ঋণদাতার মনে এই নিশ্চয়তা রাখা প্রয়োজন যে, তার দেওয়া অর্থ নির্ধারিত সময়ে ফেরত আসবে। এই নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ইসলামি শরিয়াহ আইনে ‘রাহন’ বা বন্ধকি ব্যবস্থার বৈধতা দেওয়া হয়েছে।

সাধারণত বন্ধক বলতে এমন কোনো সম্পদকে বোঝানো হয়, যা ঋণের বিপরীতে জামানত হিসেবে ঋণদাতার কাছে গচ্ছিত রাখা হয়। যদি কোনো কারণে ঋণগ্রহীতা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ঋণ পরিশোধ করতে ব্যর্থ হন, তবে ওই সম্পদ বিক্রি করে বা তা থেকে ঋণের সমপরিমাণ অর্থ উসুল করে নেওয়া যায়।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে—যতদিন সম্পদটি বন্ধক হিসেবে থাকবে, ততদিন সেই সম্পদ থেকে কে সুবিধা ভোগ করবেন? ঋণদাতা, নাকি সম্পদের মূল মালিক অর্থাৎ ঋণগ্রহীতা? এই বিষয়ে বিস্তারিত বিশ্লেষণ নিচে তুলে ধরা হলো।

যিনি ঋণ দিয়েছেন এবং যার কাছে বন্ধকি সম্পত্তি গচ্ছিত আছে, তার জন্য ওই সম্পত্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিভিন্ন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে:

১. ব্যবহারের শর্ত থাকলে: ঋণ দেওয়ার সময় যদি চুক্তিতেই এই শর্ত দেওয়া হয় যে, ঋণদাতা বন্ধকি সম্পত্তিটি ব্যবহার করতে পারবেন, তবে ইসলামি আইনে এই প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ অবৈধ ও হারাম। ইসলামের একটি সর্বসম্মত ও স্বতঃসিদ্ধ মূলনীতি হলো, “যে ঋণ কোনো সুবিধা টেনে আনে, তা-ই সুদ।” (ইমাম বাইহাকি, আস-সুনান আস-সুগরা, ৪/৩৫৩, মাকতাবাতুদ দার, মদিনা, ১৯৮৯)। ঋণদাতার এই ধরনের ব্যবহার মূলত ঋণের বিনিময়ে অতিরিক্ত সুবিধা গ্রহণ, যা সরাসরি সুদের অন্তর্ভুক্ত।

২. ব্যবহারের শর্ত না থাকলে: যদি চুক্তিতে কোনো শর্ত উল্লেখ না থাকে, তবুও ঋণদাতা যদি মূল মালিকের অনুমতি ছাড়াই নিজ ইচ্ছায় বন্ধকি সম্পত্তি ব্যবহার করেন, তবে তা বৈধ হবে না। কারণ এটি অন্যের সম্পত্তিতে অবৈধ হস্তক্ষেপ হিসেবে গণ্য হয়। বন্ধকি সম্পদ ঋণদাতার কাছে একটি আমানত। মালিকের অনুমতি ছাড়া তা ব্যবহার করলে তিনি আমানত খেয়ানতের দায়ে দোষী হবেন এবং ওই সম্পদের যেকোনো ধরনের ক্ষয়ক্ষতির জন্য তিনি আইনত দায়ী থাকবেন।

৩. ব্যবহারের অনুমতি থাকলে: যদি মূল মালিক বা ঋণগ্রহীতা স্বপ্রণোদিত হয়ে ঋণদাতাকে সম্পত্তিটি ব্যবহারের অনুমতি দেন, তবে সেখানে একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে। লেনদেনটি যদি নিছক ‘কর্জ’ বা নগদ অর্থের ঋণ হয়, তবে মালিকের অনুমতি থাকলেও ঋণদাতার জন্য ওই সম্পত্তি ব্যবহার করা বৈধ হবে না। কারণ এটি পরোক্ষভাবে সুদের পথ প্রশস্ত করে। তবে লেনদেনটি যদি নগদ ঋণ না হয়ে অন্য কোনো চুক্তির বকেয়া হয় এবং সেখানে মালিক ব্যবহারের অনুমতি দেন, তবে কিছু ফিকহবিদের মতে তা ‘আরিয়াহ’ বা ব্যবহারিক ধার হিসেবে গণ্য হতে পারে।

৪. ঋণের সময় বৃদ্ধিতে শর্ত থাকলে: অনেক ক্ষেত্রে ঋণগ্রহীতা নির্ধারিত সময়ে ঋণ শোধ করতে না পেরে সময় বাড়ানোর আবেদন করেন। তখন ঋণদাতা যদি এই শর্ত দেন যে, “আমি সময় বাড়াতে পারি, তবে শর্ত হলো এই বাড়তি সময়ে আমি বন্ধকি সম্পত্তিটি ব্যবহার করব”, তবে মালিক রাজি থাকলেও এটি সম্পূর্ণ হারাম হবে। কারণ এটি জাহেলি যুগের সুদের (রিবা নাসিয়াহ) একটি আধুনিক রূপ মাত্র।

