সাড়ে চার বছরের দীর্ঘ লড়াই শেষে জ্যেষ্ঠতাসহ দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চাকরিতে পুনর্বহাল হতে যাচ্ছেন মো. শরীফ উদ্দিন। হাইকোর্টের দেওয়া রায়ের বিরুদ্ধে দুদক যে লিভ টু আপিল বা আপিল করার অনুমতি চেয়ে আবেদন করেছিল, তা প্রত্যাহার করে নেওয়ার আবেদন মঞ্জুর করেছে আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত। ফলে এখন তাঁর চাকরিতে ফেরার পথে আর কোনো আইনি বাধা নেই বলে জানিয়েছেন তাঁর আইনজীবী।
২০২২ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি পটুয়াখালী কার্যালয়ের উপসহকারী পরিচালক হিসেবে কর্মরত মো. শরীফ উদ্দিনকে চাকরি থেকে অপসারণ করা হয়। এর আগে ২০২১ সালের ১৬ জুন পটুয়াখালীতে বদলি হওয়ার আগে তিনি দুদকের চট্টগ্রাম কার্যালয়ে কর্মরত ছিলেন। সেই সময়ে সরকারি প্রকল্পের জমি অধিগ্রহণে অনিয়মের ঘটনা তদন্ত করে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা করার সুপারিশ করেছিলেন তিনি। অভিযোগ ছিল, দায়িত্ব পালনের কারণেই তিনি প্রাণনাশের হুমকি পেয়েছিলেন এবং সে বিষয়ে থানায় জিডি-ও করেছিলেন। শরীফ উদ্দিনের এই আকস্মিক চাকরিচ্যুতির ঘটনাটি তখন ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। এমনকি দুদকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে দুদকের নিজেদের কর্মীদের অংশগ্রহণে মানববন্ধনের মতো প্রতিবাদ কর্মসূচিও পালিত হয়েছিল।
চাকরি ফিরে পেতে আইনি লড়াই শুরু করেন শরীফ উদ্দিন। তাঁকে চাকরিচ্যুতির বিষয়ে দুদকের আদেশে উল্লেখ করা হয়েছিল, “দুর্নীতি দমন কমিশন (কর্মচারী) বিধিমালা, ২০০৮-এর বিধি ৫৪ (২)-তে প্রদত্ত ক্ষমতাবলে মো. শরীফ উদ্দিন (উপসহকারী পরিচালক) দুদক, সমন্বিত জেলা কার্যক্রম, পটুয়াখালীকে চাকরি থেকে অপসারণ করা হলো। তিনি বিধি মোতাবেক ৯০ দিনের বেতন এবং প্রযোজ্য সুযোগ-সুবিধা পাবেন।”
তবে কোনো ধরনের কারণ দর্শানো ছাড়াই বিধি ৫৪(২) প্রয়োগ করে একজন কর্মীকে অপসারণ করা কতটা বৈধ, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলে ২০২২ সালের ১৩ মার্চ হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন শরীফ। রিটের শুনানির সময় আদালতে জানানো হয়, একই বিধির ক্ষমতাবলে মো. আহসান আলী নামে আরেক কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুতির বিষয়ে দুদকের করা আপিল শুনানির জন্য আপিল বিভাগে রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ২০২২ সালের ২৫ মে হাইকোর্ট এক আদেশে জানান, ওই আপিলের নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত শরীফের রিটের শুনানি মুলতবি থাকবে।
হাইকোর্টের এই আদেশ স্থগিত করতে চেয়ে ২০২২ সালের ১৬ জুন আপিল বিভাগে লিভ টু আপিল করেন শরীফ উদ্দিন। মো. আহসান আলীর রিটের পরিপ্রেক্ষিতে বিধি ৫৪(২) বাতিল করে হাইকোর্টের দেওয়া রায়ের বিরুদ্ধে দুদকের করা আপিলের সঙ্গে শরীফের আবেদনটি একসঙ্গে শুনানির জন্য ওঠে। ২০২৩ সালের ১৬ মার্চ আপিল বিভাগ দুদকের আপিল মঞ্জুর করে রায় দেন এবং হাইকোর্টের দেওয়া বিধি বাতিলের রায়টি বাতিল করা হয়। সেই সঙ্গে শরীফ উদ্দিনের করা লিভ টু আপিলটিকে প্রয়োজনের অতিরিক্ত বলে উল্লেখ করা হয়।
২০২৩ সালের ২১ ডিসেম্বর আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়। ওই রায়ে স্পষ্টভাবে বলা হয় যে, দুর্নীতি দমন কমিশন (কর্মচারী) চাকরি বিধিমালার ৫৪(২) বিধিটি সর্বোচ্চ সতর্কতার সঙ্গে প্রয়োগ করতে হবে। এই পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি বিধিটি প্রয়োগের ক্ষেত্রে দুদককে ১২ দফা গাইডলাইন বা পর্যবেক্ষণ অনুসরণ করার নির্দেশ দেওয়া হয়।
আপিল বিভাগের এই পূর্ণাঙ্গ রায়ের পর শরীফ উদ্দিনের রিটটি পুনরায় হাইকোর্টে শুনানির জন্য উপস্থাপন করা হয়। ২০২৪ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি প্রাথমিক শুনানির পর হাইকোর্ট রুল দেন এবং গত বছরের ৯ জুলাই চূড়ান্ত শুনানি শেষে রায় প্রদান করেন। রায়ে আদালত বলেন, ২০২২ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি শরীফ উদ্দিনকে চাকরিচ্যুতির যে আদেশ দেওয়া হয়েছিল, তা আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত এবং শুরু থেকেই বাতিল। আদালত জ্যেষ্ঠতা ও বকেয়া সব সুবিধাসহ শরীফ উদ্দিনকে চাকরিতে পুনর্বহাল করার নির্দেশ দেন এবং রায়ের অনুলিপি পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে তা বাস্তবায়ন করতে বলেন।
হাইকোর্টের এই রায়ের পর পুনরায় লিভ টু আপিল করে দুদক। তবে পরবর্তীতে সংস্থাটি নিজেই সেই লিভ টু আপিল প্রত্যাহার করার আবেদন জানায়। ১৫ অক্টোবর আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত সেই আবেদন মঞ্জুর করে আদেশ দেন। আদেশে উল্লেখ করা হয়, আবেদনকারীর পক্ষে উপস্থিত আইনজীবী (অ্যাডভোকেট অন রেকর্ড) দেওয়ানি লিভ টু আপিলটি না চালানোর জন্য নির্দেশনা পেয়েছেন। তাঁর এই বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে ‘নট টু প্রসিড’ বা না চালানোর কারণে লিভ টু আপিলটি খারিজ করা হয়।
শরীফ উদ্দিনের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সালাহ উদ্দীন দোলন জানান, হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে দুদক যে লিভ টু আপিল করেছিল, তা প্রত্যাহার চেয়ে আবেদন করেছিল সংস্থাটি। আজ বৃহস্পতিবার তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত আবেদনটি মঞ্জুর করেছেন। অর্থাৎ লিভ টু আপিল প্রত্যাহার হয়ে গেল। জ্যেষ্ঠতা ও বকেয়া সব সুবিধাসহ শরীফ উদ্দিনকে চাকরিতে পুনর্বহাল করতে হাইকোর্ট নির্দেশ দিয়ে রায় দিয়েছিলেন, তা বহাল রইল। শরীফের চাকরিতে ফেরার পথ খুলেছে। জ্যেষ্ঠতা ও বকেয়া সব সুবিধাসহ শরীফের চাকরিতে পুনর্বহালে আর কোনো বাধা নেই।”