২০২৬ সালে বিশ্ব বক্স অফিসে একের পর এক চমকপ্রদ রেকর্ড গড়েছে হলিউডের বেশ কিছু চলচ্চিত্র। সুপারহিরো, অ্যানিমেশন, ভিডিও গেমের জনপ্রিয় চরিত্র কিংবা সংগীত জগতের কিংবদন্তি—ভিন্ন ভিন্ন বিষয়বস্তুর ওপর ভিত্তি করে নির্মিত পাঁচটি সিনেমা বিশ্বজুড়ে ১০০ কোটি ডলারের বেশি আয় করতে সক্ষম হয়েছে। এই তালিকায় সবার শীর্ষে অবস্থান করছে ‘স্পাইডার-ম্যান: ব্র্যান্ড নিউ ডে’। এছাড়া বিলিয়ন ডলার ক্লাবে জায়গা করে নিয়েছে ‘দ্য ওডিসি’, ‘টয় স্টোরি ৫’, ‘মাইকেল’ এবং ‘দ্য সুপার মারিও গ্যালাক্সি মুভি’। বক্স অফিসের এই অভাবনীয় সাফল্যের পেছনে কাজ করেছে একাধিক বিশেষ কারণ।

১. ‘স্পাইডার-ম্যান: ব্র্যান্ড নিউ ডে’
তালিকার শীর্ষে থাকা ‘স্পাইডার-ম্যান: ব্র্যান্ড নিউ ডে’ সুপারহিরো ঘরানার চিরকালীন জনপ্রিয়তার পাশাপাশি পরিচিত চরিত্রের এক নতুন গল্পের মাধ্যমে দর্শকদের প্রবল আগ্রহকে কাজে লাগিয়েছে। টম হল্যান্ড অভিনীত স্পাইডার-ম্যানের এই নতুন অধ্যায়ে দেখা যায় পিটার পার্কারকে একাকী জীবনযাপন করতে। নিজের পরিচয় এবং স্মৃতি থেকে প্রিয়জনদের মুছে যাওয়ার চরম কষ্টের মাঝেও সে নিউইয়র্কের মানুষকে রক্ষা করে চলেছে। এরই মাঝে তার শরীরে দেখা দেয় কিছু অস্বাভাবিক পরিবর্তন, যা নতুন কোনো বিপদের ইঙ্গিত দেয়। বিশ্বজুড়ে সিনেমাটির মোট আয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৫১ কোটি ৬০ লাখ ডলার। চরিত্রটির আবেগপ্রবণ দিক, টানটান অ্যাকশন এবং গল্পের রহস্যময়তা দর্শককে গভীরভাবে আকৃষ্ট করেছে। স্পাইডার-ম্যানের মতো জনপ্রিয় চরিত্রের প্রতি বিভিন্ন প্রজন্মের দর্শকদের যে সহজাত টান রয়েছে, তা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

২. ‘দ্য ওডিসি’
পরিচালক ক্রিস্টোফার নোলানের এই সিনেমাটি মুক্তির আগেই বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। সেই আলোচনারই প্রতিফলন দেখা গেছে বক্স অফিসের পরিসংখ্যানে। সিনেমাটি বিশ্বজুড়ে প্রায় ১৭৮ কোটি ৯০ লাখ ডলার আয় করেছে। গ্রিক মহাকাব্য ‘ওডিসি’র ওপর ভিত্তি করে নির্মিত এই ছবির গল্প আবর্তিত হয়েছে ট্রয় যুদ্ধের পর নিজ রাজ্যে ফেরার পথে ওডিসিউসের বিপজ্জনক ও রোমাঞ্চকর যাত্রা নিয়ে। ছবির প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন ম্যাট ডেমন। এছাড়া গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে রয়েছেন টম হল্যান্ড, অ্যান হ্যাথাওয়ে, জেনডায়া, রবার্ট প্যাটিনসন ও চার্লিজ থেরন।

এই ছবির সাফল্যের অন্যতম প্রধান কারণ হলো নির্মাতা হিসেবে ক্রিস্টোফার নোলানের একটি বিশাল ও অনুগত দর্শকগোষ্ঠী। ‘ইনসেপশন’, ‘ইন্টারস্টেলার’ ও ‘ওপেনহাইমার’-এর মতো মাস্টারপিস সিনেমার পর তাঁর নতুন কাজ নিয়ে দর্শকদের মধ্যে আগে থেকেই প্রবল আগ্রহ ছিল। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মহাকাব্যিক কাহিনি, বিশাল নির্মাণ পরিকল্পনা এবং অত্যাধুনিক আইম্যাক্স প্রযুক্তির ব্যবহার। উল্লেখ্য, এটি সম্পূর্ণ আইম্যাক্স ফিল্ম ক্যামেরায় ধারণ করা প্রথম সিনেমা। মুক্তির প্রথম সপ্তাহান্তেই কেবল আইম্যাক্স থেকেই আয় হয় প্রায় ৫ কোটি ২০ লাখ ডলার। দর্শকদের ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া ছবিটির ব্যবসায়িক ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে সাহায্য করেছে। পাশাপাশি সিনেমার শুটিং থেকে শুরু করে বড় পরিসরে প্রচারণা এবং আলোচিত তারকাদের উপস্থিতি সাফল্যের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে।

৩. ‘টয় স্টোরি–৫’
বিশ্বজুড়ে প্রায় ১১৪ কোটি ৯০ লাখ ডলার আয় করে তালিকার তৃতীয় স্থানে রয়েছে ‘টয় স্টোরি–৫’। পিক্সারের অত্যন্ত জনপ্রিয় অ্যানিমেশন ফ্র্যাঞ্চাইজি ‘টয় স্টোরি’র পঞ্চম কিস্তি নিয়ে দর্শকদের আগ্রহ ছিল আগে থেকেই। ১৯৯৫ সালে শুরু হওয়া এই সিরিজের সঙ্গে বেড়ে উঠেছে একাধিক প্রজন্ম। ফলে উডি এবং বাজ লাইটইয়ারসহ পরিচিত চরিত্রগুলোকে নতুন গল্পে দেখার সুযোগটি পুরোনো দর্শকদের জন্য ছিল নস্টালজিয়ার আর তরুণদের জন্য ছিল এক নতুন অভিযানের সুযোগ।

এবারের গল্পের মূল উপজীব্য হলো খেলনার জগতের সঙ্গে আধুনিক প্রযুক্তির প্রতিযোগিতা। শিশুদের জীবনে ডিজিটাল প্রযুক্তির প্রভাব নিয়ে তৈরি এই কাহিনী অভিভাবকদেরও গভীরভাবে ভাবিয়েছে। পুরোনো দর্শকদের আবেগ এবং নতুন প্রজন্মের কৌতূহলকে এক সুতোয় বাঁধতে পেরেছে এই ছবিটি। মুক্তির প্রথম সপ্তাহান্তেই বিশ্বজুড়ে প্রায় ৩১ কোটি ২০ লাখ ডলার আয় করে সিনেমাটি, যা এই ফ্র্যাঞ্চাইজির ইতিহাসে অন্যতম বড় সূচনা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। শুরুর এই বিশাল আয় সিনেমাটিকে সাফল্যের এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।

৪. ‘মাইকেল’
সংগীত জগতের কিংবদন্তি মাইকেল জ্যাকসনের জীবন অবলম্বনে নির্মিত বায়োপিক ‘মাইকেল’। এই সিনেমাটি প্রমাণ করেছে যে, একজন জনপ্রিয় শিল্পীর জীবন এবং তাঁর সংগীতের প্রতি দর্শকদের আগ্রহ কতটা প্রবল হতে পারে। জ্যাকসনের চরিত্রে অভিনয় করেছেন তাঁর ভাতিজা জাফর জ্যাকসন, যা ভক্তদের বিশেষভাবে নজর কেড়েছে। এর পাশাপাশি পরিচিত গানের পরিবেশনা, সিগনেচার নাচ এবং শিল্পীর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সব অধ্যায় পর্দায় দেখার সুযোগ পেয়েছেন ভক্তরা।

সিনেমাটির সাফল্যের মূল কারণ মাইকেল জ্যাকসনের বিশ্বব্যাপী অপ্রতিদ্বন্দ্বী জনপ্রিয়তা। আজও তাঁর গান এবং জীবনের নানা ঘটনার আবেদন কমেনি। তাঁর সংগীত শুধু একটি নির্দিষ্ট প্রজন্মের নয়, বরং সব বয়সের মানুষের কাছেই সমানভাবে পরিচিত। সিনেমাটি মুক্তির প্রথম সপ্তাহান্তে বিশ্বজুড়ে প্রায় ২১ কোটি ৭০ লাখ ডলার আয় করে, যা সংগীতভিত্তিক বায়োপিকের ক্ষেত্রে এক বিশাল সূচনা। যদিও সমালোচকদের প্রতিক্রিয়া মিশ্র ছিল, তবে দর্শকদের প্রবল আগ্রহ, পরিচিত গানের জাদু এবং বারবার সিনেমা দেখার প্রবণতা এর ব্যবসায়িক সাফল্যে বড় ভূমিকা রেখেছে। এ বছর আয়ের দিক থেকে চতুর্থ স্থানে থাকা এই সিনেমাটি বক্স অফিস থেকে সংগ্রহ করেছে প্রায় ১০২ কোটি ৯০ লাখ ডলার।

৫. ‘দ্য সুপার মারিও গ্যালাক্সি মুভি’
তালিকার পঞ্চম স্থানে বিলিয়ন ডলার আয় করে আলোচনায় রয়েছে ‘দ্য সুপার মারিও গ্যালাক্সি মুভি’। বিশ্বজুড়ে এই সিনেমাটির আয় প্রায় ১০১ কোটি ৩০ লাখ ডলার। জনপ্রিয় ভিডিও গেমের আইকনিক চরিত্র মারিওকে নিয়ে নির্মিত এই অ্যানিমেশন সিনেমাটি মূলত ২০২৩ সালের ‘দ্য সুপার মারিও ব্রাদার্স মুভি’র সাফল্যেরই ধারাবাহিকতা। নিনটেনডো, ইউনিভার্সাল পিকচার্স ও ইলুমিনেশন যৌথভাবে এই সিনেমাটি নির্মাণ করেছে। পরিচিত গেমের জগৎ, রঙিন অ্যানিমেশন, হাস্যরস এবং দুঃসাহসিক অভিযান—সব মিলিয়ে এটি শিশুদের পাশাপাশি বড়দেরও সমানভাবে আকৃষ্ট করেছে।

ভিডিও গেমটির সঙ্গে বহু বছরের পুরনো পরিচয় দর্শকদের জন্য বড় আকর্ষণ হিসেবে কাজ করেছে। পাশাপাশি আগের সিনেমার সাফল্য নতুন ছবিটির প্রতি আগ্রহ বাড়িয়ে দিয়েছিল। মুক্তির প্রথম সপ্তাহান্তেই বিশ্বজুড়ে প্রায় ৩৭ কোটি ৩০ লাখ ডলার আয় করে ছবিটি। পরবর্তীতে দশম সপ্তাহে পৌঁছে এটি ১০০ কোটি ডলারের মাইলফলক অতিক্রম করে।