন।

দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরের টার্মিনালগুলো ধারাবাহিকভাবে বিদেশি কোম্পানির কাছে ইজারা দেওয়া হচ্ছে বলে সমাবেশে অভিযোগ তোলা হয়। নেতারা বলেন, এর ফলে দেশের অর্থনীতির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো বন্দরের ওপর বিদেশি কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

বক্তারা আরও বলেন, গণ–অভ্যুত্থানের সময় ‘দিল্লি না ঢাকা’ স্লোগান দেওয়া হলেও বর্তমান সরকার এখন ‘সবার আগে আমেরিকা’ নীতি অনুসরণ করছে। তাঁদের অভিযোগ, এক সাম্রাজ্যবাদী শক্তির প্রভাব থেকে বেরিয়ে শাসকগোষ্ঠী এখন অন্য একটি শক্তির কাছে দেশকে নির্ভরশীল করে তুলছে। মেট্রোরেল প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি এবং দিল্লির একটি কোম্পানিকে এর ঠিকাদারি কাজ দেওয়ার বিষয়টিরও তীব্র সমালোচনা করেন তাঁরা।

নেতারা স্পষ্ট করে বলেন, ফুলবাড়ীতে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লাখনি এবং সুন্দরবন ধ্বংস করে এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগের বিরুদ্ধে তাঁদের কঠোর অবস্থান রয়েছে। আন্তর্জাতিক সামরিক জোটে বাংলাদেশকে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ বন্ধের দাবিও জানান তাঁরা। বিশ্বজুড়ে সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ ও আগ্রাসনের প্রতিবাদ জানিয়ে পুঁজিবাদ, সাম্রাজ্যবাদ ও মৌলবাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ গণ–আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানান বক্তারা।

সমাবেশের শুরুতে উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, বিবর্তন সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের শিল্পীরা গণসংগীত পরিবেশন করেন। এছাড়া আবৃত্তি করেন হাসান ফখরী।