৫. রক্ষণাবেক্ষণে খরচ হলে: কিছু সম্পদ এমন হয় যার পেছনে নিয়মিত ব্যয় করতে হয়, যেমন—বন্ধক রাখা গবাদিপশু। ঋণদাতা যদি পশুর খাবার ও পরিচর্যার পেছনে নিজের পকেট থেকে খরচ করেন, তবে তিনি ওই খরচের বিনিময়ে পশু থেকে যৌক্তিক মাত্রায় সুবিধা নিতে পারবেন।

এ প্রসঙ্গে মহানবী (সা.) বলেছেন, “বন্ধক রাখা অবস্থায় খরচের বিনিময়ে পিঠের ওপর আরোহণ করা যাবে এবং খরচের বিনিময়ে পশুর দুধ পান করা যাবে। যে আরোহণ করবে ও পান করবে, খরচ তাকেই বহন করতে হবে।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৫১২)। তবে এই সুবিধা অবশ্যই খরচের পরিমাণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।

উল্লেখ্য যে, ঋণদাতা যদি অন্যায়ভাবে বন্ধকি সম্পত্তি থেকে কোনো সুবিধা ভোগ করেন, তবে ইসলামি আইন অনুযায়ী তাকে এর ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বলের মতে, “ঋণদাতা যতটুকু সুবিধা ভোগ করেছে, তার সমপরিমাণ মূল্য মূল ঋণ থেকে কেটে নেওয়া হবে। কারণ সম্পত্তির ব্যবহারের অধিকার শুধু মালিকের। ঋণদাতা যদি তা ভোগ করে, তবে তার মূল্য মালিককে বুঝিয়ে দেওয়া তার দায়িত্ব।” (ইবনে কুদামা আল-মাকদিসি, আল-মুগনি, ৪/২৯১, দারু আলামিল কুতুব, রিয়াদ, ১৯৯৭)।

অন্যদিকে, বন্ধকি সম্পত্তির মূল মালিক বা ঋণগ্রহীতা নিজে ওই সম্পত্তি ব্যবহার করতে পারবেন কি না, তা নিয়ে ইসলামি আইনজ্ঞদের মাঝে দুটি ভিন্ন মত রয়েছে:

প্রথমত, হানাফি, মালেকি ও হাম্বলি মাজহাবের মতে: ঋণগ্রহীতা বা মূল মালিকের জন্য বন্ধকি সম্পত্তি ব্যবহার করা বৈধ নয়। এর যুক্তি হলো, বন্ধক চুক্তির মূল উদ্দেশ্যই হলো ঋণ পরিশোধ না হওয়া পর্যন্ত সম্পত্তিটিকে একটি নির্দিষ্ট স্থানে আটকে রাখা। মালিক যদি সেটি ব্যবহার করতে শুরু করেন, তবে আটকে রাখার উদ্দেশ্যটি ব্যাহত হয়। তবে হানাফি ও হাম্বলি মত অনুযায়ী, ঋণদাতা যদি অনুমতি দেন, তবে মালিক তা ব্যবহার করতে পারবেন। (আল-কাসানি, বাদায়িউস সানায়ি, ৬/১৪৬, দারুল কুতুব আল-ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ১৯৮৬)। মালেকি মাজহাবের অবস্থান আরও কঠোর; তাদের মতে, মালিকের ব্যবহার তো দূরের কথা, ঋণদাতা অনুমতি দিলেও বন্ধকি চুক্তিটি বাতিল হয়ে যাবে। (আহমাদ আদ-দারদির, আশ-শারহুল কাবির, ৩/২৪১, দারু ইহইয়াইল কুতুব আল-আরাবিয়্যাহ, কায়রো)।

দ্বিতীয়ত, শাফেয়ি মাজহাবের মতে: বন্ধকি সম্পত্তি ব্যবহারে যদি সম্পত্তির মূল্যের কোনো অবমূল্যায়ন না হয় বা সম্পদের কোনো ক্ষতি না হয়, তবে মূল মালিক নিশ্চিন্তে তা ব্যবহার করতে পারবেন। যেহেতু ব্যবহারের বিষয়টি মূল চুক্তির উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করে না এবং সম্পত্তির কোনো ক্ষতি করে না, তাই সম্পত্তিটি মালিকের অধিকারেই থাকে এবং তিনি তা যৌক্তিকভাবে ব্যবহার করতে পারেন। (ইমাম শারাফ নববি, আল-মাজমু শারহুল মুহাজ্জাব, ১৩/২৩০, দারুল ফিকর, বৈরুত, ১৯৯৭)।