মোটরসাইকেলের সঙ্গে ট্রাকের সংঘর্ষ, বাসের চাপায় প্রাণহানি কিংবা অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহনের উল্টে যাওয়ার মতো ঘটনাগুলো মেহেরপুরের সড়কগুলোকে যেন মৃত্যুফাঁদে পরিণত করেছে। একের পর এক এই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারাচ্ছেন সাধারণ মানুষ, আর সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো এই মৃত্যুর তালিকায় যুক্ত হচ্ছে কোমলমতি শিশুরাও।

সদর, গাংনী ও মুজিবনগর—জেলার এই তিন উপজেলাতেই বছরজুড়ে ঘটছে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা। তবে অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, ২০২৬ সালের ২৮ অক্টোবর পর্যন্ত জেলায় মোট কতটি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে, কতজন প্রাণ হারিয়েছেন কিংবা কতজন আহত হয়েছেন, তার কোনো পূর্ণাঙ্গ ও সমন্বিত সরকারি হিসাব দিতে পারেনি সংশ্লিষ্ট কোনো দপ্তর।

মুক্তকণ্ঠের পর্যালোচনায় বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় গণমাধ্যমের সংবাদ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, চলতি বছরের ২৮ অক্টোবর পর্যন্ত মেহেরপুরে সড়ক দুর্ঘটনায় অন্তত ২৫ জন নিহত এবং ৭৭ জন আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে বেশ কয়েকজন শিশুশিক্ষার্থী ও তরুণ রয়েছেন। তবে এটি কোনো সরকারি পরিসংখ্যান নয়। অনেক দুর্ঘটনার খবর গণমাধ্যমে না আসায় প্রকৃত প্রাণহানি ও আহতের সংখ্যা আরও বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ৯ মার্চ বিকেলে মেহেরপুর পিটিআইয়ের সামনে এক সড়ক দুর্ঘটনায় একজন নিহত এবং এক শিশুসহ আরও তিনজন আহত হন। ১ এপ্রিল মেহেরপুর-চুয়াডাঙ্গা আঞ্চলিক মহাসড়কে মোটরসাইকেল, মাইক্রোবাস ও ব্যাটারিচালিত পাখিভ্যানের ত্রিমুখী সংঘর্ষে তিনজনের মৃত্যু হয় এবং আহত হন আরও দুজন।

১১ এপ্রিল সদর উপজেলার বারাদি ইউনিয়নের চাঁদপুর এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় একজন নিহত ও তিনজন গুরুতর আহত হন। এরপর ২২ মে রাতে মেহেরপুর পিটিআই-সংলগ্ন সড়কে দাঁড়িয়ে থাকা কলাবোঝাই ট্রাকের পেছনে দ্রুতগতির মোটরসাইকেলের ধাক্কায় ঘটনাস্থলেই নিহত হন নয়ন (১৮) ও শোভন (১৮)। পরদিন ২৩ মে মেহেরপুর-মুজিবনগর সড়কে ট্রাক ও মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে নয়ন হোসেন (২২) ও জীবন আলী (২১) নামে আরও দুই যুবকের মৃত্যু হয়।

জুন মাসেও মৃত্যুর মিছিল অব্যাহত ছিল। ৪ জুন মেহেরপুরের ওলিনগর এলাকায় ব্যাটারি চালিত ইজিবাইক ও ট্রাকের সংঘর্ষে আরিফুল ইসলাম (৩২), আকবর আলী (১০) ও আফরিন (৪) নিহত হন। এ ঘটনায় আরও দুজন আহত হন। একই দিন মেহেরপুর-চুয়াডাঙ্গা আঞ্চলিক মহাসড়কের দরবেশপুর এলাকায় অবৈধ যান আলগামন উল্টে নাজিম উদ্দিন (৬৫) নামে এক ছাগল ব্যবসায়ীর মৃত্যু হয় এবং আহত হন আরও চারজন। জানা গেছে, দ্রুতগতির আলগামনটি একটি বাসকে ওভারটেক করার সময় বিপরীত দিক থেকে আসা ড্রাম ট্রাক দেখে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উল্টে যায়।

৮ জুলাই গাংনীতে গরু বোঝাই লাটাহাম্বা উল্টে উজ্জ্বল (৩৫) নামে এক গরু ব্যবসায়ীর মৃত্যু হয় এবং আহত হন আরও ১১ জন গরু ব্যবসায়ী। ২ আগস্ট গাংনী উপজেলার রামনগরে লেগুনার নিচে চাপা পড়ে আমির হামজা (৬) নামে প্রথম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়। ৪ আগস্ট মটমুড়া গ্রামে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান জাহানারা খাতুন (৭০) নামে এক বৃদ্ধা।

