দীর্ঘ পাঁচ মাসের স্থবিরতা কাটিয়ে আবারও গতি ফিরছে ভারতীয় হেলমেট আমদানিতে। চলতি বছরের এপ্রিল থেকে আগস্ট পর্যন্ত যেখানে মাত্র ৮২ হাজার হেলমেট আমদানি করা হয়েছিল, সেখানে সেপ্টেম্বর মাসেই আমদানির পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯২ হাজারে।
বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) মান যাচাই প্রক্রিয়ার জটিলতার কারণে গত এপ্রিল থেকে আগস্ট পর্যন্ত বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে হেলমেট আমদানি তলানিতে নেমে গিয়েছিল। এই পরিস্থিতির ফলে সাতটি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের প্রায় ২৫ হাজার হেলমেটের চালান বন্দরে আটকা পড়ে। পরবর্তীতে ভারতীয় মানদণ্ডে পুনরায় পরীক্ষা শুরু করার পর চালানগুলো খালাস হয় এবং আমদানির গতি ফিরতে শুরু করে।
বেনাপোল কাস্টমস হাউসের দেওয়া তথ্যানুসারে, চলতি বছরের এপ্রিল থেকে আগস্ট পর্যন্ত পাঁচ মাসে মোট ৮২ হাজার হেলমেট আমদানি হয়েছে। অথচ গত বছরের একই সময়ে এই আমদানির পরিমাণ ছিল আড়াই লাখের বেশি। তবে জটিলতা নিরসনের পর গত সেপ্টেম্বর মাসে আমদানির সংখ্যা বেড়ে ৯১ হাজার ৬৭৪টিতে পৌঁছেছে, যা গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে ছিল ৭০ হাজার ১১৭টি।
আমদানিকারকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, দেশে মোটরসাইকেল হেলমেটের বার্ষিক বাজার প্রায় এক হাজার কোটি টাকার। এই বিশাল বাজারের প্রায় ৮০ শতাংশ হেলমেট আসে ভারত থেকে এবং বাকি ২০ শতাংশ আমদানি করা হয় চীন থেকে। ফলে মান যাচাইয়ের জটিলতা দূর হওয়ায় আমদানিকারকদের পাশাপাশি যশোর ও বেনাপোলের হেলমেট ব্যবসায়ীরাও স্বস্তি ফিরে পেয়েছেন।
কেন আমদানি কমেছিল
বিএসটিআই হঠাৎ করে ইউরোপীয় মানদণ্ডে হেলমেট পরীক্ষার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় গত এপ্রিল থেকে আগস্ট পর্যন্ত পাঁচ মাস ভারত ও চীন থেকে আমদানি মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়।
বিএসটিআই যশোরের সহকারী পরিচালক আবদুল মতিন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “আমদানি করা হেলমেটের মান যাচাইয়ের বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন করা হয়। আগে ভারতীয় মানদণ্ডের বৈশিস্ট্য অনুযায়ী মান যাচাই করা হতো। এরপর ঢাকা কার্যালয়ের থেকে ইউরোপীয় মানদণ্ডের বৈশিষ্ট্য অনুসরণ করে মান যাচাইয়ের নির্দেশ দেওয়া হয়। এতে ভারত থেকে আমদানি করা হেলমেট মান যাচাই পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ হচ্ছিল।”
মান যাচাইয়ের এই পদ্ধতি পরিবর্তনের ফলে জটিলতার সৃষ্টি হয় এবং বেনাপোল বন্দরের গুদামে সাতটি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের প্রায় ২৫ হাজার হেলমেট আটকা পড়ে। এই অনিশ্চয়তার কারণে আমদানিকারকেরা হেলমেট আমদানি প্রায় বন্ধ করে দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে আমদানিকারকদের জোরালো দাবির মুখে বিএসটিআইয়ের বিশেষ আদেশে পুনরায় ভারতীয় মানদণ্ডে পরীক্ষা শুরু হলে আটকে থাকা চালানগুলো খালাস পায়। এর ফলেই সেপ্টেম্বরে আমদানি স্বাভাবিক হতে শুরু করে।
আমদানির বর্তমান চিত্র
বেনাপোল কাস্টমস হাউসের আমদানির তথ্যে দেখা যায়, চলতি বছরের এপ্রিল থেকে আগস্ট পর্যন্ত পাঁচ মাসে বেনাপোল দিয়ে মাত্র ৮২ হাজার হেলমেট আমদানি হয়েছিল, যেখানে আগের বছর একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল আড়াই লাখের বেশি।
বাংলাদেশ হেলমেট অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ ইম্পোর্ট অ্যাসোসিয়েশনের হিসাব অনুযায়ী, দেশে প্রতিবছর ৫ থেকে ৬ লাখ মোটরসাইকেল বিক্রি হয়। ফলে বার্ষিক ৬ থেকে ৭ লাখ হেলমেটের চাহিদা থাকে। গত বছর ভারত ও চীন থেকে মোট ৭ লাখ হেলমেট আমদানি করা হয়েছিল, যার মধ্যে ৫ লাখ ভারতীয় এবং ২ লাখ চীনা হেলমেট ছিল। গড় মূল্য ১ হাজার ২০০ টাকা হিসেবে এর বাজারমূল্য প্রায় সাড়ে ৮০০ কোটি টাকা। বাকি বাজারটি হেলমেটের যন্ত্রাংশের দখলে।
সংগঠনটির আহ্বায়ক খন্দকার শামীম আহমেদ বলেন, “বিএসটিআইয়ের জটিলতায় আমদানি থমকে গেলেও সেপ্টেম্বর থেকে তা আবার বাড়ছে।” তবে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে জানান, “দেশে বিএসটিআইয়ের অনুমোদন ছাড়া মানহীন অনেক হেলমেট তৈরি ও বিক্রি হচ্ছে, যা বাইকারদের মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। এসব অবৈধ উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ অবিলম্বে বন্ধ করা প্রয়োজন।”
যশোরে হেলমেটের পাইকারি বাজার
ভারতীয় মোটরসাইকেলের যন্ত্রাংশ ও হেলমেটের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার হিসেবে যশোর সারা দেশে পরিচিত। বিশেষ করে যশোর শহরের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (আরএন) সড়ক মোটরসাইকেল যন্ত্রাংশের জন্য অত্যন্ত বিখ্যাত। এই সড়কে শুধু হেলমেটেরই ২০টির মতো বিশেষায়িত দোকান রয়েছে।
আমদানিকারক সমিতির যশোর প্রতিনিধি সুজন দত্ত লালটু জানান, দেশে মোট আমদানিকৃত ভারতীয় হেলমেটের প্রায় ৬০ শতাংশ যশোরের ব্যবসায়ীরা আমদানি করেন এবং তা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সরবরাহ করা হয়।
আরএন সড়কের ‘কপোতাক্ষ অটো’র স্বত্বাধিকারী জহির হোসেন জানান, তাঁদের দোকানে বিক্রি হওয়া হেলমেটের ৭৫ শতাংশই ভারতীয় এবং ২৫ শতাংশ চীনা। ঝিনাইদহ, নড়াইল, মাগুরা, কুষ্টিয়া, খুলনা ও সাতক্ষীরাসহ আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকে বাইকাররা এখানে হেলমেট কিনতে আসেন। বর্তমানে বাজারে ভারতীয় হেলমেট ১ হাজার ৪৫০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায় এবং চীনা হেলমেট ৮০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।