২০২৩ সালে গাজায় যুদ্ধ শুরুর অনেক আগেই ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী ‘দাহিয়াহ ডকট্রিন’ নামে একটি আক্রমণাত্মক কৌশল তৈরি করেছিল। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল শত্রুর ঘাঁটিতে এত তীব্র ও ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালানো, যাতে প্রতিপক্ষ কখনোই আর ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ানোর সাহস না পায়।

২০০৬ সালে লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে যুদ্ধে এ নীতি বাস্তবায়ন করা হয়েছিল। এ কৌশলের নাম ও ধারণার প্রবক্তা ছিলেন গাদি আইজেনকোট, যিনি তখন সামরিক বাহিনীর অপারেশন্স ডিরেক্টরেটের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।

এ ঘটনা আমার মনে পড়ে যাওয়ার কারণ হলো, ইসরায়েলে সম্প্রতি কাঙ্ক্ষিত সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং প্রাথমিক ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, আইজেনকোট হয়তো দেশটির পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন।

ইসরায়েলি টেলিভিশন চ্যানেল ১২-এর এক্সিট পোল অনুযায়ী, আইজেনকোটের মধ্যপন্থী ‘পরিবর্তন জোট’ ১২০ আসনবিশিষ্ট পার্লামেন্টে ৫২টি আসনে জয় পেতে পারে। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ডানপন্থী জোট ৫০টি আসন এবং আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলো ১৮টি আসন পেতে পারে।

তবে এসবই প্রাথমিক ফলাফল; সব ব্যালট গণনা শেষ হতে দিন কয়েকের মতো লাগবে এবং কোনো শাসক জোট গঠন হতে সপ্তাহ বা তারও বেশি সময় লেগে যেতে পারে। ফলে আইজেনকোটের ক্ষমতায় যাওয়ার পথ মোটেও নিশ্চিত নয়।

যদি বর্তমান ধারা বজায় থাকে এবং নেতানিয়াহু ক্ষমতাচ্যুত হন, তবে তা ওয়াশিংটনের এমন অনেককেই আনন্দিত করবে, যাঁরা ইসরায়েলের নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখতে চান। কিন্তু একটি বিষয় তাঁদের মনে রাখা উচিত, গাজা উপত্যকা, পশ্চিম তীর ও দ্বিরাষ্ট্র সমাধান—এসব ক্ষেত্রে আইজেনকোটের ‘পরিবর্তন জোট’ বর্তমান ক্ষমতাসীন জোটের থেকে খুব একটা আলাদা নয়।

অধিকাংশ ইস্যুতে নেতানিয়াহু যেমন ইসরায়েলের মূলধারার রাজনীতির ভেতরে অবস্থান করছেন, তাঁর রাজনৈতিক বিরোধীরাও ঠিক একই অবস্থানে রয়েছেন।

ওয়াশিংটনের বহু মানুষই তথাকথিত ‘বিবি ডিরেঞ্জমেন্ট সিন্ড্রোম’-এ আক্রান্ত। কোনটি বাস্তবে প্রধানমন্ত্রীর নিজস্ব অপরাধ আর ইসরায়েলি রাজনীতির নগ্ন বাস্তবতা—এই দুটির মধ্যে পার্থক্য করা তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। এই মানসিকতা প্রকাশ করে যে নেতানিয়াহুর অন্ধ সমর্থক ও চরম সমালোচক—উভয় পক্ষই—ইসরায়েলকে একটি স্বাভাবিক রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে ব্যর্থ, যার নেতারা অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা ও স্বার্থের মুখোমুখি হন।

প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা এবং নেতানিয়াহু তো একে অপরকে চোখের বিষ মনে করতেন। জ্যারেড কুশনার তাঁর বইয়ে লিখেছেন, তাঁর শ্বশুর (ডোনাল্ড ট্রাম্প) সব সময়ই মনে করতেন, নেতানিয়াহু যেকোনো সময় পেছনে ছুরি মারতে পারেন।

আর প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন, যিনি নিজেকে অন্য সবার চেয়ে ইসরায়েল বিশেষজ্ঞ মনে করতেন, তিনিও ইসরায়েলি এই নেতার সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে নাভিশ্বাস তুলেছিলেন। এমনকি মার্কিন সমালোচকেরা নেতানিয়াহু সম্পর্কে যা বলেন, তাঁর ইসরায়েলি বিরোধীদের সমালোচনার তুলনায় তা অতি মৃদু। তবু ব্যক্তিগত স্বভাব যা–ই হোক না কেন, প্রধানমন্ত্রী স্পষ্টতই ইসরায়েলি ভোটারদের এমন এক বিশাল অংশের প্রতিনিধিত্ব করেন যা নীতিনির্ধারক বিশ্বের অনেকেই স্বীকার করতে চান না।

