প্রয়োজনীয় সব দক্ষতাই কেবল পাঠ্যবই বা সিলেবাসে থাকবে, কিংবা শিক্ষক সবকিছু হাতে-কলমে শিখিয়ে দেবেন—সেই আশায় বসে থাকার দিন এখন শেষ। বর্তমান সময়ে নিজেদের যোগ্য করে গড়ে তুলতে ব্যক্তিগত উদ্যোগের কোনো বিকল্প নেই। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-নির্ভর পৃথিবীতে এই বিষয়টি এখন আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নিজেদের কীভাবে প্রস্তুত করছেন, সেই বিষয়ে খোঁজ নিয়েছেন আমিনা মুমতারিন।

শাহ্‌রিন ইসলাম, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী। তার মতে, এআইয়ের যুগে নিজেকে প্রস্তুত করার অর্থ হলো প্রযুক্তির সাথে তাল মিলিয়ে নিজের জ্ঞান, চিন্তা ও সৃজনশীলতাকে আরও সমৃদ্ধ করা। তিনি বলেন, “এআইয়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতা নয়; বরং বন্ধুত্ব করে কৌশলে তাকে কাজে লাগাতে চাই। এআই কিছু চাকরির জন্য হুমকি হলেও মানুষের মতো যুক্তিনির্ভর চিন্তা করতে পারে না। এ কারণে প্রম্পট ইঞ্জিনিয়ারিং শেখার পরিকল্পনা আছে। বিশেষ করে ইউটিউবে এখন বিভিন্ন ফ্রি কোর্স সহজেই পাওয়া যায়। পাশাপাশি নোটবুকএলএম, পারপ্লেক্সিটি ও জেস্টোরের মতো প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে গবেষণার দক্ষতাও বাড়াচ্ছি। কারণ, এআই তথ্য দিতে পারলেও কোনটি প্রয়োজনীয়, তা বোঝে না এবং সব সময় নির্ভুল তথ্যও দেয় না। তথ্যের প্রাসঙ্গিকতা, নির্ভরযোগ্যতা ও যথার্থতা যাচাইয়ে মানুষের নিজস্ব জ্ঞান ও বিচারবোধ অপরিহার্য।”

শাহ্‌রিন মনে করেন, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে যুক্তিনির্ভর চিন্তা ও সৃজনশীলতার পাশাপাশি এআইভিত্তিক দক্ষতা অর্জন করা বাধ্যতামূলক হয়ে উঠবে। একই সাথে মানুষের প্রতিভা ও সৃজনশীলতার ওপর নির্ভরশীল শিল্পক্ষেত্রগুলোর আরও বিকাশ ঘটতে পারে। পরিশেষে তিনি মনে করেন, ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে মানুষ কতটা দায়িত্বশীলভাবে প্রযুক্তি ব্যবহার করছে তার ওপর।

অন্যদিকে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টেলিভিশন চলচ্চিত্র ও ফটোগ্রাফি বিভাগের শিক্ষার্থী নুর হোসাইন প্রযুক্তিগত দক্ষতার পাশাপাশি যোগাযোগ, গবেষণা, সৃজনশীলতা ও সমালোচনামূলক চিন্তার দক্ষতা বৃদ্ধিতে মনোনিবেশ করছেন। তিনি জানান, “এআই–নির্ভর ভবিষ্যতের জন্য আমি প্রযুক্তিগত দক্ষতার পাশাপাশি সৃজনশীলতা, যোগাযোগ, গবেষণা ও সমালোচনামূলক চিন্তার দক্ষতা বাড়ানোর চেষ্টা করছি। টেলিভিশন, ফিল্ম ও ফটোগ্রাফি বিভাগের শিক্ষার্থী হিসেবে এআইকে কাজে লাগিয়ে কনটেন্ট তৈরি, তথ্য বিশ্লেষণ ও গল্প বলার নতুন পদ্ধতি শিখছি। চ্যাটজিপিটি ও জেমিনাই ব্যবহার করে সহজেই স্টোরিবোর্ড তৈরি ও প্রি–ভিজ্যুয়ালাইজেশন করতে পারছি, যা ফিল্ম স্টুডেন্ট হিসেবে আমার অনেক কাজে আসছে। পাশাপাশি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ, চলচ্চিত্র উৎসবে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ এবং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিষয় নিয়ে গবেষণার সুযোগ খুঁজছি।”

