ভারত থেকে আমদানি করা চালের নমুনায় সম্ভাব্য ক্যানসার সৃষ্টিকারী বিষাক্ত উপাদান ‘আফলাটক্সিন’র উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়েছে। এই গুরুতর পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে অধিকতর পরীক্ষার জন্য ওই চালানের বাকি সাড়ে ৯ হাজার টন চালের বিতরণ সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে খাদ্য অধিদপ্তর।

গত শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) সংশ্লিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে টিবিএস-এর এক প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য জানানো হয়।

জানা গেছে, গত ১৭ আগস্ট চট্টগ্রামের হালিশহর ও দেওয়ানহাট সেন্ট্রাল স্টোরেজ ডিপোর (সিএসডি) চালের স্তূপ থেকে তিন সদস্যের একটি বিআরআই (ব্রি) প্রতিনিধিদল নমুনা সংগ্রহ করে। পরবর্তীতে পরীক্ষায় হালিশহর এবং ঢাকার একটি সরকারি গুদামের চালের নমুনায় এই বিষাক্ত উপাদানের উপস্থিতি পাওয়া যায়। এই ফলাফলের পর ওই নির্দিষ্ট চালান থেকে সংগৃহীত পুরো সাড়ে ৯ হাজার টন চালের বিতরণ স্থগিত করা হয়।

এই বিষয়ে ব্রির প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. কাজী শিরীন আক্তার জাহান বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে সংরক্ষিত চালে আফলাটক্সিন তৈরি হতে পারে। নমুনায় যা শনাক্ত হয়েছে, তার মাত্রা সহনীয় পর্যায়েই রয়েছে। এ সহনীয় মাত্রা অতিক্রম করলে আফলাটক্সিন স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।’

হালিশহর সিএসডির ব্যবস্থাপক মাহমুদ হাসান জানান, খাদ্য কর্মকর্তারা এই লটের চাল দুবার পরীক্ষা করেছেন এবং ডিপো কর্তৃপক্ষকে চাল বিতরণ বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। তবে পরীক্ষার আনুষ্ঠানিক ফলাফল এখনো ডিপোতে পৌঁছায়নি বলে তিনি উল্লেখ করেন।

অন্যদিকে, চট্টগ্রাম খাদ্য বিভাগের চলাচল ও সংরক্ষণ নিয়ন্ত্রক রেজওয়ান সাকিবও চাল বিতরণ বন্ধ রাখার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

টিবিএসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে প্রতি টন ৩৫৩ দশমিক ১১ ডলার দরে মোট ৫০ হাজার টন চাল আমদানির চুক্তি করা হয়েছিল। এই চুক্তির অংশ হিসেবে সিঙ্গাপুরভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘অ্যাগ্রোকর্প ইন্টারন্যাশনাল’ চাল সরবরাহ করে। এর মধ্যে প্রায় ১০ হাজার ৮৭৮ টন ওজনের চূড়ান্ত চালানটি নিয়ে ‘এমভি এইচটি পাইওনিয়ার’ নামক জাহাজটি গত ২১ জুলাই চট্টগ্রাম বন্দরে নোঙর করে। পরদিন খাদ্য কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে নমুনা সংগ্রহ করে গবেষণাগারে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়।

প্রাথমিক প্রতিবেদনে চাল মানুষের খাওয়ার উপযোগী বলে ঘোষণা করা হলে কর্তৃপক্ষ ২৪ ও ২৫ জুলাই চালানের খালাসের অনুমতি দেয়। এরপর চালগুলো ঢাকা, চট্টগ্রাম ও গাজীপুরের বিভিন্ন সরকারি গুদামে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

তবে পরবর্তীতে গুদামের কর্মকর্তারা চালানের একাংশের মান নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাদের মতে, কিছু চাল অত্যন্ত নিম্নমানের এবং প্রায় অনুপযোগী। এই নিম্নমানের কারণে বন্দর থেকেই প্রায় ১ হাজার ৩৭৮ টন চাল জাহাজে ফেরত পাঠায় কর্তৃপক্ষ এবং অবশিষ্ট সাড়ে ৯ হাজার টন চাল গ্রহণ করা হয়।

এরপর খাদ্য অধিদপ্তর চালের অধিকতর পরীক্ষার ব্যবস্থা করে এবং মহাপরিচালক এম জসিম উদ্দিন খান পরীক্ষা সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত চাল বিতরণ স্থগিতের নির্দেশ দেন।

তবে চালের নমুনায় আফলাটক্সিন পাওয়ার দাবিটি পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেছে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান অ্যাগ্রোকর্প ইন্টারন্যাশনাল। তাদের দাবি, বাংলাদেশের খাদ্য কর্মকর্তা এবং সরবরাহকারীর যৌথভাবে সংগৃহীত নমুনা ভারতের একটি পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করা হয়েছিল এবং তা চুক্তির সকল শর্তাবলি পূরণ করেছিল।

টিবিএসকে পাঠানো এক ইমেইলে প্রতিষ্ঠানটি জানায়, ব্রিতে পরীক্ষা করা সিলগালা যৌথ নমুনায় কোনো আফলাটক্সিন পাওয়া যায়নি বলেও তাদের জানানো হয়েছিল। নিজেদের দাবির সপক্ষে তারা সংযুক্ত এসজিএস প্রতিবেদনের পাঁচ ও ছয় নম্বর পৃষ্ঠার কথা উল্লেখ করে।

সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানটি আরও দাবি করে যে, চালের মান বজায় রাখতে তারা যথাযথ কার্যপ্রণালি অনুসরণ করেছিল এবং বিতরণ স্থগিত করার আগে এ বিষয়ে তারা কোনো অভিযোগ পায়নি।

সরবরাহকারীর শিপিং এজেন্ট সেভেন সিজ শিপিং লাইনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলী আকবর অভিযোগ করে বলেন, একটি স্বার্থান্বেষী মহল আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি সরবরাহকারীর সুনাম ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা করছে।

আলী আকবর বলেন, ‘এমনটা চলতে থাকলে কোনো আন্তর্জাতিক সরবরাহকারী বাংলাদেশে খাদ্যশস্য সরবরাহে আগ্রহ দেখাবে না, যা দেশকে বিপাকে ফেলবে।’

টিবিএস-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরবরাহকারী ও কর্তৃপক্ষের এই পরস্পরবিরোধী বক্তব্যের কারণে নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষার পুরো প্রক্রিয়া নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে প্রাথমিক নমুনাগুলো পুরো চালানের সঠিক প্রতিনিধিত্ব করেছিল কি না, তা নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। কর্তৃপক্ষ এখনো চালে থাকা বিষাক্ত উপাদানের সুনির্দিষ্ট ঘনত্ব প্রকাশ করেনি। এছাড়া চিহ্নিত চালের বিষয়ে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বা অন্যান্য গুদামে আরও পরীক্ষা চালানো হবে কি না, সে বিষয়েও তারা কোনো স্পষ্ট তথ্য জানায়নি।