নাম হার্ভার্ড ইন্টারন্যাশনাল কলেজ। বাস্তবে এর কোনো কার্যক্রম নেই। কলেজটি খুঁজে পেতে বেগ পেতে হলো। ঢাকার ভাটারা থানাধীন জগন্নাথপুরের শহীদ হারিজ সড়কের ঠিকানা ধরে ৮ অক্টোবর গিয়ে স্থানীয় কয়েকজনকে জিজ্ঞেস করেও প্রথমে প্রতিষ্ঠানটির সন্ধান পাওয়া যায়নি। পরে একজন দোকানি আঙুল তুলে দেখিয়ে দিলেন একটি ভবন। জীর্ণ ওই ভবনের ফটকে পাশের দেয়ালে লেখা ‘রেইনবো মডেল হাইস্কুল’। নিচতলায় কাউকে পাওয়া গেল না। দোতলায় একজন নিজেকে কলেজটির উপাধ্যক্ষ আনোয়ার হোসেন বলে পরিচয় দিলেন। বললেন, এখানেই হার্ভার্ড ইন্টারন্যাশনাল কলেজ চলে। তবে ভেতরে কলেজের কোনো কার্যক্রম ছিল না। দেখে মনে হয়, এটি সাধারণ কিন্ডারগার্টেন বা কোচিং সেন্টার।
এ বছর একাদশ শ্রেণিতে কতজন শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছে, জানতে চাইলে উপাধ্যক্ষ বললেন, তিনি জানেন না, অধ্যক্ষ জানেন। সেখানে অধ্যক্ষকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। পরে বোর্ড থেকে জানা যায়, এ বছর একাদশ শ্রেণিতে ভর্তিতে দুই দফায় আবেদনের সুযোগ দেওয়ার পরেও এ কলেজে একজন শিক্ষার্থীও ভর্তির আবেদন করেনি। কেন্দ্রীয়ভাবে অনলাইনে ভর্তির সুযোগ থাকলেও কোনো শিক্ষার্থীর পছন্দের তালিকায় এ কলেজের নাম নেই। যদিও কলেজটি কাগজে চালু আছে। আসন আছে ১৫০টি, শিক্ষকও আছেন।
কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী নেই, শিক্ষক আছে; আবার কোথাও শিক্ষার্থী আছে, কিন্তু শিক্ষক নেই। কোথাও স্থায়ী ক্যাম্পাস ছাড়াই বিশ্ববিদ্যালয় চলছে, কোথাও আবার বছরের পর বছর শিক্ষার্থী না থাকলেও কারিগরি প্রতিষ্ঠান টিকে আছে।
হার্ভার্ড কলেজটি দেশের শিক্ষাব্যবস্থার বড় ধরনের অব্যবস্থাপনার একটি উদাহরণ। অপরিকল্পিত শিক্ষার এমন পরিস্থিতি শুধু কলেজ পর্যায়েই নয়। প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা—সব স্তরেই শিক্ষার্থীর চাহিদার সঙ্গে মিলে শিক্ষক, অবকাঠামো ও কর্মসংস্থানের বাস্তবতার সমন্বয় না করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আসন বাড়ানোর প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বছরের পর বছর ধরে এ অবস্থা চলছে। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী নেই, শিক্ষক আছে; আবার কোথাও শিক্ষার্থী আছে, কিন্তু শিক্ষক নেই। কোথাও স্থায়ী ক্যাম্পাস ছাড়াই বিশ্ববিদ্যালয় চলছে, কোথাও আবার বছরের পর বছর শিক্ষার্থী না থাকলেও কারিগরি প্রতিষ্ঠান টিকে আছে।
অপরিকল্পিত এ প্রক্রিয়ার শুরু প্রাথমিক স্তর থেকেই। ২০২৪ সালের প্রাথমিক শিক্ষা শুমারির তথ্য অনুযায়ী, দেশে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ১ লাখ ১৮ হাজার ৬০৭টি। দেশের প্রাথমিক শিক্ষা—প্রাক্-প্রাথমিক থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত। ২৫ ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সেবা প্রদানকারীর মাধ্যমে এ ব্যবস্থায় ২ কোটি ১ লাখ ৮৩ হাজার শিক্ষার্থী শিক্ষা নিচ্ছে। এর মধ্যে ৬৫ হাজার ৫৬৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী প্রায় ১ কোটি ৬ লাখ ২০ হাজার। অর্থাৎ মোট প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রায় ৪৫ শতাংশ বেসরকারি। অথচ আইন অনুযায়ী প্রাথমিক শিক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্রের, যা অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক।
বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে কিন্ডারগার্টেনের সংখ্যা কত, তারও সুনির্দিষ্ট তথ্য সরকারের কাছে নেই। ২০২৪ সালে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, নার্সারি, কিন্ডারগার্টেন ও বেসরকারি পর্যায়ের স্কুলের সংখ্যা আনুমানিক ৪৪ হাজার। এর মধ্যে তখন পর্যন্ত প্রায় ২০ শতাংশ একাডেমিক স্বীকৃতি বা নিবন্ধনের আওতায় ছিল। অর্থাৎ দেশে কতগুলো কিন্ডারগার্টেন চলছে, কোথায় চলছে, সেখানে কত শিক্ষার্থী পড়ছে, কতজন শিক্ষক আছেন এবং কী শিক্ষাক্রম অনুসরণ করা হচ্ছে—এসবের পূর্ণাঙ্গ চিত্র সরকারের কাছে নেই। কিন্ডারগার্টেনগুলো মূলত প্লে গ্রুপ থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষা দিলেও অনেক প্রতিষ্ঠান অষ্টম বা দশম শ্রেণি পর্যন্ত চালানো হয়।
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে প্রধান শিক্ষকের পদ ৬৫ হাজারের বেশি। বাস্তবে ৩৬ হাজারের বেশি পদ শূন্য। চলতি মাসে ১২ হাজার ৮৩০ জন সহকারী শিক্ষক যোগ দিলেও এখনো এ পদে প্রায় ৩ হাজার পদ শূন্য।
অবশ্য প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, সরকারি বিদ্যালয়ের পাশাপাশি দেশের সব বেসরকারি, কিন্ডারগার্টেন ও ইংরেজি মাধ্যমের প্রাথমিক স্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেও সরকারি তদারকির আওতায় আনা হবে। এর আগে বিভিন্ন সরকারের সময়েও একই ধরনের পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছিল।
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে প্রধান শিক্ষকের পদ ৬৫ হাজারের বেশি। বাস্তবে ৩৬ হাজারের বেশি পদ শূন্য। চলতি মাসে ১২ হাজার ৮৩০ জন সহকারী শিক্ষক যোগ দিলেও এখনো এ পদে প্রায় ৩ হাজার পদ শূন্য। অবশ্য গত জুলাইয়ে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের পর ৩৬ হাজারের বেশি প্রধান শিক্ষকের শূন্য পদে পদোন্নতির প্রক্রিয়া শুরু করেছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়।
সরকারি-বেসরকারি একাধিক গবেষণা ও জরিপের তথ্য বলছে, বয়স ও শ্রেণি অনুযায়ী শিক্ষার্থীরা যা শেখার কথা, তা শিখছে না। গত জুনে বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা বাস্তবায়ন ইউনিট ঢাকা মহানগরে ৩৪১টি, ঢাকা জেলার প্রায় ৬০০, নারায়ণগঞ্জের ৫৪৭ ও মুন্সিগঞ্জের ৬১১টি বিদ্যালয় পরিদর্শন করেছিল। তাদের প্রতিবেদনে দেখা যায়, অনেক শিশুশিক্ষার্থী বাংলা ভাষার কয়েকটি বর্ণ—ই, ঈ, উ, ঊ, স, শ এবং ঙ সঠিকভাবে উচ্চারণ করতে পারে না। যুক্তবর্ণে তারা হোঁচট খায়। ইংরেজি ও গণিতে দুর্বলতা চোখে পড়ার মতো।
মাধ্যমিক শিক্ষা পড়ানো হয় এমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ২১ হাজার ৩১৪, যা ১৯৯৫ সালে ছিল ১২ হাজার ১২টি। এ ছাড়া দীর্ঘদিন ধরে প্রায় দেড় শ সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে প্রাথমিক স্তর চালু রয়েছে। কিন্তু এসব বিদ্যালয়ের জন্য আলাদা শিক্ষক পদ নেই। প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের পড়াচ্ছেন মাধ্যমিকের শিক্ষকেরাই। তাঁদের প্রাথমিক শিক্ষার জন্য আলাদা প্রশিক্ষণ নেই।
আবার দেশের ১০টি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে কলেজ শাখাও চালু আছে। কিন্তু এসব অতিরিক্ত স্তরের জন্য আলাদা শিক্ষক কাঠামো তৈরি হয়নি। আবার ৫৪৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ানো হয়। এখানকার শিক্ষক আবার প্রাথমিকের। এসব বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ৭০ হাজারের বেশি। সব মিলিয়ে ২০২৫ সালে মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থী ছিল ৮৬ লাখ ৩৮ হাজারের বেশি।
