সিলেটের বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে হেফাজতে থাকাকালীন নির্যাতনের মাধ্যমে রায়হান আহমদ (৩৪)-এর মৃত্যুর ঘটনায় দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ঘোষণা করেছেন আদালত। এই হত্যা মামলায় বরখাস্ত হওয়া পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই) আকবর হোসেন ভূঁইয়াকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
একই মামলার রায়ে বরখাস্ত হওয়া কনস্টেবল টিটু চন্দ্র দাস এবং কনস্টেবল হারুন অর রশীদকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে। পাশাপাশি মামলার বাকি তিন আসামি—বরখাস্ত হওয়া এএসআই আশেক এলাহী, এএসআই হাসান উদ্দিন এবং সংবাদকর্মী আবদুল্লাহ আল নোমানকে সাত বছর করে কারাদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন আদালত।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) বিকেলে সিলেট মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক আব্দুল মজিদ মুন্সী এই রায় ঘোষণা করেন। আদালতের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ মুমিনুল ইসলাম মোমিন এই রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
পিপি জানান, মামলার মোট ছয়জন আসামির মধ্যে বর্তমানে কেবল এএসআই আশেক এলাহী কারাগারে রয়েছেন। বাকি পাঁচজন আসামি বর্তমানে পলাতক অবস্থায় রয়েছেন।
রায় ঘোষণার দিন দুপুরে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে একমাত্র কারাবন্দি আসামি সাবেক এএসআই আশেক এলাহীকে আদালতে হাজির করা হয়। রায় ঘোষণার আগেই আদালতে উপস্থিত হন নিহত রায়হানের মা সালমা বেগম।
আসামিরা জামিন পেয়ে আত্মগোপন করায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে রায় ঘোষণার আগে তিনি বলেন, “এই রায় শুনে আমি কী করব? আমার রায়হানকে যারা নির্যাতন করে মেরেছে, তারা তো পালিয়ে গেছে।”
তিনি আরও প্রশ্ন তোলেন, “আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে একজন আসামিরও জামিন হয়নি। কিন্তু ২০২৫ সালে এসে মামলার যুক্তিতর্ক শেষ হওয়ার পরও কীভাবে প্রথম সারির তিন আসামি জামিন পান? আর জামিন পেয়ে তারা কীভাবে পালিয়ে যান?”
সালমা বেগম আক্ষেপ করে বলেন, “আজকে তো শুধু কাগজে-কলমে রায় হবে, আসামিরা তো কোনো শাস্তি পাচ্ছে না। তারা শাস্তি না পেলে আমার বিগত ছয় বছরের অপেক্ষা আর কষ্ট সবই বিফলে যাবে।”
ঘটনার সূত্র ধরে জানা যায়, ২০২০ সালের ১০ অক্টোবর রাতে সিলেট মহানগর পুলিশের বন্দরবাজার ফাঁড়িতে তুলে নিয়ে রায়হান আহমদকে নির্মম নির্যাতন করা হয়। নির্যাতনের পর পরদিন ১১ অক্টোবর হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। এই ঘটনার পর রায়হানের স্ত্রী ‘পুলিশ হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইনে’ মামলা দায়ের করলে তদন্তে নির্যাতনের সত্যতা প্রমাণিত হয়। ঘটনার পরপরই এসআই আকবরসহ চার পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত এবং তিনজনকে প্রত্যাহার করা হয়েছিল।
পরবর্তী সময়ে পিবিআই কনস্টেবল হারুনসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করে এবং ২০২০ সালের ৯ নভেম্বর কানাইঘাট সীমান্ত এলাকা থেকে প্রধান অভিযুক্ত আকবরকে আটক করা হয়। ২০২১ সালের ৫ মে পিবিআই আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) জমা দেয়। উক্ত চার্জশিটে এসআই আকবর হোসেন ভূঁইয়া, এএসআই আশেক এলাহী, কনস্টেবল হারুনুর রশিদ, কনস্টেবল টিটু চন্দ্র দাস, এএসআই হাসান উদ্দিন ও আবদুল্লাহ আল নোমান—এই ছয়জনকে আসামি করা হয়। একই বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে মামলার বিচারকাজ শুরু হয়।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, হত্যা মামলার প্রধান আসামি সাবেক এসআই আকবর হোসেন ভূঁইয়া ২০২৫ সালের ৪ আগস্ট হাইকোর্ট থেকে জামিন পান এবং ১০ আগস্ট কারাগার থেকে মুক্তি পান। পরবর্তীতে তার জামিন স্থগিত করা হলেও তিনি নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণ না করে আত্মগোপনে চলে যান। ধারণা করা হচ্ছে, তিনি ইতোমধ্যে দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছেন।