মান্ধাতা বর্তমান সময়ের মানুষ নন, বরং তিনি অনেক প্রাচীনকালের। পৌরাণিক কাহিনী অনুযায়ী তিনি ছিলেন অযোধ্যা নগরের রাজা। রামায়ণ রচনার বহু বছর পর আজও তাঁর নাম ব্যবহৃত হয়; বলা হয় ‘মান্ধাতার আমল’। এটি যেন চোখ বন্ধ করে অযথা পুরনো প্রথাকে আঁকড়ে ধরার এক অদ্ভুত মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ।

সময়ের সাথে সাথে যুগ বদলেছে। মানুষের চাওয়া, পাওয়া, রুচি, বোধ এবং সংস্কৃতিতে এসেছে আমূল পরিবর্তন। সভ্যতা সবসময়ই ইতিবাচক ও প্রবহমান ধারার সাথে তাল মিলিয়ে এগিয়েছে। তবে উপজেলা পর্যায়ের সাব-রেজিস্ট্রারের কার্যালয়গুলো যেন এখনো পুরনো পদ্ধতিকেই আষ্টেপৃষ্ঠে ধরে রেখেছে। এই পরিস্থিতি দেখে প্রশ্ন জাগে, এটি কি সেই তথাকথিত ‘মান্ধাতা-প্রীতি’ কি না।

বর্তমান সময়ে সরকারি দপ্তরগুলো থেকে হাতে-লেখা কাগজের ব্যবহার প্রায় বিলুপ্ত। এমনকি গ্রামের সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষও এখন আর হাতে-লেখা চিঠি বা আবেদন জমা দেন না। অথচ সাব-রেজিস্ট্রারের কার্যালয়ে এখনো হাতে-লেখা কাগজের আধিপত্য বিদ্যমান। দলিলের ‘নকল’ তুলতে গেলে এমন হাতের লেখা পাওয়া যায়, যা অনেক সময় পাঠোদ্ধার করা অসম্ভব হয়ে পড়ে।

একটা সময়ে কার্বন পেপার ব্যবহার করে একাধিক কপি তৈরি করা হতো, যা এখন বিশেষ ক্ষেত্র ছাড়া কেউ ব্যবহার করেন না। কারণ এখন গ্রামের দোকানেই ফটোকপি মেশিন পাওয়া যায়। তা সত্ত্বেও নিবন্ধিত দলিলের কপি একজন দেখে দেখে বালাম বহিতে লেখেন, আরেকজন তা পাঠ করেন এবং তৃতীয় একজন যাচাই করেন। এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ার পর মূল দলিল পাওয়া যায়। এক্ষেত্রে দাতা ও গ্রহীতা একাধিক কপি নিয়ে আসতে পারতেন এবং ফটোকপি করে যাচাইয়ের পর স্বাক্ষর দিয়ে তা প্রদান করা যেত।

কিন্তু আইন ও বিধির পরিবর্তন না হওয়ায় এই পদ্ধতি বদলায়নি। এটি ছিল অনলাইন যুগের আগের কথা, যখন কয়েক দশক আগে নিবন্ধন করা হতো। তবে মূল আলোচনার বিষয় হলো জমির নিবন্ধনের অনলাইন ব্যবস্থাপনা।

ভূমি ব্যবস্থাপনায় নামজারির প্রক্রিয়াটি লক্ষ্য করা যাক। একজন ব্যক্তি জমি পাওয়ার পর দলিল নিবন্ধন করলে তিনি জমির মালিক হন। তবে সরকারের রেকর্ড হালনাগাদ করে সেখানে নিজের নাম যুক্ত করতে হয়, যাকে বলা হয় নামজারি। আবেদন জমা পড়লে সহকারী কমিশনার (ভূমি) তা ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তার কাছে পাঠান।

সরেজমিনে পরিদর্শন এবং প্রতিবেদন দাখিলের পর সংশ্লিষ্টদের শুনানির মাধ্যমে নতুন খতিয়ান তৈরি করা হয়। সেই কপির ভিত্তিতে ইউনিয়ন ভূমি অফিসে নতুন মালিকের নামে ভূমি উন্নয়ন কর নেওয়া হয়।

