জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। একই মামলায় আরও তিন আসামিকে আমৃত্যু সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া দণ্ডিত এই চার আওয়ামী লীগ নেতার স্থাবর সম্পদের অর্ধেক বাজেয়াপ্ত করার আদেশ দিয়েছেন আদালত।

বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বেঞ্চ এই রায় ঘোষণা করেন। ট্রাইব্যুনালের অন্য দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ এবং বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর। আমৃত্যু কারাদণ্ড পাওয়া তিন আসামি হলেন কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান সদর উদ্দিন খান, কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আসগর আলী এবং কুষ্টিয়া পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান। উল্লেখ্য, মাহবুব উল আলম হানিফসহ দণ্ডিত চার আসামিই বর্তমানে পলাতক।

রায়ে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, সাজাপ্রাপ্ত সব আসামির স্থাবর সম্পত্তির অর্ধেক বাজেয়াপ্ত করা হবে। এই বাজেয়াপ্ত করা সম্পত্তি বিক্রয়লব্ধ অর্থ জুলাই ফাউন্ডেশন অথবা অন্য কোনো বিধিবদ্ধ সংস্থার মাধ্যমে জুলাই আন্দোলনে নিহত ও আহত ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণ হিসেবে প্রদান করতে হবে।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় এখন পর্যন্ত মোট আটটি মামলার রায় ঘোষণা করা হয়েছে। এসব রায়ে মোট ৭২ জনকে সাজা দেওয়া হয়েছে। যাদের মধ্যে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানসহ ২৩ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে ১৯ জন পলাতক এবং ৪ জন বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন।

বৃহস্পতিবার বেলা ১১টা ৫০ মিনিটের পর ট্রাইব্যুনাল-২ এর বিচারক ও বিচারপতিরা আসন গ্রহণ করেন এবং দুপুর ১২টার আগেই রায় ঘোষণা শুরু হয়। ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরী জানান, যেহেতু এ মামলার কোনো আসামি উপস্থিত ছিলেন না, তাই তাঁরা বিস্তারিত রায় না পড়ে কার কী সাজা হয়েছে তা ঘোষণা করছেন।

আদালতের রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে, আসামিদের বিরুদ্ধে মোট পাঁচটি অভিযোগ আনা হয়েছিল এবং সবকটি অভিযোগই প্রমাণিত হয়েছে। সেই অনুযায়ী বিভিন্ন সাজা দেওয়া হয়েছে। ঘোষিত রায়ে বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, “এক নম্বর অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে আসামি মাহবুব উল আলম হানিফকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হলো। আর দুই ও তিন নম্বর অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে তাঁকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হলো।”

মামলার এক নম্বর অভিযোগে বলা হয়েছে, মাহবুব উল আলম হানিফের প্ররোচনা, উসকানি, অনুমোদন ও নির্দেশে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তাঁর অধীনস্থ আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের ক্যাডার এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা কুষ্টিয়া শহরের বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালায়। ওই দিনের গুলিতে আশরাফুল ইসলাম, সুরুজ আলী, আবদুল্লাহ আল মুস্তাকিন, মো. উসামা, বাবুল ফরাজী ও ইউসুফ শেখ নামে ছয়জন শহীদ হন। এই অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় হানিফকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

রায়ে আরও বলা হয়েছে, আসামিদের বিরুদ্ধে আনা পাঁচটি অভিযোগের সবকটিই প্রমাণিত হয়েছে এবং সেই অনুযায়ী সাজা প্রদান করা হয়েছে।

দুই নম্বর অভিযোগটি ছিল অন্যান্য অমানবিক কর্মকাণ্ড সংক্রান্ত। এতে বলা হয়েছে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় অপরাধমূলক পরিকল্পনার অংশ হিসেবে মাহবুব উল আলম হানিফ ও তাঁর সহযোগীরা কুষ্টিয়া এবং দেশের অন্যান্য অঞ্চলে শত শত নিরস্ত্র বেসামরিক নাগরিক ও শিক্ষার্থীর ওপর ইচ্ছাকৃতভাবে মারাত্মক শারীরিক জখম, নির্যাতন এবং নিষ্ঠুর, অমানবিক ও মর্যাদাহানিকর আচরণ করেছেন। এই অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের মধ্যে গুলি করা, মারধর করা, বেআইনিভাবে আটকে রাখা এবং আহতদের চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত করা অন্তর্ভুক্ত ছিল, যা হানিফের জ্ঞাতসারে ও সম্মতিতে সংঘটিত হয়েছিল। এই অপরাধে তাঁকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

তিন নম্বর অভিযোগটি ছিল রাজনৈতিক কারণে নিপীড়ন বিষয়ে। এতে বলা হয়েছে, গণ-অভ্যুত্থানের সময় হানিফ ও তাঁর সহযোগীরা আন্দোলনকারীদের বিএনপি, জামায়াত, সন্ত্রাসী ও রাষ্ট্রবিরোধী শক্তি হিসেবে চিহ্নিত করেন এবং এর মাধ্যমে তাঁদের হত্যা, নির্যাতন ও নির্বিচার গ্রেপ্তারের উসকানি দেন। এই অপরাধে তাঁকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

রায় ঘোষণার পর ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে আসামিপক্ষের রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী আমির হোসেন বলেন, “এই রায় তাঁর কাছে অপ্রত্যাশিত মনে হয়েছে। তিনি হতাশ।”

ঘোষিত রায়ে বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরী আরও জানান, এক নম্বর অভিযোগে (ছয় আন্দোলনকারীকে হত্যার নির্দেশ, প্ররোচনা ও উসকানি) সদর উদ্দিন খান, আসগর আলী ও আতাউর রহমানকে দোষী সাব্যস্ত করে আমৃত্যু সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি তাঁদের দুই (অন্যান্য অমানবিক কর্মকাণ্ড) ও তিন (রাজনৈতিক কারণে নিপীড়ন) নম্বর অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছে।

বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরী আরও বলেন, এ মামলার চার আসামিকেই চার ও পাঁচ নম্বর অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে প্রত্যেককে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছে। চার নম্বর অভিযোগে তাঁদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের ষড়যন্ত্র ও সহায়তার অভিযোগ আনা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, তাঁরা কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল পদে থেকে ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি প্রাণঘাতী উপায়ে দমন করার জন্য ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর মন্ত্রিসভার প্রণীত নীতি বাস্তবায়নে সজ্ঞানে ষড়যন্ত্র ও সহায়তা করেছেন। এই অপরাধে হানিফসহ চার আসামির যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড হয়েছে।

পাঁচ নম্বর অভিযোগে আসামিদের বিরুদ্ধে ‘যৌথ পরিকল্পনা এবং অপরাধমূলক সংগঠনের’ অভিযোগ আনা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, গণ-অভ্যুত্থানের সময় নিরস্ত্র শিক্ষার্থী ও বেসামরিক নাগরিকদের ওপর ব্যাপক মাত্রায় ও পদ্ধতিগতভাবে আক্রমণ করা হয়। একটি সাধারণ নিপীড়নমূলক নীতির আওতায় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও তাদের সহযোগী ১৪–দলীয় জোট এই অপরাধ করে অপরাধমূলক সংগঠন হিসেবে। তারা যৌথভাবে এসব অপরাধের পরিকল্পনাও করে। এ মামলার আসামিরা এই অপরাধমূলক সংগঠনের অংশ হিসেবে অপরাধ করেন। এই অপরাধে হানিফসহ চার আসামিকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

রায় ঘোষণার পর পাঁচ নম্বর অভিযোগের বিষয়ে ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামীম সাংবাদিকদের বলেন, “সারা দেশে ব্যাপক মাত্রায় ও পদ্ধতিগতভাবে আক্রমণের মাধ্যমে যে মানবতাবিরোধী অপরাধ হয়েছে, এটি ছিল আওয়ামী লীগের একটি সাংগঠনিক পরিকল্পনা, যা বাস্তবায়ন করেছে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও ১৪–দলীয় জোট। এটি প্রমাণিত হওয়ায় চার আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ আওয়ামী লীগকে একটি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে এ মামলার রায়ে পর্যবেক্ষণ দেওয়া হয়েছে।”

অন্যদিকে, আসামিপক্ষের রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী আমির হোসেন এই রায়কে অপ্রত্যাশিত বলে হতাশা প্রকাশ করেন। তবে ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, “আমরা মনে করি, অত্যন্ত সময়োপযোগী রায় হয়েছে। জুলাইয়ের শহীদদের আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আমরা এ রায়কে স্বাগত জানিয়েছি।”