ঢাকার সাভারে জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টের অর্থায়নে পরিচালিত সরকারি খাস পুকুর খনন, সংস্কার ও সৌন্দর্যবর্ধন প্রকল্পের মাটি রাতের আঁধারে কেটে ইটভাটায় বিক্রির অভিযোগ উঠেছে ঢাকা জেলা ছাত্রদলের সভাপতি ও সাভার উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী মোহাম্মদ তমিজ উদ্দিনের বিরুদ্ধে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে জিম্মি করে রাতের অন্ধকারে ভেকু মেশিনের সাহায্যে মাটি কেটে নেওয়া হচ্ছে। সেই মাটি পরবর্তীতে ইটভাটায় বিক্রি করা হয়। এই অনিয়মের ফলে আশপাশের মানুষের বসতবাড়ি, কৃষি জমি ও চলাচলের রাস্তা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। স্থানীয়রা এই কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ জানালেও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে তমিজ উদ্দিন ও তার অনুসারীরা এই কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন বলে জানা গেছে।
নিরাপত্তার স্বার্থে নাম প্রকাশ না করে এক ভুক্তভোগী বলেন, “আমাদের বসতভিটার চারপাশের মাটি পর্যন্ত কেটে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। পুকুরের কোনো পাড় রাখা হয়নি। ফলে আমাদের ঘরবাড়ি ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। অথচ প্রতিবাদ করলে নানা ধরনের হুমকি ও হয়রানির শিকার হতে হয়। ছাত্রদল সভাপতি তমিজ এই মাটি বিক্রির সঙ্গে জড়িত।”
মাটি কাটার প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত স্থানীয় মনির জানান, পুরো কার্যক্রমের সঙ্গে ঢাকা জেলা ছাত্রদলের সভাপতি তমিজ উদ্দিনের সরাসরি সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। কাটা মাটি বর্তমানে আশুলিয়ার কন্ডার এলাকায় অবস্থিত ‘এমেইলি’ নামের একটি ইটভাটায় সরবরাহ করা হচ্ছে। প্রতি ট্রাক মাটি ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা দরে বিক্রি করা হচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন।
উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের বাস্তবায়নে এবং বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টের অর্থায়নে চারটি প্যাকেজে মোট ২ কোটি ৬১ লাখ ৭১ হাজার ৩৫০ টাকা বরাদ্দে সাভারের ১৮টি খাস পুকুর ও জলমহাল সংস্কারের প্রকল্প নেওয়া হয়। ২০২৫ সালের ১২ নভেম্বর কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছিল এবং চলতি বছরের ১৬ জুনের মধ্যে কাজ শেষ করার সময়সীমা নির্ধারিত ছিল। তবে নির্ধারিত সময় পার হলেও কোনো পুকুরের কাজই সম্পূর্ণ হয়নি। পরবর্তীতে প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়।
প্রকল্পের তথ্যানুসারে, প্রকল্প-৪-এর আওতায় শিমুলিয়া কাচারিবাড়ি, দেওয়ানবাড়ি, বদরউদ্দিন খান, তাজপুর, কবিরপুর ভুনাবাড়ি, বাইদগাঁও জিয়াস, কোনাপাড়া কচুশাক ও বাসাইদ পুকুর খননের কাজের জন্য ৫৯ লাখ ২১ হাজার ৮৫০ টাকায় মাদারীপুরের বিসিক এলাকার ‘মেসার্স হাজী শরিয়ত উল্লাহ ট্রেডার্স’-কে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। এর মধ্যে আশুলিয়ার ধামসোনা ইউনিয়নের সুগন্ধি এলাকার দেওয়ানবাড়ি পুকুর সংস্কারকাজের জন্যই প্রায় নয় লাখ টাকা বরাদ্দ রয়েছে।
এই বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘মেসার্স হাজী শরিয়ত উল্লাহ ট্রেডার্স’-এর প্রতিনিধি মিজান জানান, বিষয়টি সম্পর্কে তিনি বিস্তারিত কিছু জানেন না। তবে মাটি কাটার সঙ্গে ছাত্রদল সভাপতির লোকজন বা তাদের অনুসারী সাউদিরা জড়িত বলে তিনি নিশ্চিত করেন।
হতাশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, “আসলে কিছুই বলার নেই। আমরা এখন নীরব। যে যেভাবে করছে, আমি সেভাবেই করছি। আমি ওখানে কবে গেছি, মনে নেই। খুব বেশি যাই না।”
অভিযুক্ত ঢাকা জেলা ছাত্রদলের সভাপতি তমিজ উদ্দিনের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে কিছুই জানেন না বলে দাবি করেন। তবে এর কিছু সময় পর জনি দেওয়ান পরিচয়ে একজন ব্যক্তি বিষয়টি মীমাংসা বা বসে কথা বলার প্রস্তাব দেন। তিনি আরও জানান, সভাপতি তমিজ উদ্দিন তাকে ফোন করে প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলার নির্দেশনা দিয়েছেন।
মাটি কাটার অভিযোগের বিষয়ে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির দপ্তর সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম ও সহদপ্তর সম্পাদক আরিফুল ইসলাম আরিফকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তারা কেউ ফোন রিসিভ করেননি। এমনকি খুদে বার্তা পাঠিয়েও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
মাটি কাটার বিষয়ে সাভার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম জানান, উপজেলায় চারটি প্যাকেজে পুকুর খননের কাজ চলছে। এর মধ্যে অনেকগুলোর কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে, কয়েকটি আংশিক অবস্থায় রয়েছে এবং কিছু পুকুরে প্রাথমিক পর্যায়ের খননকাজ চলছে।
তিনি আরও বলেন, “পুকুর খনন করতে গিয়ে বেশকিছু সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং দীর্ঘদিন ধরে পুকুর দখলে রাখা ব্যক্তিদের প্রভাবও রয়েছে। এসব সমস্যা একে একে সমাধান করে কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে ঠিকাদারদেরও কিছু সমস্যা থাকে। পুকুরের পাড়ে দেওয়ার কথা এমন মাটি কিংবা অন্যান্য কাজের পর অতিরিক্ত থেকে যাওয়া মাটি অনেক সময় ঠিকাদারেরা গোপনে বিক্রির চেষ্টা করেন।”
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরও জানান, মাটি কেটে বিক্রির অভিযোগ পেলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ বিষয়ে আইনগত যে প্রক্রিয়া রয়েছে, সে অনুযায়ী অতিরিক্ত মাটি বিক্রি বা অন্যান্য কার্যক্রমের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।