এই বহু ধাপের প্রক্রিয়াটি প্রায় এক দশক আগে থেকেই অনলাইনে পরিচালিত হচ্ছে, অথচ জমি নিবন্ধন এখনো অনলাইনের আওতায় আসেনি। নিবন্ধন প্রক্রিয়াটি অনেকটা ‘ওয়ানস্টপ সার্ভিস’-এর মতো, যেখানে দলিল দাখিল করলে সংযুক্ত কাগজপত্র যাচাই করে অনুমোদন দেওয়া হয়। এই ধরনের সেবার ক্ষেত্রেও পুরনো পদ্ধতি অনুসরণ করাটা এখন আর গ্রহণযোগ্য নয়।

জমি ক্রেতারা প্রায়ই জানতে চান, ওই জমি আগে অন্য কারো কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে কি না। নামজারি না হয়ে থাকলে এই তথ্য সাব-রেজিস্ট্রারের কার্যালয় ছাড়া আর কোথাও পাওয়া যায় না। আর দলিল ঘেঁটে এই তথ্য বের করা অত্যন্ত কঠিন কাজ। অথচ সম্পত্তি হস্তান্তর আইন ১৮৮২-এর ৩ ধারা অনুযায়ী নিবন্ধিত দলিলকে নোটিশ হিসেবে গণ্য করা হয়। ফলে জমি আগেই হস্তান্তর হয়ে থাকলে এবং নতুন ক্রেতা তা না জানলে, সেই দায় ক্রেতারই হয়।

এই আইনি জটিলতার কারণে জমির মালিকরা প্রতিনিয়ত হয়রানির শিকার হচ্ছেন। সারাজীবনের সঞ্চয় দিয়ে জমি কেনার পর অনেকে দেখেন, মাত্র দুই দিন আগেই সেটি অন্য কারো কাছে বিক্রি করা হয়েছে। আবার ৫০ বছর আগের দলিলে বাবার জমি থাকলেও দেখা যায়, বালাম বহির দাগ নম্বর কেউ ঘষামাজা করে পরিবর্তন করে দিয়েছে।

নিবন্ধন ও নামজারি যদি একই প্ল্যাটফর্মে চলে আসে, তবে এক শ্রেণির প্রভাবশালী ভূমিমালিকদের তথ্য প্রকাশ হয়ে তাদের ‘ক্ষতি’ হতে পারে, কিন্তু এর ফলে সাধারণ জনগণ ব্যাপকভাবে উপকৃত হবেন। আমরা চাই এই ছোট দেশের বিপুল জনগোষ্ঠী সীমিত ভূমির সঠিক সেবা পাক এবং সব ধরনের হয়রানি থেকে মুক্ত থাকুক।

ভূমি ব্যবস্থাপনায় আগে এই সমস্যা থাকলেও এখন তা অনেকটা কমেছে। রেকর্ড বা নামজারির অনেক তথ্য অনলাইনে অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় শত বছর আগের কাগজও এখন অনলাইনে পাওয়া যায়। যদিও কিছু অভিযোগ এখনো রয়েছে, যার ফলে অনলাইনে ভূমি অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। এখন যে কেউ অনলাইনে অভিযোগ জানাতে পারেন এবং ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে সেই নিষ্পত্তির বিষয়ে নজরদারি করা সম্ভব। পৃথিবীর যেকোনো প্রান্ত থেকে নামজারির আবেদন ও ভূমি উন্নয়ন কর দেওয়া যায় এবং আবেদনের বর্তমান অবস্থা মুহূর্তেই জানা যায়।

এর বিপরীতে, এখনো মূল দলিল পেতে কয়েক বছর সময় লাগে, দলিলের নকল পাওয়া যায় অস্পষ্ট হাতের লেখায়, এবং জমি হস্তান্তরের সঠিক তথ্য জানা যায় না। দলিল সম্পাদনের জন্য তৃতীয় পক্ষের ওপর নির্ভর করতে হয়। এই বাস্তবতায় জমির নিবন্ধনে যে ‘মান্ধাতা-প্রীতি’ চলছে, সাধারণ মানুষ তা বললে কি ভুল হবে?

