ইসরায়েলের নির্বাচনের চূড়ান্ত ফল স্থানীয় সময় আজ শুক্রবার ভোরে প্রকাশিত হয়েছে। এতে নিশ্চিত হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কট্টর ডানপন্থী জোট কিংবা প্রধান বিরোধী জোট—কেউই সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় আসন পায়নি।
এ ফলাফলের পর ইসরায়েলে সরকার গঠন নিয়ে কয়েক সপ্তাহ, এমনকি কয়েক মাস ধরে দর-কষাকষি ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা চলতে পারে।
নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি ও তাদের মিত্ররা পার্লামেন্টে ৫৩টি আসন পেয়েছে। নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজন ৬১টি আসন। কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত চূড়ান্ত ফলে দেখা গেছে, ২০২২ সালের নির্বাচনে নেতানিয়াহু জোটের পাওয়া ৬৪টি আসন থেকে এবার আসনসংখ্যা কমেছে।
সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন প্রধান বিরোধী জোট পেয়েছে ৪৮ আসন। কয়েক মাস ধরে জনমত জরিপে এ জোট এগিয়ে ছিল। আর দুটি আরব দল পেয়েছে ১৯টি আসন, যা তাদের ইতিহাসে সর্বোচ্চ।
এ নির্বাচনকে ইসরায়েলের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ মেয়াদে দায়িত্ব পালনকারী প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু ও তাঁর সবচেয়ে কট্টরপন্থী সরকারের পক্ষে-বিপক্ষে এক ধরনের গণভোট হিসেবে দেখা হচ্ছিল। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামাসের নেতৃত্বাধীন নজিরবিহীন হামলার পর এটিই ছিল দেশটিতে প্রথম নির্বাচন।
নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে ফলাফলে ‘সামান্য সংশোধন’ হতে পারে। এরপর ৪ নভেম্বর ফল আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগের কাছে জমা দেওয়া হবে। আজ মধ্যরাতের (গতকাল বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত) কিছুক্ষণ পর কমিশন এ কথা জানায়।
চূড়ান্ত ফলাফল হাতে পাওয়ার পর প্রেসিডেন্ট হারজগ মূলত ঠিক করবেন, কার পক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করা সবচেয়ে বেশি সম্ভব। এরপর তিনি সেই নেতাকে সরকার গঠনের আহ্বান জানাবেন।
আগামী সপ্তাহে ভোটের হিসাব আনুষ্ঠানিকভাবে পাওয়ার পর প্রেসিডেন্ট সব দলের নেতাদের সঙ্গে আলোচনায় বসবেন বলে জানিয়েছেন। ৪ নভেম্বর আসনের চূড়ান্ত তালিকা ঘোষণা করা হবে, আর দলগুলো ১৮ নভেম্বর পর্যন্ত যেকোনো আইনি আপত্তি বা অভিযোগ দায়ের করার সুযোগ পাবে।
প্রেসিডেন্ট সম্ভবত গাদি আইজেনকটকেই প্রথমে সরকার গঠনের সুযোগ দিতে পারেন।
জেরুজালেমের নিরপেক্ষ গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইসরায়েল ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউটের (আইডিআই) গবেষক আসাফ শাপিরার মতে, প্রেসিডেন্ট সম্ভবত গাদি আইজেনকটকেই প্রথমে সরকার গঠনের সুযোগ দিতে পারেন। ইসরায়েলের আইন ও অতীতের নির্বাচনের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করে তিনি জানান, প্রেসিডেন্টের সঙ্গে পরামর্শের সময় অন্য দলগুলোর কাছ থেকে যে নেতা সবচেয়ে বেশি সমর্থন বা সুপারিশ পান, সাধারণত তাঁকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।
এ নির্বাচনকে ইসরায়েলের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ মেয়াদে দায়িত্ব পালনকারী প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু ও তাঁর সবচেয়ে কট্টরপন্থী সরকারের পক্ষে-বিপক্ষে এক ধরনের গণভোট হিসেবে দেখা হচ্ছিল। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র সংগঠন হামাসের নেতৃত্বাধীন নজিরবিহীন হামলার পর এটিই ছিল দেশটিতে প্রথম নির্বাচন। ওই হামলার পর থেকেই গাজায় তাণ্ডব চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দলগুলোর মধ্যে আলোচনা যদি কোনো সিদ্ধান্তে না পৌঁছে থমকে থাকে, তবে তা নেতানিয়াহুর জন্যই লাভজনক হবে। কারণ, নতুন সরকার গঠিত না হওয়া পর্যন্ত অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনিই ক্ষমতায় থেকে যাবেন।
নির্বাচনে ভোটারদের উপস্থিতি ছিল ১৯৯৯ সালের পর সর্বোচ্চ। ৭ অক্টোবরের হামলা ঠেকাতে ব্যর্থতার দায় নিতে নেতানিয়াহুর অস্বীকৃতিতে জনগণের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও ইহুদি দলগুলোর নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়ার মতো প্রয়োজনীয় আসন নিশ্চিত করতে পারেনি।
ভোটের ময়দানে নেতানিয়াহু অবশ্য সব প্রত্যাশাকে ছাড়িয়ে গেছেন। আরব রাজনৈতিক শক্তির উত্থান ও সম্ভাব্য নিরাপত্তা ঝুঁকির ভয়কে কাজে লাগিয়ে তিনি ভোটারদের মন জয় করেন এবং তাঁর দল এককভাবে সবচেয়ে বেশি ভোট পায়।
পুরো নির্বাচনী প্রচারে গাদি আইজেনকট নিজেকে নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে তুলে ধরেন। প্রধানমন্ত্রীর নীতি দেশকে একনায়কতন্ত্রের দিকে ঠেলে দিচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েলের ভাবমূর্তি নষ্ট করছে বলেই তাঁর অভিযোগ।
ভোটে নেতানিয়াহুর সামান্য সুবিধাজনক অবস্থান অবশ্য আইজেনকট ও আদর্শিকভাবে তাঁর ভিন্নমতাবলম্বী বিরোধী জোটকে এক কঠিন সিদ্ধান্তের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। নেতানিয়াহুকে ক্ষমতাচ্যুত করতে হয় তাদের আরব দলগুলোর সঙ্গে জোট বাঁধতে হবে, অন্যথায় নেতানিয়াহুর সঙ্গে হাত মিলিয়ে একটি জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠন করতে হবে।
ফলে সরকার গঠনের এ প্রক্রিয়াটি বেশ তিক্ত এবং দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে, যা কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাস পর্যন্ত গড়ানোর আশঙ্কা রয়েছে। প্রেসিডেন্ট কোনো প্রার্থীকে মনোনীত করার পর, সেই নেতা অন্য দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতা করে সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণের জন্য ২৮ দিন সময় পাবেন। প্রয়োজনে এ সময়সীমা আরও ১৪ দিন বৃদ্ধির আবেদন করা যেতে পারে।
প্রথম মনোনীত প্রার্থী যদি সরকার গঠনে ব্যর্থ হন, তবে প্রেসিডেন্ট অন্য যেকোনো দুই নেতাকে পর্যায়ক্রমে এ দায়িত্ব দিতে পারেন। তাঁরাও যদি ব্যর্থ হন, তবে দেশটিতে আবারও নতুন করে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তবে প্রেসিডেন্ট হারজগ গত বুধবার সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে আরেকটি নির্বাচন এড়াতে সম্ভাব্য সব ধরনের চেষ্টা করতে হবে। ইসরায়েল ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে সরকার গঠনে সাধারণত ২০ থেকে ১০০ দিন পর্যন্ত সময় লেগে থাকে।
জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠন ছাড়াও রাজনীতিতে বেশ কিছু সম্ভাব্য সমীকরণের কথা শোনা যাচ্ছে। এর মধ্যে একটি হলো, বিরোধী জোট যদি আরব দলগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করে। কারণ, আরব দলগুলোর ভালো ফলাফলের ফলে আগামী সরকার গঠনের আলোচনায় তারা অন্যতম প্রধান শক্তি হয়ে উঠতে পারে। তবে বিরোধী জোটের দলগুলোসহ বেশিরভাগ ইহুদি দলই এ সিদ্ধান্তের পক্ষে নয়। মূলত জায়নবাদী অবস্থানকে সমর্থন করতে অনিচ্ছুক, এমন আরব দলগুলোকে সরকারে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে বহু বছর ধরেই ইসরায়েলি ইহুদিদের মধ্যে তীব্র আপত্তি রয়েছে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে উভয় নেতাই এখন প্রতিপক্ষ শিবির থেকে দল বা স্বতন্ত্র এমপিদের নিজেদের দিকে টানার চেষ্টা করতে পারেন।
৭ অক্টোবরের হামলার পর থেকে আরব দলগুলোর প্রতি ইসরায়েলের মনোভাব আরও কঠোর হয়েছে। নেতানিয়াহু নির্বাচনী প্রচারে বারবার আরব ভোটারদের জুজুর ভয় দেখিয়েছেন। তাঁরা ‘ভোট চুরির চেষ্টা করছেন’ এমন বর্ণবাদী ও উসকানিমূলক মন্তব্য করে তিনি নিজের ভোটারদের সংগঠিত করেন।
অন্যদিকে, আইজেনকট আরব দলগুলোর সঙ্গে জোট করবেন কি না, তা স্পষ্ট করে না বললেও দলগুলোর কোনোটি তাঁর জোটের শর্ত পূরণ করে না বলে জানিয়ে দিয়েছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দলগুলোর মধ্যে আলোচনা যদি কোনো সিদ্ধান্তে না পৌঁছে থমকে থাকে, তবে তা নেতানিয়াহুর জন্যই লাভজনক হবে। কারণ, নতুন সরকার গঠিত না হওয়া পর্যন্ত অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনিই ক্ষমতায় থেকে যাবেন।
ইসরায়েলের সাধারণ ভোটারদের জন্য এ নির্বাচনী ফলাফল এক অস্বস্তিকর পরিস্থিতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। ২০১৯ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে যে রাজনৈতিক অচলাবস্থা ইসরায়েলকে পঙ্গু করে দিয়েছিল এবং যে কারণে ভোটারদের পাঁচবার ভোটকেন্দ্রে যেতে হয়েছিল, দেশটিতে আবারও সেই অচলাবস্থার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। নেতানিয়াহুর সমর্থকেরা তাঁর ক্ষমতায় টিকে থাকার সম্ভাবনা দেখে স্বস্তি পেলেও, যাঁরা তাঁর চূড়ান্ত পরাজয় আশা করেছিলেন, রাজনৈতিক অচলাবস্থার এ নতুন আশঙ্কায় তাঁরা বেশ হতাশ।