কোরআন পাঠের সওয়াব থাকলেও এর মর্মার্থ না জানলে পাঠের মূল উদ্দেশ্যটি ব্যাহত হয়। অর্থ না বুঝে কোরআন পড়া অনেকটা কোনো যন্ত্র পরিচালনার নির্দেশিকা না বুঝে পড়ার মতোই। তবে বর্তমানের কর্মব্যস্ত জীবনে অনেকের পক্ষেই মাদ্রাসায় গিয়ে বা দীর্ঘ সময় ব্যয় করে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কোরআনের অর্থ ও তাফসির শেখা সম্ভব হয় না। ফলে অনেকের মনেই এই প্রশ্ন জাগে যে, একা একা কি কোরআনের অর্থ শেখা সম্ভব কি না।
এর উত্তর হলো—হ্যাঁ, সঠিক পদ্ধতি ও একাগ্রতা থাকলে ঘরে বসেই কোরআনের মর্মার্থ আয়ত্ত করা সম্ভব। তবে এই প্রক্রিয়ায় কিছু সতর্কতা অবলম্বন এবং সুনির্দিষ্ট ধাপ অনুসরণ করা অত্যন্ত অপরিহার্য।
যেকোনো ইবাদতের মতো কোরআন শেখার প্রথম ও প্রধান শর্ত হলো বিশুদ্ধ নিয়ত। কেবল জ্ঞান জাহির করা বা তর্কে জয়লাভ করার জন্য নয়, বরং নিজের জীবনকে পরিবর্তন করার দৃঢ় সংকল্প নিয়ে কোরআন অধ্যয়ন শুরু করতে হবে। কোরআন নিজেই তার পাঠকের জন্য সহজ হওয়ার কথা ঘোষণা করেছে, ‘আর আমি তো কোরআনকে উপদেশ গ্রহণের জন্য সহজ করে দিয়েছি; অতএব কোনো উপদেশ গ্রহণকারী আছে কি?’ (সুরা কমার, আয়াত: ১৭)। তাই অধ্যয়ন শুরুর আগে মহান আল্লাহর কাছে কোরআনের জ্ঞান উন্মুক্ত করে দেওয়ার জন্য আন্তরিকভাবে দোয়া করা উচিত।
কোরআনের অর্থ সঠিকভাবে অনুধাবনের জন্য ‘শানে নুজুল’ বা আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার প্রেক্ষাপট জানা অত্যন্ত জরুরি; অন্যথায় অনেক আয়াতের খণ্ডিত অর্থ বুঝে বিভ্রান্ত হওয়ার প্রবল আশঙ্কা থাকে। একা একা কোরআন পড়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ভুল অনুবাদের ফাঁদে পড়া। তাই শুরুতেই প্রামাণ্য ও সর্বজনস্বীকৃত আলেমদের করা সহজবোধ্য অনুবাদ বেছে নেওয়া প্রয়োজন। সরাসরি দীর্ঘ তাফসির বা ব্যাখ্যাগ্রন্থে না গিয়ে শুরুতে শুধু সরল অনুবাদ পড়া শ্রেয়। এরপর আয়াতের প্রেক্ষাপট বুঝতে সংক্ষিপ্ত তাফসিরের সহায়তা নেওয়া যেতে পারে।
শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভি লিখেছেন, “কোরআনের অর্থ সঠিকভাবে অনুধাবনের জন্য ‘শানে নুজুল’ বা আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার প্রেক্ষাপট জানা জরুরি; অন্যথায় অনেক আয়াতের খণ্ডিত অর্থ বুঝে বিভ্রান্ত হওয়ার প্রবল আশঙ্কা থাকে।” (দেহলভি, আল-ফাওজুল কাবির ফি উসুলিত তাফসির, পৃষ্ঠা ৪৫, দারুল বাশাইর, দামেস্ক, ১৯৯৬)।
কোরআনের অর্থ গভীরে গিয়ে বোঝার জন্য এর মূল আরবি শব্দগুলোর অর্থ জানা বেশ কার্যকর। একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো, কোরআনের হাজারো আয়াতের মধ্যে নির্দিষ্ট কিছু আরবি শব্দ বারবার ঘুরেফিরে এসেছে। তাই কোরআনের বহুল ব্যবহৃত কিছু শব্দের অর্থ মুখস্থ করে নিলে একা একা অনুবাদ বোঝা অনেক সহজ হয়ে যায়। ভাষাবিদ আল-রাগেব ইস্ফাহানি উল্লেখ করেছেন, “কোরআনের শব্দাবলির সঠিক আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থ জানাই হলো কোরআনের মর্মমূলে প্রবেশের প্রথম ও প্রধান সোপান।” (আল-ইস্ফাহানি, আল-মুফরাদাত ফি গারিবিল কুরআন, পৃষ্ঠা ১২, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ১৯৯৮)।
তবে মনে রাখতে হবে, একা একা কোরআন পড়লে তা শুধু প্রাথমিক জ্ঞান ও ব্যক্তিগত আমলের জন্যই প্রযোজ্য। কোরআনের আলোকে কোনো বিষয়ে ইসলামি সিদ্ধান্ত জানানোর অধিকার শুধু দীর্ঘ অধ্যয়নকারী বিশেষজ্ঞদেরই রয়েছে। একা অধ্যয়ন করার সময় সবচেয়ে বড় বিপদের জায়গা হলো নিজের মনমতো আয়াতের ব্যাখ্যা দাঁড় করানো। কোনো আয়াতের অর্থ বুঝতে খটকা লাগলে ব্যক্তিগত ধারণা দিয়ে তা বিচার করা যাবে না; বরং তখন কোনো নির্ভরযোগ্য আলেমের শরণাপন্ন হতে হবে।
মহানবী (সা.) এ বিষয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি জ্ঞান ছাড়াই কোরআনের ব্যাখ্যা করে, সে যেন দোজখে নিজের ঠিকানা বানিয়ে নেয়।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৯৫০)। তাই একা পড়ার অর্থ এই নয় যে সব সিদ্ধান্ত একাই নিতে হবে।
কোরআন শেখার যাত্রা এক দিনে শেষ হওয়ার বিষয় নয়, এটি একটি জীবনব্যাপী সাধনা। একসঙ্গে অনেকগুলো আয়াত পড়ার চেয়ে প্রতিদিন ৫ থেকে ১০টি আয়াত বুঝে পড়া অনেক বেশি ফলপ্রসূ। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় আমল তা-ই, যা নিয়মিত করা হয়, যদিও তা পরিমাণে অল্প হয়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৪৬৫)। ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে একটি নির্দিষ্ট সময়, যেমন ফজরের পর বা এশার পর, কোরআন অধ্যয়নের জন্য বরাদ্দ রাখা যেতে পারে।
প্রযুক্তির এই যুগে বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য অ্যাপ, প্রামাণ্য অডিও বা ভিডিও লেকচারের মাধ্যমে ঘরে বসেই কোরআনের অর্থ শেখা এখন অনেক সহজ হয়ে গেছে। তবে পুনরায় মনে রাখা প্রয়োজন, একা একা কোরআন পড়লে তা শুধু প্রাথমিক জ্ঞান ও ব্যক্তিগত আমলের জন্যই প্রযোজ্য। কোরআনের আলোকে কোনো বিষয়ে চূড়ান্ত ইসলামি সিদ্ধান্ত জানানোর অধিকার শুধু দীর্ঘ অধ্যয়নকারী বিশেষজ্ঞদেরই রয়েছে।