গত ২৬ সেপ্টেম্বর আইজেনকোট এবং পরিবর্তন জোটের অন্য নেতারা একটি নথিতে সরকার গঠন করতে পারলে তাঁদের অগ্রাধিকারের বিষয়গুলো প্রকাশ করেন। সেখানে তাঁরা এমন একটি ‘সংস্কার বা পুনর্গঠনমূলক সরকার’ গঠনের কথা ঘোষণা করেন, যা ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামাসের হামলার চারপাশের ব্যর্থতা তদন্তে একটি রাষ্ট্রীয় কমিশন গঠনকে অগ্রাধিকার দেবে।

কিন্তু সেই নথিতে গাজা উপত্যকা সম্পর্কে কিছুই লেখা ছিল না; বিতর্কিত ‘ই-ওয়ান সেটেলমেন্ট’ নিয়েও কোনো শব্দ ছিল না, যার নির্মাণকাজ বর্তমান সরকার অনুমোদন পাওয়ার বহু দশক পর শুরু করেছে এবং যা চালু হলে পশ্চিম তীরের উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের মধ্যে ফিলিস্তিনিদের যাতায়াত আরও কঠিন হয়ে পড়বে। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সংকট সমাধানে সেখানে দ্বিরাষ্ট্র সমাধান বিষয়ে কোনো উল্লেখই ছিল না।

কেউ হয়তো ধরে নিতে পারেন যে বিষয়গুলো কৌশলগতভাবেই বাদ দেওয়া হয়েছিল, যাতে সর্বোচ্চসংখ্যক ইসরায়েলি ভোটারের সমর্থন পাওয়া যায় এবং নতুন সরকার গঠিত হলে হয়তো কিছুটা নীতিগত নমনীয়তা দেখা যাবে। কিন্তু ইসরায়েলে প্রায় দুই সপ্তাহ কাটিয়ে, বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, বিশ্লেষক ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলার পর, আমি নিশ্চিত নই যে বাস্তবে তেমন কিছু ঘটবে।

এক সন্ধ্যায় ইসরায়েলের একটি সাধারণ বাড়ির বসার ঘরে আমিসহ প্রায় ৩০ জন ইসরায়েলি একত্র হয়েছিলাম ‘বেয়াহাদ’-এর দুজন প্রার্থীর বক্তব্য শুনতে। বেয়াহাদ হলো বেনেটের ‘বেনেট ২০২৬’ পার্টি এবং লাপিডের নেতৃত্বাধীন ‘ইয়েশ আতিদ’ দলের যৌথ তালিকা। উভয় প্রার্থীই যুক্তি দেন যে নেতানিয়াহুর ব্যক্তিগত ও সংকীর্ণ স্বার্থে প্রায় দুই দশক ধরে চলা সরকারের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ইসরায়েলে রাজনৈতিক ও সামাজিক সংস্কারের জরুরি প্রয়োজন।

তাঁরা পররাষ্ট্রনীতির বিষয়েও সমান কড়া সমালোচনা করে বলেন, নেতানিয়াহুর আমলে বিশ্বদরবারে ইসরায়েলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে এবং জাতিসংঘ বা গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক রাজধানীতে দেশের পক্ষে কার্যকরভাবে যুক্তি তুলে ধরতে তারা ব্যর্থ হয়েছেন।

কিন্তু ঠিক এ সময়েই আলোচনার মোড় এমন এক দিকে ঘোরে, যা ওয়াশিংটনের অনেকেই আশা করবেন না: উভয় প্রার্থী গাজা, লেবানন ও ইরান ইস্যুতে সরকারের চরম ব্যর্থতার অভিযোগ তোলেন—তাঁদের দাবি ছিল, এসব ফ্রন্টে এত সামরিক শক্তি প্রয়োগের পরও তিনটি ক্ষেত্রই ইসরায়েলের জন্য এখনো তীব্র হুমকি হয়ে আছে। এটি ইরান বা তার প্রক্সিগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক সমাধানের কোনো আহ্বান ছিল না, বরং আরও কার্যকর ও কঠোর সামরিক কৌশলের দাবি ছিল।

অধিকাংশ ইস্যুতে নেতানিয়াহু যেমন ইসরায়েলের মূলধারার রাজনীতির ভেতরে অবস্থান করছেন, তাঁর রাজনৈতিক বিরোধীরাও ঠিক একই অবস্থানে রয়েছেন।