নুর হোসাইনের বিশ্বাস, আগামী পাঁচ বছরে এআই অনেক কাজ সহজ করে দিলেও মানুষের নৈতিক বিচারবোধ, বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং সৃজনশীলতার গুরুত্ব অপরিবর্তিত থাকবে। তাই তিনি এআইকে পুরোপুরি নির্ভরতার জায়গা নয়, বরং নিজের সম্ভাবনা বাড়ানোর একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চান।

নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির কম্পিউটারবিজ্ঞান ও প্রকৌশল (সিএসই) বিভাগের শিক্ষার্থী মাইশা মুশতাক মনে করেন, কেবল একাডেমিক শিক্ষা ক্যারিয়ারের জন্য যথেষ্ট নয়। প্রযুক্তির দুনিয়ায় এআই যে পরিবর্তন এনেছে, তা তারা গভীরভাবে উপলব্ধি করছেন। তিনি বলেন, “সিএসইর শিক্ষার্থী হিসেবে বুঝতে পারি, শুধু একাডেমিক শিক্ষা অর্জনই ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ারের জন্য যথেষ্ট নয়। বিশেষ করে প্রযুক্তির দুনিয়ায় এআই ইতিমধ্যে যে পরিবর্তন এনেছে এবং ভবিষ্যতে আরও যা আনবে, তা আমরা ভালোভাবেই উপলব্ধি করছি। তাই প্রোগ্রামিং শেখার পাশাপাশি সেই জ্ঞান বাস্তব জীবনে কাজে লাগানোকে আমি গুরুত্বপূর্ণ মনে করি। একই সঙ্গে টিমওয়ার্ক, যোগাযোগ ও সমস্যা সমাধানের মতো দক্ষতা বাড়ানোও জরুরি। এ কারণে একাডেমিক পড়াশোনার পাশাপাশি বিভিন্ন প্রকল্পে কাজ করছি, বাস্তব অভিজ্ঞতার মাধ্যমে দক্ষতা শাণিত করার চেষ্টা করছি। এআই টুল ব্যবহার করে নতুন প্রযুক্তি শেখা, কোড বোঝা ও সমস্যার সমাধান খোঁজার অভ্যাসও গড়ে তুলছি।”

মাইশার মতে, আগামী পাঁচ বছরে কর্মক্ষেত্রের চিত্র বদলে যাবে। এই পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে হলে শুধু কোডিং জানলেই হবে না, বরং সমস্যাকে গভীরভাবে বোঝা, এআই-এর দেওয়া উত্তর যাচাই করা এবং দায়িত্বশীলভাবে প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতা অর্জন করা জরুরি।

বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী তাসফিয়া তারাননুম মনে করেন, আগামী পাঁচ বছরে শিক্ষা ও চাকরির ধরন আমূল বদলে যাবে। তিনি বলেন, “আগামী পাঁচ বছরে চাকরি, শিক্ষা ও কাজের ধরন অনেক বদলে যাবে। তাই শুধু একটি দক্ষতা থাকাই যথেষ্ট নয়, সেটিকে কতটা কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে পারছি, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। সাংবাদিকতার একজন শিক্ষার্থী হিসেবে আমি লেখালেখি, গবেষণা, গ্রাফিকস, দৃশ্যগত যোগাযোগ ও ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরির দক্ষতা বাড়াতে চাই। পাশাপাশি গবেষণা, নতুন ধারণা তৈরি ও সৃজনশীল কাজে এআইয়ের কার্যকর ব্যবহার শেখার চেষ্টা করছি।”

তাসফিয়া আরও উল্লেখ করেন যে, এআই ব্যবহার করতে পারা আর সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারার মধ্যে পার্থক্য আছে। তাই তথ্য যাচাই, সৃজনশীলতা এবং মানুষের অভিজ্ঞতার গল্প ফুটিয়ে তোলার দক্ষতা সমান গুরুত্বপূর্ণ। তার লক্ষ্য প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে একজন দক্ষ সাংবাদিক ও সৃজনশীল যোগাযোগকর্মী হয়ে ওঠা।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থী আরাফাত নাফিজ এআই-কে বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হিসেবে দেখছেন। তার মতে, এটি শিল্পবিপ্লবের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। তিনি বলেন, “বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বড় বাস্তবতা এআই। শিল্পবিপ্লবের চেয়ে এটি কোনো অংশে কম নয়। জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই এআই প্রভাব ফেলছে, আর একে অগ্রাহ্য করে সামনে এগোনো এখন কঠিন। তাই এআই যথাযথভাবে শেখার চেষ্টা করছি। প্রতিদিনের কাজ থেকে শুরু করে পড়াশোনা—সবখানেই এআইয়ের সাহায্য নিচ্ছি।”

আরাফাত জানান, এআই-এর কারণে প্রচলিত অনেক দক্ষতা দ্রুত অকেজো হয়ে যাচ্ছে। তাই তিনি প্রতিনিয়ত নতুন দক্ষতা রপ্ত করছেন এবং সেই প্রক্রিয়ায় এআই-এর সাহায্য নিচ্ছেন। লেখালেখি ও গবেষণার ক্ষেত্রেও এআই তাকে সহায়তা করছে। তিনি বিশ্বাস করেন, এআই অনেক পেশা বিলুপ্ত করলেও নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিচ্ছে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং বিভাগের শিক্ষার্থী শ্রাবণ দেবনাথ নিজেকে মানিয়ে নিতে এআই এজেন্ট এবং লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল (এলএলএম) সম্পর্কে বিস্তারিত জানার চেষ্টা করছেন। তিনি বলেন, “এই দ্রুত বদলে যাওয়া সময়ে নিজেকে মানিয়ে নিতে আমি প্রথমে এআই এজেন্ট ও এলএলএম সম্পর্কে জানার চেষ্টা করছি। এগুলো কীভাবে কাজ করে, কীভাবে সেরা ফলাফল ও নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়, সেটাই আমার ফোকাস। ব্যক্তিগতভাবে প্রম্পট ইঞ্জিনিয়ারিং শিখছি, কারণ ভালো প্রম্পট ও এআইয়ের কার্যপদ্ধতির স্পষ্ট ধারণা থাকলে আউটপুটও ভালো হয়। পাশাপাশি বিশ্লেষণী চিন্তা, সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা ও নেতৃত্বের দক্ষতা গড়ে তোলার দিকেও মনোযোগ দিচ্ছি।”

শ্রাবণ পড়াশোনায় চ্যাটজিপিটি, ক্লড ও নোটবুকএলএম ব্যবহার করেন। বিশেষ করে গভীর বিশ্লেষণের জন্য ক্লড এবং প্রশ্ন বিশ্লেষণের জন্য নোটবুকএলএম তার কাছে কার্যকর। এছাড়া তথ্যের সত্যতা যাচাই বা ফ্যাক্ট-চেক করতে তিনি চ্যাটজিপিটি ব্যবহার করেন। তার ধারণা, আগামী পাঁচ বছরে প্রম্পটিং হবে একটি বড় দক্ষতা এবং মানুষ এআই এজেন্টদের পরিচালক বা লিডার হিসেবে কাজ করবে। তবে এআই-এর অপব্যবহার রোধ এবং এর অপ্রত্যাশিত আচরণ নিয়ন্ত্রণ করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।