অপরিকল্পিত এই শিক্ষাব্যবস্থায় একই শিক্ষক দিয়ে ভিন্ন স্তরের শিক্ষার্থীদের পড়ানো হচ্ছে। সম্প্রতি প্রকাশিত বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) ‘বাংলাদেশ শিক্ষা পরিসংখ্যান-২০২৫’ প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, দেশের মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ইংরেজি পড়ানো ৯ হাজার ৯৮২ শিক্ষকের স্নাতক পর্যায়ে ইংরেজি বিষয় ছিল না। গণিতেও একই পরিস্থিতি। গণিত পড়ানো শিক্ষকদের মধ্যে ১০ হাজার ১৬৯ জনের স্নাতকে গণিত নেই।
অনেক শিশুশিক্ষার্থী বাংলা ভাষার কয়েকটি বর্ণ—ই, ঈ, উ, ঊ, স, শ এবং ঙ সঠিকভাবে উচ্চারণ করতে পারে না। যুক্তবর্ণে তারা হোঁচট খায়। ইংরেজি ও গণিতে দুর্বলতা চোখে পড়ার মতো।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) তথ্য অনুযায়ী, দেশে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ৭০২টি। এসব বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকের অনুমোদিত পদ ১৫ হাজার ২৯৩। এর মধ্যে তিন হাজারের কিছু বেশি পদ শূন্য। প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য প্রায় পৌনে চার শ।
শিক্ষকসংকটের চিত্র বোঝাতে সিলেটের জকিগঞ্জ সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের উদাহরণই যথেষ্ট। বিদ্যালয়টিতে বর্তমানে ছাত্রীর সংখ্যা ৪৮৬। আর শিক্ষক আছেন মাত্র দুজন। পরিস্থিতি সামাল দিতে অস্থায়ীভাবে কয়েকজন খণ্ডকালীন শিক্ষক নেওয়া হয়েছে।
আরেকটি বড় অসংগতি তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) শিক্ষায়। ২০১৩ সালে মাধ্যমিকে আইসিটি বাধ্যতামূলক করা হলেও ১৩ বছর পরও সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে এ বিষয়ের জন্য আলাদা শিক্ষক পদ সৃষ্টি হয়নি। ফলে গণিত, ব্যবসায় শিক্ষা ও বিজ্ঞানের শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে বা প্রয়োজন অনুযায়ী আইসিটির ক্লাস নিতে হচ্ছে।
শিক্ষকসংকটের চিত্র বোঝাতে সিলেটের জকিগঞ্জ সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের উদাহরণই যথেষ্ট। বিদ্যালয়টিতে বর্তমানে ছাত্রীর সংখ্যা ৪৮৬। আর শিক্ষক আছেন মাত্র দুজন। পরিস্থিতি সামাল দিতে অস্থায়ীভাবে কয়েকজন খণ্ডকালীন শিক্ষক নেওয়া হয়েছে।
অপরিকল্পিত শিক্ষার সবচেয়ে বড় উদাহরণগুলোর একটি এবারের একাদশ শ্রেণির ভর্তি। ১১টি শিক্ষা বোর্ডে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় এবার পরীক্ষার্থী ছিল ১৮ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৫ জন। পাস করেছে ১১ লাখ ৪৪ হাজারের বেশি। একাদশ শ্রেণিতে ভর্তিযোগ্য কলেজ-মাদ্রাসা আছে ৮ হাজার ১৮০টি। সারা দেশে কলেজ ও মাদ্রাসায় একাদশ শ্রেণিতে ভর্তিযোগ্য আসন ছিল ২৬ লাখ ১ হাজার ৭৭৯টি। এর বিপরীতে প্রথম দুই দফায় চূড়ান্তভাবে ভর্তির জন্য নির্বাচিত হয়েছে ১০ লাখ ৩ হাজার ২৮৮ জন। অর্থাৎ খালি থাকছে প্রায় ১৬ লাখ আসন। প্রথম দুই ধাপে ৪১৬টি কলেজ ও মাদ্রাসায় কোনো শিক্ষার্থী ভর্তির জন্য আবেদনই করেনি। এখন তৃতীয় ধাপে ভর্তির প্রক্রিয়া চলছে।
উচ্চমাধ্যমিক কলেজ, স্নাতক (পাস) কলেজ, স্নাতক (সম্মান) কলেজ এবং স্নাতকোত্তর কলেজের সংখ্যাও ক্রমাগত বেড়েছে। ২০০৯ সালে এ সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ৩৪৭। ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৯৩৬টি। তবে গত তিন বছরের তথ্য বলছে, এসব কলেজে এখন শিক্ষার্থী ধারাবাহিকভাবে কমছে।