তা ছাড়া তাঁরা একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের কঠোর বিরোধিতা ব্যক্ত করেন। তাঁরা সাফ জানান যে ৭ অক্টোবরের ঘটনার পর ফিলিস্তিনিরা নতুন কোনো ইসরায়েলি সরকারের কাছ থেকে ‘এরিয়া এ’ (পশ্চিম তীরের এলাকা)-এর স্বায়ত্তশাসন ছাড়া আর কিছুই আশা করতে পারে না। এট ওসলো চুক্তির সময়ের একটি ব্যবস্থার অবশিষ্টাংশ মাত্র। এর মাধ্যমে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ শুধু নিজস্ব জনগণের অভ্যন্তরীণ বিষয়াবলি পরিচালনা করে।

যখন শ্রোতাদের মধ্য থেকে একজন সদস্য পশ্চিম তীরের পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলতে গিয়ে ‘ওয়েস্ট ব্যাংক’ শব্দটি ব্যবহার করেন, বেনেটের প্রতিনিধি তখন তাৎক্ষণিকভাবে ‘জিহুদিয়া ও সামারিয়া’ শব্দগুচ্ছ জোর দিয়ে উচ্চারণ করেন। এটি বসতি স্থাপনকারীদের প্রিয় পরিভাষা এবং এটাই এখন অধিকাংশ ইসরায়েলির কাছে স্বাভাবিক পরিভাষায় পরিণত হয়েছে। উভয় প্রার্থীই ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠনের বিরুদ্ধে তাঁদের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন। জনমত জরিপ অনুযায়ী, বেশির ভাগ ইসরায়েলিও এ অবস্থানের সঙ্গেই একমত।

‘বেয়াহাদ’-এর অনুষ্ঠানে অন্তত একজন অংশগ্রহণকারীর গোলানকে নিয়ে এই উদ্বেগ প্রমাণ করে যে ইসরায়েলিরা ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের কতটা তীব্র বিরোধী। গোলানের অবস্থান কিন্তু মোটেও নরমপন্থী বা ‘ঘুঘু’ গোছের নয়। তিনি ইহুদি বসতি সম্প্রসারণের বিরোধিতা করেন, কারণ তাঁর ভয় এটি শেষ পর্যন্ত ভূখণ্ড আত্মসাৎ এবং একটি দ্বি-রাষ্ট্রের দিকে নিয়ে যাবে।

তার বদলে গোলান বিশ্বাস করেন, দীর্ঘ মেয়াদে দ্বিরাষ্ট্র সমাধানই ইসরায়েলের নিরাপত্তার জন্য সেরা। তবে ৭ অক্টোবরের ঘটনার কারণে তিনি আপাতত ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে ‘বেসামরিক বিচ্ছিন্নতা’ এবং পশ্চিম তীরে অনির্দিষ্টকালের জন্য সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখার পক্ষে।

এর মানে এই নয় যে আইজেনকোটের ‘পরিবর্তন জোট’ সরকার গঠন করলে কিছুই বদলাবে না। নতুন সরকার পশ্চিম তীরে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় কাজ করবে, যেখানে ফিলিস্তিনিদের ওপর চরমপন্থী ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা সম্প্রতি ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে। এটি সামাল দেওয়া সবচেয়ে সহজ হলেও কাজটি মোটেও সোজা নয়।

এই দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে কঠোর রাজনৈতিক প্রতিরোধ আসবে, বিশেষ করে কারণ বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতার বিষয়টি গণমাধ্যম, বিশ্লেষক ও মার্কিন কংগ্রেসের সদস্যরা যেভাবে চিত্রিত করেন, তার চেয়েও অনেক বেশি জটিল।

উগ্র ডানপন্থী নেতা বেন-গভির হয়তো ক্ষমতার বাইরে চলে যাবেন, কিন্তু তাঁর প্রভাব হারিয়ে যাবে না। কারণ, ইসরায়েলের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যে তাঁর একটি বিশাল অনুগত সমর্থক গোষ্ঠী রয়েছে। তিনি ইসরায়েলি ডানপন্থীদের সেই ধারার প্রতিনিধি, যারা পশ্চিমাদের নিষেধাজ্ঞা বা আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি নিয়ে বিন্দুমাত্র পরোয়া করে না।

সুতরাং খুব শিগগির হয়তো ইসরায়েল একজন নতুন প্রধানমন্ত্রী পেতে যাচ্ছে। তবে প্রধানমন্ত্রী আইজেনকোট বা বেনেটের অধীন ইসরায়েলের কথাবার্তা হয়তো নেতানিয়াহুর মতো অতটা আক্রমণাত্মক হবে না, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে দূরত্ব তৈরি করা মূল নীতিগত ইস্যুগুলো সবই অপরিবর্তিত থেকে যাবে।

স্টিভেন এ কুক ফরেন পলিসির কলামিস্ট। ফরেন পলিসি থেকে সংক্ষেপে অনূদিত।