গাজীপুরের শ্রীপুরে এক অদ্ভুত ও মায়াবী বন্ধুত্বের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়েছে একটি কানি বক এবং স্থানীয় এক মাছ বিক্রেতা। কোনো খাঁচা বা শিকলের বাঁধন ছাড়াই প্রতিদিনের অভ্যাসে বকটি উড়ে বেড়ায় খোলা আকাশে, আর সন্ধ্যায় ফিরে আসে তার প্রিয় আশ্রয়স্থল—মাছ বিক্রেতা জসিমের কোলে। কেবল ভালোবাসার টানই এই সম্পর্কের মূল ভিত্তি।
সকাল হলেই বকটি ডানা মেলে উড়ে যায়। সারাদিন সে ঘুরে বেড়ায় জলাশয়ে কিংবা খোলা মাঠে। কিন্তু সূর্য ডুবলেই তার গন্তব্য হয় জসিমের মাছের দোকান। সেখানে ফিরে এসে সে জসিমের কোলে আশ্রয় নেয়। জসিম নিজের হাতে বকটিকে মাছ খাওয়ান। কখনো বকটি তার কোলে বসে থাকে, আবার কখনো মাছ বিক্রির টেবিলের ওপর অবস্থান করে। এখানে নেই কোনো বন্দিত্ব, নেই কোনো লোহার খাঁচা; আছে শুধু অকৃত্রিম মায়ার টান।
জসিম যখন দোকান থেকে সামান্য দূরে যান, তখন বকটি তার বসার কাঠের পিঁড়িতে অতন্দ্র প্রহরীর মতো দাঁড়িয়ে থাকে। অপরিচিত কেউ দোকানে এলে বকটি কখনো তেড়ে যায় কিংবা ভয় দেখায়। তবে জসিম ফিরে আসার সাথে সাথেই সে পুনরায় শান্ত হয়ে যায়।
গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার চকপাড়া গ্রামের বাসিন্দা জসিম উদ্দিনের (৩০) সঙ্গে এই কানি বকের এমন হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। চকপাড়ার মেডিক্যাল মোড়ে তাঁর মাছ বিক্রির দোকান।
এই বন্ধুত্বের শুরুটা ছিল আকস্মিক। জসিম বলেন, “প্রায় ছয় মাস আগে বাড়ির পাশের বাঁশঝাড় থেকে নিচে পড়ে গিয়েছিল বকের ছানাটি। তিনি ছানাটি কুড়িয়ে আনেন। সে সময় ছানাটির বয়স ছিল ১০ থেকে ১২ দিন। এত ছোট ছানা নিজে বাঁচতে পারবে কি না, তা নিয়ে দুশ্চিন্তা ছিল। তাই শুরু হয় যত্ন। মাছের দোকানের ভেতরেই ঠাঁই হয় ছানাটির। একসময় উড়তেও শেখে। তখন চাইলে তাকে আটকে রাখতে পারতেন জসিম, কিন্তু রাখেননি। এখন সকালে দোকান খুললেই বকটি উড়ে চলে যায়। সন্ধ্যায় আবার ফিরে আসে। এভাবেই প্রতিদিন সন্ধ্যা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত মাছের দোকানে বসে থাকে বকটি। এরপর দোকান বন্ধ করলেও বকটি ভেতরেই থাকে।”
জসিম ও বকের এই বিরল বন্ধুত্বের কথা এখন পুরো এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। কৌতূহলী মানুষ বকটিকে দেখার জন্য দোকানে ভিড় করেন। অনেকে বকটিকে কেনার আগ্রহ দেখিয়েছেন এবং মোটা অঙ্কের দামও প্রস্তাব করেছেন। তবে বকটিকে বিক্রি করার কথা তিনি ভাবেনইনি। জসিম বলেন, “ছোট থাইক্যা পাখিডারে লালন–পালন করছি। এহন ওর প্রতি আমার অনেক মায়া লাগে। প্রতিদিন নিজের হাতে মাছ খাওয়াই। অনেকে আইসা কয়, বকটা বেইচা দিতে। কিন্তু আমি বেইচা দিমু না। আমি তো তাকে ভালোবাসি।”
অনেকে জসিমকে সতর্ক করে বলেছেন, বকটির ঠোঁটের খোঁচায় তাঁর চোখের ক্ষতি হতে পারে, তাই পাখিটিকে দূরে রাখাই শ্রেয়। কিন্তু এসব কথায় কান দেননি তিনি। জসিম দৃঢ়তার সাথে বলেন, “আমি কারও কথা কানে নিই না। সে যেহেতু আমারে ভালোবাইসা প্রতিদিন সন্ধ্যায় আসে, আমিও তারে ভালোবাসি। আমি তো তারে বন্দী করি নাই, কোনো দিন করবও না। সে তার মতো সকালে উড়ে যায়, আবার সন্ধ্যায় আমারে আপন মনে কইরা আশ্রয়ের জন্য আসে।”
প্রতিদিন সন্ধ্যায় বকটির এই ফিরে আসার পেছনে অভ্যাস, নিরাপত্তা কিংবা খাবারের আকর্ষণসহ বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে বলে মনে করেন স্থানীয় পরিবেশকর্মী সাইদ চৌধুরী। তিনি বলেন, “জসিম কানি বকটিকে বন্দী করে রাখেননি। আমার মনে হয়, পাখিটি জসিমের মায়ায় পড়েছে। এ জন্যই সারা দিন উড়ে বেড়িয়ে সন্ধ্যায় তাঁর কাছে চলে আসে। পশুপাখিরা তাদের নিজস্ব পরিবেশে স্বাধীনভাবে বাঁচুক।”