শিক্ষার্থী না থাকায় এখন কিছু প্রতিষ্ঠান বন্ধ করা হচ্ছে। টানা তিন বছর কোনো শিক্ষার্থী ভর্তি না হওয়ায় সম্প্রতি ২৪৬টি কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী ভর্তি স্থগিত করেছে শিক্ষা বোর্ড। এর মধ্যে ১৩৭টি ডিপ্লোমা পর্যায়ের এবং ১০৯টি এইচএসসি-বিএমটি পর্যায়ের প্রতিষ্ঠান। আরও ১১২টি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী ভর্তি বন্ধ করাসহ পাঠদানের অনুমোদন বাতিলের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষার্থীর হার বাড়ানো সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য। ২০৩০ সালের মধ্যে কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষায় শিক্ষার্থীর হার ৩০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে। কিন্তু শুধু প্রতিষ্ঠান ও আসন বাড়িয়ে সেই লক্ষ্য অর্জন করা যাচ্ছে না। কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের ২০২৪-২৫ অর্থবছরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ১২ হাজার ৯৩২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কারিগরি শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে। কারিগরি শিক্ষায় আসন রয়েছে ১৯ লাখ ৭৪ হাজারের বেশি। এর বিপরীতে ওই অর্থবছরে ভর্তি হয়েছে প্রায় পৌনে ১০ লাখ শিক্ষার্থী। ফলে এখানেও বিপুলসংখ্যক আসন খালি থাকে।
শিক্ষার্থী না থাকায় এখন কিছু প্রতিষ্ঠান বন্ধ করা হচ্ছে। টানা তিন বছর কোনো শিক্ষার্থী ভর্তি না হওয়ায় সম্প্রতি ২৪৬টি কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী ভর্তি স্থগিত করেছে শিক্ষা বোর্ড। এর মধ্যে ১৩৭টি ডিপ্লোমা পর্যায়ের এবং ১০৯টি এইচএসসি-বিএমটি পর্যায়ের প্রতিষ্ঠান। আরও ১১২টি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী ভর্তি বন্ধ করাসহ পাঠদানের অনুমোদন বাতিলের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর আগে দীর্ঘদিন কোনো শিক্ষার্থী ভর্তি না হওয়া বা শিক্ষা কার্যক্রম না থাকায় ভোকেশনাল শিক্ষা পরিচালনাকারী ৬২১টি প্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছিল।
ব্যানবেইসের তথ্য বলছে, দাখিল, আলিম, ফাজিল (পাস), ফাজিল (অনার্স) ও কামিল পড়ানো এসব মাদ্রাসায় গত বছর শিক্ষার্থী ছিল ২৮ লাখ ৪০ হাজারের বেশি; যা আগের শিক্ষার্থী ছিল ২৭ লাখ ৯৬ হাজারের বেশি। অর্থাৎ এক বছরে মাদ্রাসার সংখ্যা বেড়েছে ২৭টি আর শিক্ষার্থী বেড়েছে ৪৩ হাজারের বেশি। এই হিসাবে কওমি মাদ্রাসার তথ্য নেই।
দেশের শিক্ষা খাতের আরেকটি স্তর হলো মাদ্রাসা শিক্ষা। ইবতেদায়িসহ মাদ্রাসা শিক্ষায় ৪২ লাখ ৫০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে। প্রাথমিক পর্যায়ে ওপরের স্তরে মাদ্রাসার সংখ্যা ২০০২ সালে ছিল ৭ হাজার ৮২০টি। ২০২৫ সালে তা বেড়ে ৯ হাজার ২৯৬টিতে দাঁড়িয়েছে। ব্যানবেইসের তথ্য বলছে, দাখিল, আলিম, ফাজিল (পাস), ফাজিল (অনার্স) ও কামিল পড়ানো এসব মাদ্রাসায় গত বছর শিক্ষার্থী ছিল ২৮ লাখ ৪০ হাজারের বেশি; যা আগের শিক্ষার্থী ছিল ২৭ লাখ ৯৬ হাজারের বেশি। অর্থাৎ এক বছরে মাদ্রাসার সংখ্যা বেড়েছে ২৭টি আর শিক্ষার্থী বেড়েছে ৪৩ হাজারের বেশি। এই হিসাবে কওমি মাদ্রাসার তথ্য নেই।
এর মধ্যেও নতুন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের উদ্যোগ থেমে নেই। ১০টির বেশি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদনের জন্য আবেদন করা হয়েছে। ইউজিসি এগুলোর সম্ভাব্যতা যাচাই-বাছাই করছে। এ ছাড়া কক্সবাজারসহ আরও কয়েকটি জেলায় সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনেরও পরিকল্পনা রয়েছে।
বর্তমানে দেশে ৬১টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও ১১৭টি অনুমোদিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়লেও উচ্চশিক্ষার মান ও কর্মসংস্থানের সংকট কাটছে না। আইএমএফের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে দেশের শিক্ষিত তরুণদের বেকারত্বের উচ্চ হার উঠে এসেছে। ওই প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, বাংলাদেশে প্রতি ১০০ জন শিক্ষিত তরুণের মধ্যে ৩৬ জন বেকার। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি নেওয়া তরুণদের একটি বড় অংশই কর্মসংস্থানের বাইরে থাকে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের গবেষণা অনুযায়ী, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজ থেকে পাস করা প্রায় ২৮ শতাংশ গ্র্যাজুয়েট বেকার থাকেন।
বেকারত্বের একটি কারণ হলো, বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ও স্নাতক ডিগ্রিধারীর সংখ্যা বাড়লেও সে হারে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র তৈরি হয়নি। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার সঙ্গে শিল্প ও কর্মক্ষেত্রের সংযোগও দুর্বল। ফলে ডিগ্রি অর্জন করেও অনেক শিক্ষার্থী প্রয়োজনীয় দক্ষতা নিয়ে চাকরির বাজারে প্রবেশ করতে পারছেন না।
উচ্চশিক্ষায় অবকাঠামোগত পরিকল্পনার ঘাটতিও আছে। ২৫টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের এখনো নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাস নেই। আবার বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কোনো কোনোটিতে মানবিক, সমাজবিজ্ঞান, ব্যবসায় শিক্ষা এমনকি কৃষির মতো বিষয়ও যুক্ত হয়েছে।
তবে এর মধ্যেও নতুন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের উদ্যোগ থেমে নেই। ১০টির বেশি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদনের জন্য আবেদন করা হয়েছে। ইউজিসি এগুলোর সম্ভাব্যতা যাচাই-বাছাই করছে। এ ছাড়া কক্সবাজারসহ আরও কয়েকটি জেলায় সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনেরও পরিকল্পনা রয়েছে।
অপরিকল্পিত শিক্ষার এ পরিস্থিতি এক দিনে তৈরি হয়নি। বছরের পর বছর ধরে এমন পরিস্থিতি চলে আসায় পুরো শিক্ষাব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে। শিক্ষা কখনোই রাজনৈতিক অগ্রাধিকারে যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি।
শিক্ষার বিভিন্ন স্তরে আলাদা আলাদা সমস্যা মনে হলেও এর পেছনে একটি অভিন্ন সংকট রয়েছে। সেটা হলো প্রতিষ্ঠান বাড়ানোর সঙ্গে শিক্ষার প্রয়োজন ও বাস্তবতার সমন্বয় না থাকা। অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাবও কাজ করেছে।
এ বিষয়ে শিক্ষাবিদ ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমদ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, অপরিকল্পিত শিক্ষার এ পরিস্থিতি এক দিনে তৈরি হয়নি। বছরের পর বছর ধরে এমন পরিস্থিতি চলে আসায় পুরো শিক্ষাব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে। শিক্ষা কখনোই রাজনৈতিক অগ্রাধিকারে যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি। সরকারের নানা উদ্যোগ খণ্ডিত ও বিচ্ছিন্ন বলে মনে হচ্ছে। তাঁর পরামর্শ, শিক্ষার প্রধান উপখাতগুলো নিয়ে মধ্যমেয়াদি লক্ষ্য ও কৌশল নির্ধারণ করে কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে। খণ্ডিতভাবে কোনো একটি স্তরের সমস্যা সমাধান না করে পুরো ব্যবস্থা নিয়ে সামগ্রিক চিন্তা করতে হবে।