একটি ব্যাংক নোটের আকার এতটাই বিশাল যে তা হাতে ধরলে মনে হয় কোনো পোস্টার। অন্যদিকে আরেকটি নোট এতই ক্ষুদ্র যে আঙুলের ফাঁকে সহজেই হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম। কাগজের তৈরি এই দুই মুদ্রার আকারের ব্যবধান সত্যিই বিস্ময়কর। বিশ্বের বৃহত্তম আকারের ব্যাংক নোটটি ২০২৫ সালে বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির আন্তর্জাতিক বাণিজ্যবিষয়ক কনভেনশন চুক্তির ৪৫তম বার্ষিকী পালন উপলক্ষে আফ্রিকার দেশ বুরুন্ডি প্রকাশ করেছে। বিপরীতে, ক্ষুদ্রতম ব্যাংক নোটটির জন্ম হয়েছিল ১৯১৭ সালে ইউরোপের দেশ রোমানিয়ায়। সময়ের ব্যবধানে এই দুই নোটের দূরত্ব ১০৮ বছর। মুদ্রার এই অদ্ভুত বৈপরীত্যের মাঝে লুকিয়ে আছে ইতিহাস, অর্থনীতি এবং সংগ্রাহকদের দুর্লভ সংগ্রহের এক রোমাঞ্চকর গল্প।

রাজধানী ঢাকায় ষষ্ঠবারের মতো মুদ্রা প্রদর্শনীর আয়োজন করেছে বাংলাদেশ নিউমিসম্যাটিক কালেক্টরস সোসাইটি (বিএনসিএস)। তিন দিনব্যাপী এই বিশেষ প্রদর্শনী গতকাল বৃহস্পতিবার শুরু হয়েছে ধানমন্ডির মাইডাস সেন্টারের ১২ তলায়।

মুদ্রার সাথে ইতিহাসের এক নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। ইতিহাসের বিভিন্ন অধ্যায় উন্মোচনে মুদ্রা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচিত হয়। প্রাচীনকালে কোনো শাসক সিংহাসনে আরোহণের পর নিজের শাসনের বৈধতা ও স্বীকৃতি প্রতিষ্ঠা করতে নতুন মুদ্রার প্রচলন করতেন। মুদ্রায় খোদাই করা শাসকের নাম, সাল, প্রতীক ও অন্যান্য চিহ্ন বিশ্লেষণ করে তৎকালীন রাজ্য পরিচালনার নানা অজানা তথ্য পাওয়া যায়। এমনকি মুদ্রার সূত্র ধরে বিলুপ্ত জনপদ ও হারিয়ে যাওয়া প্রাচীন রাজ্যের ইতিহাস উদ্ধার করাও সম্ভব হয়।

প্রাচীন যুগ থেকে আধুনিক কাল পর্যন্ত বিভিন্ন দেশ ও শাসকের প্রচলিত মুদ্রা সংগ্রাহকদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও গুরুত্বপূর্ণ সংগ্রহবস্তু। রাজকীয় উপঢৌকন হিসেবে ব্যবহৃত মুদ্রা থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন লেনদেনের প্রচলিত মুদ্রা—সবই ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দীর্ঘদিনের অক্লান্ত চেষ্টা, শ্রম ও সময় ব্যয় করে সংগ্রাহকেরা তাঁদের এই বিশাল সংগ্রহ গড়ে তোলেন। সেই সংগ্রহ থেকে বাছাই করা সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও সেরা নিদর্শনগুলোই স্থান পেয়েছে এবারের প্রদর্শনীতে।

দেশের ৪৩ জন মুদ্রাসংগ্রাহক তাঁদের সংগ্রহের ৬১টি ভিন্ন বিষয়ের নির্বাচিত নিদর্শন ৪২টি ডিসপ্লে বক্সে উপস্থাপন করেছেন। প্রতিটি সংগ্রহ যেন মুদ্রার মাধ্যমে ইতিহাসের একেকটি অধ্যায়কে নতুন করে জানার সুযোগ করে দিচ্ছে।

‘কাটাঙ্গা ক্রস’

প্রদর্শনীতে প্রদর্শিত একটি বিশেষ মুদ্রার নাম ‘কাটাঙ্গা ক্রস’। ঢালাই তামার তৈরি এই অস্বাভাবিক আকৃতির মুদ্রাটি ব্যবহৃত হতো আফ্রিকার দেশ জায়ারে (কঙ্গো)। এর পরিচিতিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, একটি ক্রস দিয়ে ১০ কেজি আটা অথবা ৫/৬টি মুরগি এবং ১০টি ক্রস দিয়ে একটি বন্দুক কেনা যেত।

প্রদর্শনীতে রয়েছে বিভিন্ন দেশের স্বর্ণমুদ্রা। রাজা কনিষ্ক থেকে শুরু করে মহীশূরের টিপু সুলতান এবং হায়দরাবাদের নিজামের মুদ্রাও এখানে প্রদর্শিত হচ্ছে। এছাড়া ৫ থেকে ১০ হাজার ফ্রাঙ্কের কারুকার্যময় ব্যাংক নোটের পাশাপাশি বাঘের জিহ্বা মুদ্রা, ডিঙি নৌকার বোট মানি এবং ১৮ শতক পর্যন্ত বাংলা অঞ্চলে ব্যবহৃত কড়িসহ বিচিত্র ধরনের মুদ্রা স্থান পেয়েছে। এসবই রয়েছে বিএনসিএসের সভাপতি মো. রবিউল ইসলামের সংগ্রহ করা ডিসপ্লে বক্সে।

