দলীয় বিবেচনায় নিয়োগের অভিযোগে ২০০৭ সালে যাদের চূড়ান্ত নিয়োগ বাতিল করা হয়েছিল, দীর্ঘ আইনি লড়াই ও নানা প্রতিকূলতা কাটিয়ে প্রায় দুই দশক পর পুলিশের চাকরিতে যোগদানের সুযোগ পেলেন তাঁরা। আজ বৃহস্পতিবার রাজশাহীর সারদায় বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমির প্যারেড গ্রাউন্ডে ২৭তম শিক্ষানবিশ সার্জেন্ট ও ৪৩তম ক্যাডেট উপপরিদর্শক (এসআই) ২০০৬ ব্যাচের একাংশের প্রশিক্ষণ সমাপনী কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠিত হয়েছে।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি কুচকাওয়াজে অভিবাদন গ্রহণ করেন এবং প্রশিক্ষণ চলাকালীন বিভিন্ন বিষয়ে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনকারী সদস্যদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ করেন। অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আলী হোসেন ফকির এবং পুলিশ একাডেমির প্রিন্সিপাল মাইনুল হাসান।

এই কুচকাওয়াজে মোট ২৪৬ জন প্রশিক্ষণার্থী অংশ নেন, যার মধ্যে ২৭তম শিক্ষানবিশ সার্জেন্ট ব্যাচের ৮৪ জন এবং ৪৩তম ক্যাডেট এসআই-২০০৬ ব্যাচের ১৬২ জন সদস্য ছিলেন। ছয় মাসের মৌলিক প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করে শিক্ষানবিশ সার্জেন্টরা এখন নিজ নিজ ইউনিটে যোগ দেবেন। অন্যদিকে, ক্যাডেট এসআইরা শিক্ষানবিশ এসআই (নিরস্ত্র) হিসেবে বিভিন্ন ইউনিটে পদায়িত হবেন।

প্রশিক্ষণার্থীদের উদ্দেশ্যে দেওয়া বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, দীর্ঘ প্রায় দুই দশকের প্রতীক্ষা, আইনি প্রক্রিয়া ও নানা প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে এই ব্যাচের সদস্যরা দেশের সেবায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। এই দীর্ঘ লড়াইয়ের পর চাকরিতে ফেরার জন্য তিনি তাঁদের বিশেষভাবে অভিনন্দন জানান।

বৈষম্যমুক্ত সমাজ গড়ার আহ্বান জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘যে বৈষম্য আর অন্যায়ের শিকার আপনারা হয়েছেন, সেই বৈষম্য আর অন্যায়কে যেন আপনারা কখনোই ব্যক্তিজীবনে প্রশ্রয় না দেন এবং পেশাজীবনে চর্চা না করেন, সে প্রত্যাশা আমাদের সবার।’ তিনি আরও মনে করিয়ে দেন যে, পুলিশের পোশাক ও কাঁধের পদ কেবল চাকরির পরিচয় নয়, বরং এটি জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ন্যায়বিচারের পথ সুগম করা এবং রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার এক পবিত্র অঙ্গীকার। প্রতিটি সিদ্ধান্ত যেন দায়িত্বশীল ও আইনসম্মত হয় এবং আচরণে মানবিকতার পরিচয় থাকে, সে বিষয়ে তিনি প্রশিক্ষণার্থীদের সতর্ক করেন।

পুলিশ সদস্যদের প্রতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর আহ্বান থাকে যেন তাঁরা ভয়ভীতি ও পক্ষপাতিত্ব উপেক্ষা করে সব শ্রেণি-পেশার মানুষের পাশে দাঁড়ান। আইনি সেবা ও সুরক্ষা প্রদানের মাধ্যমে জনগণের আস্থা অর্জন করে নিজেদের প্রকৃত অর্থে ‘জনগণের পুলিশ’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার কথা বলেন তিনি।

মানবিক পুলিশ বাহিনী গড়ার গুরুত্ব তুলে ধরে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, প্রচলিত অপরাধের পাশাপাশি সাইবার অপরাধ, অনলাইন প্রতারণা, আর্থিক জালিয়াতি, মাদক, মানব পাচার ও সংঘবদ্ধ অপরাধ মোকাবিলায় পুলিশকে আধুনিক প্রযুক্তি, তথ্য বিশ্লেষণ ও বৈজ্ঞানিক তদন্তে দক্ষ হতে হবে। তিনি পুলিশ সদস্যদের নির্দেশ দেন যে, সংবিধান, প্রচলিত আইন ও বিধিবিধানের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে নিরপরাধ ব্যক্তির অধিকার সুরক্ষিত রাখা এবং তদন্ত ও আইন প্রয়োগের প্রতিটি পর্যায়ে নিরপেক্ষতা বজায় রাখা অপরিহার্য।

দেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার হলো আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে জনগণকে স্বস্তি দেওয়া ও দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা। পুলিশের দক্ষতা ও সামর্থ্য বৃদ্ধির লক্ষ্যে জনবল বৃদ্ধি, উন্নত প্রশিক্ষণ, যানবাহন, অবকাঠামো এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে তিনি জানান।

অনুষ্ঠানে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনকারীদের পুরস্কৃত করা হয়। শিক্ষানবিশ সার্জেন্টদের মধ্যে ওমর ফারুক শ্রেষ্ঠ সার্জেন্ট, মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসাইন শ্রেষ্ঠ একাডেমিক, সাইফুল ইসলাম মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমে শ্রেষ্ঠ এবং মো. আসাদুজ্জামান শ্রেষ্ঠ শুটার নির্বাচিত হন। অন্যদিকে, ক্যাডেট এসআইদের মধ্যে মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম শ্রেষ্ঠ ক্যাডেট, বোরহানুল ইসলাম শ্রেষ্ঠ একাডেমিক, দেওয়ান গোলাম রসুল মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমে শ্রেষ্ঠ এবং কামাল গনি শ্রেষ্ঠ শুটার নির্বাচিত হয়েছেন।