সেপ্টেম্বরেও সড়কে প্রাণ হারিয়েছেন শিশুরা। ১৩ সেপ্টেম্বর মুজিবনগর উপজেলার মহাজনপুরে ইজিবাইকের ধাক্কায় জান্নাতুল খাতুন (৭) নামে এক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নিহত হয়। একই দিন মানিকনগর গ্রামের ডিএস আমেনিয়া মাদ্রাসার তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী নাবিল (১২) মোটরসাইকেলের ধাক্কায় সড়কে ছিটকে পড়ে এবং পরে পেছন থেকে আসা একটি ট্রাক্টর তাকে চাপা দিলে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।

অক্টোবরেও প্রাণহানির ঘটনা থামেনি। ১২ অক্টোবর মেহেরপুর সদর উপজেলায় ফাহিম (৭) নামে প্রথম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী বাসের চাপায় নিহত হয়। পরদিন ১৩ অক্টোবর সকালে মেহেরপুর-কুষ্টিয়া আঞ্চলিক মহাসড়কের গাংনীর ছাতিয়ান এলাকায় ক্রাউন পরিবহনের বাসের চাপায় আব্দুস শুকুর নামে এক ভ্যানচালকের মৃত্যু হয়।

এছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, আরও তিন শিশুসহ পাঁচজন সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত এবং ৪৯ জন আহত হয়েছেন। তবে এসব ঘটনার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ ও সরকারি নথি পাওয়া যায়নি। স্থানীয় পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকায় অনেক দুর্ঘটনার খবর গণমাধ্যমে না আসায় সামগ্রিক চিত্র নিরূপণ কঠিন হয়ে পড়েছে।

গত ৭ অক্টোবর বিআরটিএর আর্থিক সহায়তা বিতরণ অনুষ্ঠানে মেহেরপুরে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ও আহত ব্যক্তিদের মোট ৩৫টি পরিবারকে এক কোটি ১০ লাখ টাকা অনুদান দেওয়া হয়। এর মধ্যে নিহত ব্যক্তিদের ১৮টি পরিবারের প্রত্যেককে পাঁচ লাখ টাকা করে সহায়তা দেওয়া হয়। বাকি ১৭টি পরিবার ছিল সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত বা পঙ্গুত্ব বরণকারীদের, যাদের চিকিৎসার জন্য মোট ২০ লাখ টাকা দেওয়া হয়।

তবে অনুদান পাওয়া পরিবারগুলো ঠিক কোন বছরে দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন, তা নিশ্চিত করা হয়নি। ফলে ওই ১৮ জনকে চলতি বছরের তালিকায় যুক্ত করা বা এই সংখ্যাকে ২০২৬ সালের প্রাণহানির হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।

একদিকে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রাণহানির খবর আসছে, অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কাছে নেই চলতি বছরের সমন্বিত হিসাব। ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের দায়ে প্রায় ২ হাজার ১৫০টি মামলা এবং সড়ক দুর্ঘটনায় ১২টি মামলা হওয়ার তথ্য পাওয়া গেলেও, তা দিয়ে জেলার সামগ্রিক পরিস্থিতি নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। বিশেষ করে শিশুদের মৃত্যুর ঘটনা সড়ক নিরাপত্তা, গতি নিয়ন্ত্রণ, ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহনের চলাচল এবং ট্রাফিক আইন বাস্তবায়ন নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে।

মেহেরপুর জেলা বিআরটিএ কার্যালয়ের মোটরযান পরিদর্শক সাইদুর রহমান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “মেহেরপুর জেলায় সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তিদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা এই মুহূর্তে আমাদের পক্ষে সরবরাহ করা সম্ভব নয়। এসব তথ্য কেন্দ্রীয় সার্ভারে সংরক্ষিত ও হালনাগাদ করা হয়, যা ঢাকায় অবস্থিত বিআরটিএর প্রধান কার্যালয় থেকে সার্বক্ষণিকভাবে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব। ডিসেম্বর মাস শেষ হলে চলতি বছরে জেলায় মোট সড়ক দুর্ঘটনা এবং এসব দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তিদের প্রকৃত সংখ্যা আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো যাবে।”

মেহেরপুর জেলা পুলিশের ট্রাফিক পুলিশ পরিদর্শক মো. আব্দুল হান্নান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “গত বছর মেহেরপুর জেলায় সড়ক দুর্ঘটনায় ৬৭ জনের মৃত্যু হয়েছিল। তবে চলতি বছরের শুরু থেকেই সড়কে শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে জেলা ট্রাফিক বিভাগ জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছে। এ পর্যন্ত ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের দায়ে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ২ হাজার ১৫০টি মামলা দেওয়া হয়েছে।”

মেহেরপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জামিনুর রহমান খান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত মেহেরপুর জেলায় সড়ক দুর্ঘটনাজনিত ঘটনায় সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮-এর আওতায় মোট ১২টি মামলা হয়েছে। সড়ক দুর্ঘটনার ঘটনায় অপরাধের ধরন, প্রাপ্ত তথ্য-প্রমাণ এবং প্রযোজ্য আইনগত বিধান বিবেচনায় নিয়ে মামলা ও পরবর্তী আইনগত কার্যক্রম পরিচালিত হয়। দুর্ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।”