নাগরিকের চিকিৎসাসেবা রাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খাত। কিন্তু যদি এমন হয়, একটি উপজেলার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চার মাসের বেশি সময় ধরে প্রসূতি অস্ত্রোপচার বন্ধ, দুর্ঘটনার শিকার মুমূর্ষু মানুষের জীবন রক্ষায় নির্মিত ট্রমা সেন্টার অকার্যকর, আরেকটি উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ভবন জরাজীর্ণ হওয়ায় প্রায় পরিত্যক্ত, আবার কোথাও কলেজের একটি ঘরে গাদাগাদি করে নামকাওয়াস্তে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে কিংবা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পর্যাপ্ত চিকিৎসক নেই, তবে বুঝতে হবে রাষ্ট্রের কাছে নাগরিকদের চিকিৎসাসেবা পাওয়ার অধিকার মোটেই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়।
মুক্তকণ্ঠের এক প্রতিবেদনে উঠে আসা কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার সরকারি স্বাস্থ্যসেবার এই চিত্র গভীর উদ্বেগের ও বেদনার। উপজেলার সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোয় চিকিৎসকের ৬০টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ৩০ জন। অর্থাৎ অর্ধেক পদই খালি! অনেক চিকিৎসক অন্যত্র ‘সংযুক্তিতে’ কাজ করছেন, আবার কেউ দীর্ঘদিন ধরে কর্মস্থলে অনুপস্থিত।
ফলে চিকিৎসার জন্য যাঁরা আসেন, তাঁদের প্রায়ই চলে যেতে হয় জেলা সদর বা বেসরকারি হাসপাতালে। যেমন উপজেলার এক গৃহবধূ প্রসূতি চিকিৎসক না পেয়ে পরে বেসরকারি হাসপাতালে অস্ত্রোপচার করান। তাঁর খরচও পড়েছে বেশি। প্রশ্ন হচ্ছে, এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে একজন জুনিয়র কনসালট্যান্ট বদলি হয়ে যাওয়ার পর মাসের পর মাস পদটি শূন্য থাকে কীভাবে? প্রায় চার বছর ধরে একজন অবেদনবিদ (অ্যানেসথেটিস্ট) ছাড়া একটি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স চলে কীভাবে?
আবার ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে নির্মিত শহীদনগর ট্রমা সেন্টারটি গত ২০ বছরে দু-দুবার উদ্বোধন করা হলেও এখনো কাঙ্ক্ষিত জরুরি চিকিৎসাসেবা চালু হয়নি। কারণ, সেখানে চিকিৎসক পদায়ন করা হলেও তাঁদের অনেকে অন্যত্র বদলি হয়ে যান।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা প্রতি মাসে এ বিষয়ে চিঠি লেখেন, কিন্তু কোনো লাভ হয় না। পুরো পরিস্থিতি প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং সুষ্ঠু পরিকল্পনার ও জবাবদিহির অভাবকেই সামনে নিয়ে আসে।
অবশ্য স্বাস্থ্য খাতের এই জনবলসংকট শুধু একটি উপজেলার চিত্র নয়। সম্প্রতি জাতীয় সংসদে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোয় চিকিৎসকের অনুমোদিত ৪১ হাজার ৮০৬টি পদের বিপরীতে শূন্য পদের সংখ্যা ১১ হাজার ৪৯৫। সম্প্রতি আরও কয়েকটি উপজেলার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক–সংকট নিয়ে মুক্তকণ্ঠ সংবাদ ছেপেছে। আমরা মনে করি, দাউদকান্দি উপজেলার এই চিত্র আসলে সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের চিকিৎসা খাতের জরাজীর্ণ রূপটিই উন্মোচন করেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উচিত অতি দ্রুত দাউদকান্দি উপজেলার সরকারি স্বাস্থ্যসেবার এই সমস্যাগুলো নিরসন করা। যেখানে জরাজীর্ণ ভবন আছে, সেখানে অবকাঠামোগত উন্নয়ন করতে হবে। শূন্য পদগুলোয় দ্রুত চিকিৎসক নিয়োগ দিতে হবে এবং ট্রমা সেন্টারটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করতে হবে। পাশাপাশি চিকিৎসকেরা কেন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে থাকতে চান না বা দ্রুত বদলি নিয়ে নেন—নীতিনির্ধারকদের সেই কারণগুলো চিহ্নিত করে স্থায়ী সমাধান বের করতে হবে।