সংবাদপত্রের খবর অনুযায়ী, ২০২১ সালে একটি প্রকল্পের আওতায় ১৭টি উপজেলায় পরীক্ষামূলকভাবে অনলাইন রেজিস্ট্রেশন শুরু হয়েছিল। কিন্তু সেই সফটওয়্যার প্রায় এক বছর ধরে বন্ধ এবং প্রকল্পের নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মীরাও আর নেই। সম্প্রতি আরেকটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। আগের প্রকল্পের ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান করে নতুন প্রকল্প সফল করার উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। কারণ চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের এই যুগে পুরনো পদ্ধতিতে নিবন্ধন প্রক্রিয়া বজায় রাখা একটি নেতিবাচক বার্তা দেয়।

ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা ক্লাউস শোয়্যাব তাঁর ‘দ্য ফোর্থ ইন্ডাস্ট্রিয়াল রেভোল্যুশন’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে, দ্বিতীয় ও তৃতীয় শিল্পবিপ্লবের সুফল থেকে পৃথিবীর কত শতাংশ মানুষ বঞ্চিত। এই বৈষম্যের পেছনে ভৌগোলিক অবস্থানের পাশাপাশি নানা কারণ রয়েছে। তবে একই দেশের একই সেবাপ্রদানের ক্ষেত্রে এমন ‘দ্বৈততা’ গ্রহণযোগ্য নয়। ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে ভূমি ব্যবস্থাপনা ও নিবন্ধন প্রক্রিয়াকে একই ছাতার নিচে আনার বিষয়টি পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

২০২৩ সালের ১৪ মে মুক্তকণ্ঠের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, গাইবান্ধা সদর উপজেলার তৎকালীন সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. রেজাউল করিম ১০ হাজার ২১৪ জন নামজারি আবেদনকারীর তথ্যের ওপর জরিপ চালান। সেখানে দেখা যায়, দলিলে প্রাপ্যতার চেয়ে বেশি বিক্রি ১৫ শতাংশ, শ্রেণির ভুল ১১ শতাংশ, দাগের ভুল ৬ শতাংশ, খতিয়ান নম্বরের ভুল ২ শতাংশ এবং দাতার নামে ভুল ৩ শতাংশ। অর্থাৎ মোট ৭৯ ভাগ আবেদনকারীর কাগজপত্রে ত্রুটি ছিল। দলিল নিবন্ধন ও নামজারি একই সেবার দুটি অংশ হওয়া সত্ত্বেও আলাদা প্ল্যাটফর্মে থাকায় এই ধরনের সমস্যা তৈরি হচ্ছে এবং ভুক্তভোগী হচ্ছেন সাধারণ মানুষ।

অনলাইন ব্যবস্থাপনা চালু হলে দলিল লেখক ও বালাম লেখকদের জন্য এলএসএফসি (ল্যান্ড সার্ভিস ফ্যাসিলিটেটিং সেন্টার) বা ভূমি সেবা সহায়তা কেন্দ্রের মতো লাইসেন্স প্রদান করে আলাদা ব্যবস্থা করা যেতে পারে। শুধু লটারির মাধ্যমে সাব-রেজিস্ট্রার বদলি করে হয়রানি কমানো সম্ভব নয়। বরং অদক্ষ ব্যক্তি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নিযুক্ত হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।

আমরা চাই পরিস্থিতির উন্নতি হোক। নিবন্ধন ও নামজারি একই প্ল্যাটফর্মে এলে এক শ্রেণির ভূমিমালিকদের তথ্য সহজে প্রকাশযোগ্য হয়ে তাদের ‘ক্ষতি’ হবে ঠিকই, কিন্তু উপকৃত হবেন সাধারণ জনগণ। আমরা চাই, ছোট এই দেশের বিপুল জনগোষ্ঠী সীমিত ভূমির সঠিক সেবা পাবেন, মুক্ত থাকবেন সব ধরনের হয়রানি থেকে।

— মুহাম্মদ আবু সাঈদ, সাবেক শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়