বাংলাদেশ সরকারের রাজস্ব আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস হলো মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট। প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, ভ্যাটের আওতায় নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রতি মাসের কার্যক্রমের হিসাব অর্থাৎ দাখিলপত্র বা রিটার্ন পরবর্তী মাসের ১৫ তারিখের মধ্যে অনলাইনে জমা দিতে হয়।

তবে গত বাজেটে অর্থ আইনের মাধ্যমে এই মাসিক রিটার্ন দাখিলের নিয়মে পরিবর্তন আনা হয় এবং ত্রৈমাসিক বা তিন মাস অন্তর রিটার্ন দাখিলের নিয়ম চালু করা হয়। আপাতদৃষ্টিতে এই পদক্ষেপটি ব্যবসা সহজীকরণ বলে মনে হলেও, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা, রাজস্ব সুরক্ষা এবং হিসাববিজ্ঞানের মৌলিক নীতিগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, এই সিদ্ধান্তটি রাজস্ব ব্যবস্থাপনার জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ছিল।

জানা গেছে যে, রিটার্ন দাখিলের এই সময়সীমা পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে কোনো আলোচনা করা হয়নি। মাঠপর্যায়ে ভ্যাট ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত অনেক কর্মকর্তা সে সময়ই জানিয়েছিলেন যে, এই সিদ্ধান্তটি সঠিক ছিল না। মাসিক পরিবর্তে ত্রৈমাসিক রিটার্ন দাখিলের ফলে বেশ কিছু নেতিবাচক প্রভাব পরিলক্ষিত হয়।

সরকারের অর্থ তিন মাস ব্যবসায়ীর কাছে থাকলে তারা তা চলতি মূলধন হিসেবে ব্যবহার করে ফেলতে পারেন। তিন মাস পর যখন বড় অঙ্কের ভ্যাট পরিশোধ করতে হয়, তখন সামর্থ্য না থাকলে ব্যবসায়ী কর ফাঁকি দেওয়ার পথ বেছে নিতে পারেন। এছাড়া ব্যবসায় লোকসান হলে সংগৃহীত ভ্যাটের অর্থ তারা নিজস্ব প্রয়োজনে ব্যবহার করতে বাধ্য হতে পারেন।

এমনকি যেসব প্রতিষ্ঠান স্বচ্ছভাবে হিসাব সংরক্ষণ করে, তাদের জন্য ত্রৈমাসিক রিটার্ন দাখিল সুবিধার চেয়ে অসুবিধাই বেশি তৈরি করে। তিন মাস পর রেয়াত নিতে গেলে অনেক ক্রয় দলিলের বিপরীতে হিসাব মেলানো জটিল হয়ে পড়ে। সাপ্লাই চেইনের কোনো প্রতিষ্ঠান তিন মাস পর রিটার্ন দাখিল করলে ইনভয়েস ট্র্যাকিং এবং রেয়াত দাবির সময়সীমা বজায় রাখা দুরূহ হয়। একই সঙ্গে তিন মাসের ক্রয়-বিক্রয় হিসাব ও চালানপত্র জমা দিলে হিসাব বিভাগের ওপর সাময়িকভাবে প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হয়, আবার রিটার্ন দাখিলের পর দীর্ঘ সময় কাজের চাপ থাকে না, যা মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায় বিরূপ প্রভাব ফেলে।

মাসিক পদ্ধতিতে রিটার্নে কোনো ভুল হলে তা পরবর্তী মাসেই সংশোধন করা সহজ। কিন্তু ত্রৈমাসিক পদ্ধতিতে ভুলের প্রভাব তিন মাসের পুরো লেনদেনের ওপর পড়ে, যা উদ্‌ঘাটন ও সংশোধন করা অত্যন্ত জটিল। এছাড়া সরকারের প্রতি মাসে নির্দিষ্ট পরিচালনা ও উন্নয়ন ব্যয় থাকে। ভ্যাট প্রতি মাসে সরকারি কোষাগারে জমা না হয়ে তিন মাস পর জমা হলে সরকারের তাৎক্ষণিক নগদ অর্থের সংকট তৈরি হতে পারে।

ভ্যাট কর্মকর্তারা প্রতি মাসে দাখিলপত্র যাচাই-বাছাই করে কর ফাঁকি রোধে কাজ করেন। তিন মাসের তথ্য ও দলিলপত্র একসঙ্গে জমা হলে সীমিত জনবল দিয়ে এত বিপুল পরিমাণ লেনদেন যাচাই করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। এর ফলে ভ্যাট বকেয়া হয়ে গেলে তা আদায়ের জন্য ঘন ঘন কারণ দর্শানো নোটিশ ও ডিমান্ড নোটিশ জারি করতে হয়, যা প্রশাসনিক জটিলতা এবং মামলা জট বাড়িয়ে দেয়।

