মায়ের মৃত্যুর পর রাজধানী ঢাকায় একটি চাকরি নেন ইয়াকুব আলী। সেই চাকরির আবেদনের জন্য জন্মসনদের প্রয়োজন হয়। তখন তাঁর বাবা আজগর আলী আপন মায়ের নামের পরিবর্তে সৎমায়ের নাম বসিয়ে জন্মসনদ তৈরি করে দেন। পরবর্তীতে সেই জন্মসনদের ভিত্তিতেই জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরি হয়। ফলে কাগজে-কলমে সৎমায়ের সন্তান হিসেবেই ইয়াকুবের জীবন অতিবাহিত হতে থাকে প্রায় দেড় বছর ধরে।

তবে মূল সমস্যাটি সামনে আসে আপন মায়ের রেখে যাওয়া সম্পদের উত্তরাধিকার নিয়ে। ইয়াকুবের আপন ভাইসহ অন্যান্য উত্তরসূরিরা মৃত মায়ের রেখে যাওয়া সম্পত্তির ভাগ পেলেও, নথিতে মায়ের নামের এই বিড়ম্বনার কারণে ইয়াকুব চরম ভোগান্তির মুখে পড়েছেন। বর্তমানে কৃষিশ্রমিক হিসেবে কাজ করা ইয়াকুব নিজেকে আপন মায়ের সন্তান প্রমাণ করতে গত চার বছর ধরে সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে দপ্তরে ঘুরছেন।

ইয়াকুবের বাড়ি দিনাজপুরের বিরামপুর উপজেলার ১ নং মুকুন্দপুর ইউনিয়নের পারভবানীপুরের বালুপাড়া গ্রামে। তিনি ওই গ্রামের আজগর আলী ও মৃত আয়েশা বেগম দম্পতির সন্তান। জন্মসনদ ও জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য অনুযায়ী, ইয়াকুবের জন্ম ১৯৯২ সালের ১ ফেব্রুয়ারি। ১৯৯৮ সালে মা আয়েশা বেগম তাঁর বড় ছেলে আইয়ুব আলী, মেজ ছেলে ইয়াকুব আলী ও ছোট ছেলে ইউসুফ আলীকে রেখে পরলোকগমন করেন।

ইয়াকুব ও তাঁর পরিবারের বর্ণনা অনুযায়ী, ১৯৯৮ সালে আয়েশা বেগমের মৃত্যুর পর আজগর আলী মোছা. রেজিনাকে বিয়ে করেন। ২০০৯ সালে ইয়াকুব যখন গার্মেন্টসে চাকরির জন্য ঢাকায় যান, তখন জন্মসনদের প্রয়োজন হয়। সেই সময়েই বাবা আজগর আলী ছেলের আপন মায়ের পরিবর্তে সৎমা মোছা. রেজিনার নাম বসিয়ে নতুন জন্মসনদ তৈরি করেন। পরবর্তীতে ২০১৫ সালে ইস্যুকৃত জাতীয় পরিচয়পত্রেও মায়ের নাম মোছা. রেজিনা হিসেবেই থেকে যায়।

ইয়াকুব জানান, ২০১৬ সালে তিনি সৎমায়ের নামের পরিবর্তে আপন মা আয়েশা বেগমের নাম দিয়ে সংশোধিত জন্মসনদ করে নেন। আপন মা আয়েশা বেগমের রেখে যাওয়া সম্পত্তির অংশ ওয়ারিশ সূত্রে মৌখিকভাবে ভোগদখল করতে পারলেও, সেই জমির খাজনা প্রদান, খারিজ এবং বিক্রির ক্ষেত্রে তিনি আইনি জটিলতায় পড়ছেন।

ইয়াকুবের দাবি, তাঁর মা আয়েশা বেগম পৈতৃকসূত্রে সাড়ে পাঁচ বিঘা জমি রেখে মারা যান। জন্মসনদ ও জাতীয় পরিচয়পত্রে সৎমায়ের নাম থাকলে স্বামী (আজগর আলী) উত্তরাধিকার সূত্রে স্ত্রী আয়েশা বেগমের রেখে যাওয়া সম্পত্তি তুলনামূলক বেশি পাবেন—এই পরিকল্পনা থেকেই সৎমা রেজিনা তাঁর সৎছেলে ইয়াকুবের নথিতে নিজের নাম দেওয়ার পরামর্শ দেন স্বামীকে। এছাড়া ২০১২ সালে ইয়াকুব আলীর ছোট ভাই ইউসুফ আলী মারা যাওয়ার পর জমির ভাগ বেশি পাওয়ার পথটি আরও সহজ হয়ে যায় বলে তিনি মনে করেন।

সম্পত্তির ভাগ পাওয়ার আশায় ইয়াকুব যখন তাঁর আপন মায়ের নাম বসানোর কথা বলেন, তখন সৎমা রেজিনা এ বিষয়ে কোনো কথা বলতে রাজি হননি। তবে সৎমা ও বাবার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বাবা আজগর আলী। তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “আমি (যখন মায়ের নাম পরিবর্তন) করিছি, তখন ওর মা আছিল না। আমি জানি না, ওটা কীভাবে ওখানে (ইউনিয়ন পরিষদ) করিছে। ছেলেটার যে মা বেঁচে আছে, ওই মায়ের (সৎমা) নাম তুলে দিয়ে ওটা (জন্মসনদ) করিছে। আমি ওটা করলে ওর আসল (আপন) মায়ের নামই দিতাম।”

ঢাকার চাকরিরত অবস্থায় বিয়ে করেন ইয়াকুব। পরবর্তীতে ২০২১ সালে চাকরি ছেড়ে তিনি গ্রামের বাড়িতে ফিরে আসেন। ২০২৩ সালে জাতীয় পরিচয়পত্রে আপন মা আয়েশা বেগমের নাম সংযোজন করতে বিরামপুর উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তার কার্যালয়ে আবেদন করেন তিনি। তবে সে বছর তাঁর আবেদনটি বাতিল হয়। এরপর ২০২৪ ও ২০২৫ সালেও আবেদন করলেও তা প্রত্যাখ্যাত হয়। সর্বশেষ ২০ অক্টোবর আপন মা আয়েশা বেগমের সন্তান প্রমাণ করতে নির্বাচন কর্মকর্তার কার্যালয়ের চাহিদা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সব নথিপত্রসহ পুনরায় অনলাইনে আবেদন করেছেন ইয়াকুব।

এই বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে বিরামপুর উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা আবদুল হাকিম মণ্ডল মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “ইয়াকুব আলী তাঁর মায়ের নাম সংশোধনের জন্য যে আবেদন করেছেন, সেটি “ঘ” ক্যাটাগরিতে পড়েছে। এটি বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের মহাপরিচালক দেখেন। এই সমস্যা সমাধান উপজেলা কার্যালয়ে সম্ভব নয়। তবে মহাপরিচালক চাইলে এ বিষয়ে একটি তদন্ত দিতে পারেন। তখন আমি তদন্ত করব, প্রতিবেদন পাঠাব।”