সংগ্রাহক সত্যজিৎ ঘোষের বক্সে রাখা হয়েছে ১৯৩৭ সালে ব্রিটিশ ভারত থেকে আলাদা হওয়ার পর ভারতে ছাপানো বার্মার মুদ্রা। একইভাবে রয়েছে পাকিস্তানের জন্য ব্রিটিশ ইন্ডিয়ায় ওভারপ্রিন্ট করা মুদ্রা, যা ১৯৪৮ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত প্রচলিত ছিল।

ক্যারিবীয় অঞ্চলের সবকটি দেশের ব্যাংক নোট দেখা যাবে সংগ্রাহক কামরুজ্জামান কায়সারের ডিসপ্লে বক্সে।

মুদ্রা সংগ্রাহক জাহিদুর রহমান প্রদর্শনীতে এনেছেন ১৯৭২ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের স্পেসিমেন ব্যাংক নোট, ‘অমূল্য’ ত্রুটিপূর্ণ ব্যাংক নোট এবং বাংলাদেশে ব্যাংক নোটের প্রথম ও শেষ সিরিয়াল নম্বরের নোট। এছাড়া তাঁর সংগ্রহে রয়েছে ব্রিটিশ ভারতের প্রিন্সলি স্টেটের কয়েনও।

লেখক ও গবেষক সাদ উর রহমান নিজেও একজন মুদ্রা সংগ্রাহক। তিনি জানান, তাঁর সংগ্রহে সম্রাট বাবর, আকবর, শাজাহানসহ মোগল আমলের শাহরুখি মুদ্রা এবং নুরজাহানি মুদ্রা রয়েছে, যেগুলো কাবুল–কান্দাহার থেকে তৈরি হতো।

প্রদর্শনীর প্রথম দিনই ভিড় জমিয়েছেন নবীন ও প্রবীণ অনেক উৎসাহী মানুষ। বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘টাকার জাদুঘর’–এর সাবেক কিউরেটর আছিয়া খানম মুক্তকণ্ঠকে বলছিলেন, ‘এ প্রদর্শনী দেখে বর্তমান প্রজন্ম জানতে পারবে, এ অঞ্চলসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও অঞ্চলের মুদ্রার ইতিহাস। কত সমৃদ্ধ ছিল আগের মানুষ আর তাঁদের চিন্তাভাবনা। সে ক্ষেত্রে এ ধরনের প্রদর্শনীর আয়োজন ভবিষ্যতের জন্য অনুপ্রেরণা।’ তাঁর মতে, এই প্রদর্শনী দেখার সুযোগ কারও হাতছাড়া করা উচিত হবে না।

মুদ্রার পাশাপাশি প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছে ব্রিটিশ সরকারের দেওয়া বিভিন্ন মেডেল ও উপাধি, বাংলাদেশের বিভিন্ন মেডেল, নানা মূল্যমানের প্রাইজবন্ড এবং ডিজিটাল যুগের বিভিন্ন ব্যাংকের এটিএম কার্ড। এসব নিদর্শন মুদ্রা ও বিনিময়ব্যবস্থার পাশাপাশি পুরস্কার, সম্মাননা ও আর্থিক লেনদেনের বিবর্তনের পরিচয় তুলে ধরেছে।

সকালে আনুষ্ঠানিকভাবে এই প্রদর্শনীর উদ্বোধন করা হয়। প্রধান অতিথির বক্তব্যে যমুনা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মির্জা ইলিয়াস উদ্দীন আহম্মদ বলেন, মুদ্রার সঙ্গে একটি দেশের ইতিহাস–সংস্কৃতি জড়িত থাকে। এই মহতী উদ্যোগে পাশে থাকতে পেরে তাঁর প্রতিষ্ঠান গর্বিত। বিশেষ অতিথির বক্তব্যে রিপাবলিক ইনশিউরেন্সের সিইও সারোয়ার জাহান নকল মুদ্রার ঝুঁকির বিষয়ে সতর্ক করেন। পুরো অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন বিএনসিএসের সভাপতি মো. রবিউল ইসলাম। অনুষ্ঠানের শেষে বিএনসিএস জার্নাল অবমুক্ত করা হয়।

এই প্রদর্শনী চলবে আগামীকাল ৩১ অক্টোবর সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত।

বিশ্বের জনপ্রিয় শখগুলোর মধ্যে মুদ্রা সংগ্রহ অন্যতম। একটি মুদ্রা থেকে কোনো নির্দিষ্ট সময়ের শাসনব্যবস্থা, অর্থনীতি, শিল্পবোধ ও মানুষের জীবনযাপনের কথা জানা যায়। সে অর্থে এই প্রদর্শনী কেবল সংগ্রাহকদের সংগ্রহ দেখার আয়োজন নয়, বরং ইতিহাসকে খুব কাছ থেকে জানার এক অনন্য সুযোগ।