সিদ্ধান্ত গ্রহণের এই পদ্ধতিটি সঠিক ছিল না। কোনো অংশীজন এই দাবি করেননি, তবুও কেন এবং কীভাবে এটি করা হলো, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়। অনেক প্রয়োজনীয় দাবি বাস্তবায়ন না হলেও এই অযাচিত বিষয়টি বাস্তবায়িত হলো, যা সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়ার অভাবকে ফুটিয়ে তোলে। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, এভাবে এক পা এগিয়ে আবার এক পা পেছানো হলে প্রকৃত অগ্রগতি হয় না।

জনগণের দেওয়া কর যা সরকারের কাছে হস্তান্তরের জন্য ব্যবসায়ীর কাছে থাকে, তা দীর্ঘসময় সেখানে রাখা সমীচীন নয়। করের অর্থ রাষ্ট্রের উন্নয়ন ও জনকল্যাণে ব্যয় হওয়ার কথা। ভোক্তা পণ্য ক্রয়ের সঙ্গে সঙ্গেই কর দিয়ে দেন, অথচ সরকার সেই অর্থ কোষাগারে না এনে তিন মাস ব্যবসায়ীর কাছে বিনা সুদে রেখে দেয়। অন্যদিকে সরকার তাৎক্ষণিক খরচ মেটাতে ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়—এটি এক ধরনের বৈপরীত্য। শত শত কোটি টাকা ব্যবসায়ীদের হাতে থাকলে সরকার অর্থের সময়মূল্য থেকেও বঞ্চিত হয়।

গত জুনে রিটার্ন দাখিলের সময়সীমা এক মাস থেকে তিন মাস করার পর জুলাই-আগস্ট মাসে রাজস্ব আহরণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার জন্য মতামত দিতে শুরু করেন। অবশেষে ১৪ অক্টোবর অধ্যাদেশ জারি করে রিটার্ন দাখিলের সময়সীমা পুনরায় এক মাস নির্ধারণ করা হয়েছে।

এই পুরো ঘটনা থেকে বোঝা যায় যে, সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াটি ত্রুটিপূর্ণ ছিল। অংশীজনদের মতামত ছাড়াই এটি কার্যকর করা হয়েছিল। এই ধরনের অসংলগ্ন পদক্ষেপের কারণে রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় বারবার স্থবিরতা তৈরি হচ্ছে এবং প্রকৃত অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

বর্তমানে শোনা যাচ্ছে, নির্ধারিত পরিমাণ ভ্যাট আদায়ের জন্য ১২ লাখ ছোট প্রতিষ্ঠান নিবন্ধিত করে এক হাজার টাকা করে ভ্যাট আদায়ের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। তবে এতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রাজস্ব আদায় হবে না। ১৯৯৮ সালে এই পদ্ধতি ব্যর্থ হয়েছিল এবং এবারও তা ব্যর্থ হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। রিটার্ন দাখিলের সময়সীমা বাড়ানো এবং পুনরায় আগের নিয়মে ফিরে আসার ঘটনা থেকে কোনো শিক্ষা নেওয়া হয়নি।

রাজস্ব খাতের বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘকাল ধরে বলে আসছেন যে, মূলত ক্রয়-বিক্রয়ের তথ্য গোপন করেই রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হয়। তাই সংস্কারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হওয়া উচিত ক্রয়-বিক্রয়ের সব তথ্য এনবিআরের কাছে নিয়ে আসা। এর মাধ্যমে প্রকৃত বিক্রির ওপর সঠিক পরিমাণে ভ্যাট ও আয়কর আদায় করা সম্ভব হবে। এই ব্যবস্থা বাস্তবায়নে এখন জোরালো পদক্ষেপ প্রয়োজন।

ইতিমধ্যে পুনরায় আইএমএফ-এর পদচারণা শুরু হয়েছে। তাদের পরিচিত কিছু কথা—আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চা, স্বার্থের দ্বন্দ্ব, করের ভিত্তি সম্প্রসারণ, অব্যাহতি কমানো, ইউনিফর্ম করহার চালু, টিআইএন-বিআইএন একীভূত করা, নীতি এবং বাস্তবায়ন আলাদা করা—আবার সামনে আসবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা ব্যর্থ হবে এবং নতুন করে শুরু হবে। এভাবে চলতে থাকলে প্রকৃত রাজস্ব সংস্কার সম্ভব হবে না।

—মো. আব্দুর রউফ, সাবেক সদস্য, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড