দৌড় প্রতিযোগিতায় মানুষের সঙ্গে ঘোড়া, বাঘ বা ভালুকের লড়াই হলে কে জিতবে? উত্তরটা খুব কঠিন হওয়ার কথা না। কারণ, অনেক প্রাণীই অল্প সময়ে মানুষের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি গতিতে দৌড়াতে পারে। তবে ছোট দূরত্বে দ্রুত দৌড়ানো আর দীর্ঘ সময় ধরে একই গতি বজায় রাখা এক বিষয় না। আর এই পার্থক্যই মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর দৌড়ের ক্ষমতা নিয়ে তৈরি করেছে মজার এক বৈজ্ঞানিক প্রশ্ন।

বিবিসি ফিউচারের এক প্রতিবেদনে বিভিন্ন প্রাণীর দৌড়ের গতি বিশ্লেষণ করে দেখানো হয়েছে, কোন পরিস্থিতিতে মানুষ কিছু প্রাণীর সঙ্গে পাল্লা দিতে পারে, আর কোন প্রাণীর কাছে হার মানতে হয়। গবেষকদের সংগ্রহ করা তথ্য অনুযায়ী, প্রাণীর শরীরের আকার, পেশির ধরন, ত্বরণ এবং কতক্ষণ গতি ধরে রাখতে পারে, এসব বিষয় দৌড়ের ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

ছোট দূরত্বে কোন প্রাণীদের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারেন?

মানুষের সঙ্গে প্রাণীর দৌড় তুলনা করতে গেলে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। অনেক প্রাণীর ক্ষেত্রে যে গতি নথিভুক্ত করা হয়, তা তাদের সর্বোচ্চ গতি। তারা সেই গতিতে দীর্ঘ সময় দৌড়াতে পারে না। অন্যদিকে মানুষের দৌড়ের রেকর্ড অনেক সময় নির্দিষ্ট দূরত্বে গড় গতির ভিত্তিতে হিসাব করা হয়। তাই এই তুলনাগুলোকে সরাসরি প্রতিযোগিতার ফল হিসেবে দেখা ঠিক না।

বিবিসির প্রতিবেদনে মানুষের পাঁচ কিলোমিটার দৌড়ের সময়ের সঙ্গে বিভিন্ন প্রাণীর সর্বোচ্চ গতির তুলনা করা হয়েছে। সেখানে দেখা যায়, পাঁচ কিলোমিটার দৌড়াতে ৪০ মিনিট লাগলে মানুষের গড় গতি বনভূমিতে বসবাসকারী ভোল নামের ছোট ইঁদুরজাতীয় প্রাণীর সর্বোচ্চ গতির কাছাকাছি হয়। ৩০ মিনিটে পাঁচ কিলোমিটার দৌড়াতে পারলে গতি ইঁদুর বা হ্যামস্টারের সর্বোচ্চ গতির সঙ্গে তুলনীয় হয়।

আর ২৫ মিনিটে পাঁচ কিলোমিটার দৌড়াতে পারলে মানুষের গড় গতি ঘরের ইঁদুর বা সামুদ্রিক ইগুয়ানার নথিভুক্ত সর্বোচ্চ গতির কাছাকাছি পৌঁছায়। ২০ মিনিটে এই দূরত্ব অতিক্রম করতে পারলে গতি স্কাঙ্ক বা গ্রাউন্ডহগের সর্বোচ্চ গতির সঙ্গে তুলনা করা যায়।

হাতি কি মানুষের কাছে দৌড়ে হারতে পারে?

শুনতে অবাক লাগলেও, স্বল্প দূরত্বের দৌড়ে কিছু মানুষের সঙ্গে হাতির প্রতিযোগিতা জমে উঠতে পারে। আফ্রিকান বুশ এলিফ্যান্ট ঘণ্টায় প্রায় ৩৫ কিলোমিটার গতিতে চলতে পারে। তবে এত দ্রুত গতি তুলতে হাতির সময় লাগে। কারণ, তার বিশাল শরীরকে ত্বরান্বিত করতে বেশি শক্তি প্রয়োজন।

প্রাণীদের ত্বরণ নিয়ে গবেষণার তথ্য ব্যবহার করে করা একটি আনুমানিক হিসাব বলছে, হাতির ঘণ্টায় ৩৫ কিলোমিটার গতিতে পৌঁছাতে প্রায় ৭.৫ সেকেন্ড লাগতে পারে। সেই হিসাব অনুযায়ী, ১০০ মিটার দৌড়াতে তার প্রায় ১৪ সেকেন্ড লাগতে পারে। ফলে প্রশিক্ষিত কিছু দৌড়বিদ স্বল্প দূরত্বে হাতির সঙ্গে পাল্লা দিতে পারেন।

তবে এটি সরাসরি প্রতিযোগিতায় প্রমাণিত ফল না। হাতির প্রকৃত গতি, দৌড়ের পরিস্থিতি এবং হিসাবের পদ্ধতির ওপর ফল বদলাতে পারে।

উসাইন বোল্টও যেসব প্রাণীর চেয়ে ধীর

মানুষের দ্রুততম দৌড়বিদদের একজন উসাইন বোল্ট। ১০০ মিটার দৌড়ে বিশ্বরেকর্ড গড়ার সময় তার সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় প্রায় ৪৪ কিলোমিটারে পৌঁছেছিল। কিন্তু প্রাণিজগতে এমন অনেক দৌড়বিদ আছে, যাদের গতি এই সীমা ছাড়িয়ে যায়।

চিতা: ঘণ্টায় প্রায় ৯৩ কিমি

চিতা স্থলচর প্রাণীদের মধ্যে অন্যতম দ্রুতগতির প্রাণী। তবে এই সর্বোচ্চ গতি সাধারণত অল্প সময়ের জন্য ধরে রাখতে পারে। শিকারের সময় তাদের দৌড়ের দূরত্বও প্রায়ই ২০০ মিটারের কম হয়।

উটপাখি: ঘণ্টায় প্রায় ৮৩ কিমি

উটপাখি দ্রুত দৌড়াতে পারে এবং লম্বা পা ব্যবহার করে বড় বড় পদক্ষেপে এগিয়ে যায়। ফলে স্বল্প দূরত্বে মানুষের পক্ষে তার সঙ্গে পাল্লা দেওয়া কঠিন।

জিরাফ: ঘণ্টায় প্রায় ৫৭-৬০ কিমি

লম্বা পা ও বড় পদক্ষেপের কারণে জিরাফও দ্রুত দৌড়াতে পারে। এমনকি বোল্টের নথিভুক্ত সর্বোচ্চ গতির চেয়েও জিরাফের সর্বোচ্চ গতি বেশি।

জেব্রা: ঘণ্টায় প্রায় ৭১ কিমি

বিপদের সময় জেব্রা দ্রুত ছুটতে পারে। তাই মানুষের পক্ষে স্বল্প দূরত্বের দৌড়ে জেব্রাকে হারানো প্রায় অসম্ভব।

প্রাণীদের গতি বিভিন্ন গবেষণা ও পর্যবেক্ষণ থেকে পাওয়া আনুমানিক সর্বোচ্চ গতির ভিত্তিতে দেওয়া হয়েছে। সব প্রাণী একই পরিস্থিতিতে বা একই দূরত্বে এই গতি ধরে রাখতে পারে না।

ভালুক, গন্ডার ও হরিণের সঙ্গে দৌড়ালে কী হবে?

কালো ভালুক ঘণ্টায় প্রায় ৪৮ কিলোমিটার গতিতে দৌড়াতে পারে। গ্রিজলি ও মেরু ভালুকের সর্বোচ্চ গতিও ঘণ্টায় প্রায় ৪৮ থেকে ৫০ কিলোমিটারের মধ্যে বলে উল্লেখ করা হয়। ফলে একজন সাধারণ মানুষের পক্ষে এসব প্রাণীর সঙ্গে গতিতে পাল্লা দেওয়া কঠিন।

সাদা গন্ডারের সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় প্রায় ৪০ কিলোমিটার। এটি বোল্টের সর্বোচ্চ গতির চেয়ে কম হলেও সাধারণ মানুষের তুলনায় অনেক বেশি।

অন্যদিকে, হরিণজাতীয় কিছু প্রাণী আরও দ্রুত দৌড়াতে পারে। যেমন রেইনডিয়ারের গতি ঘণ্টায় প্রায় ৮০ কিলোমিটার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। তাই প্রাণীর আকার বড় হলেই সেটি ধীরে দৌড়াবে এমন ধারণাও ঠিক নয়।

গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা: ভালুক বা অন্য বন্য প্রাণীর সামনে পড়লে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করা বিপজ্জনক হতে পারে। এতে প্রাণীটি তাড়া করতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে কী করতে হবে, তা প্রাণীর প্রজাতি ও পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে। নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা এবং স্থানীয় বন্যপ্রাণী নিরাপত্তা নির্দেশনা মেনে চলা জরুরি।

দীর্ঘ দূরত্বের দৌড়ে মানুষ কি এগিয়ে?

স্বল্প দূরত্বে অনেক প্রাণীর কাছে মানুষ পিছিয়ে থাকলেও দীর্ঘ দূরত্বের দৌড়ে মানুষের কিছু বিশেষ শারীরিক সুবিধা আছে।

মানুষের শরীরে তুলনামূলক কম লোম থাকে এবং ঘামের মাধ্যমে শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা যায়। দীর্ঘ সময় দৌড়ানোর ক্ষেত্রে এই বৈশিষ্ট্যগুলো সহায়ক হতে পারে। এ ছাড়া মানুষের পেশিতে ধীরগতির কিন্তু দীর্ঘ সময় কাজ করতে সক্ষম পেশিতন্তু আছে, যা সহনশীলতা ধরে রাখতে সাহায্য করে।

তবে এর অর্থ এই না যে মানুষ সব প্রাণীকে দীর্ঘ দূরত্বের দৌড়ে হারাতে পারবে।

সাইবেরিয়ান হাস্কির মতো স্লেজ কুকুর দীর্ঘ পথ ধরে দৌড়ানোর জন্য বিশেষভাবে সক্ষম। প্রশিক্ষিত সহনশীল ঘোড়াও সমতল পথে ম্যারাথনের দূরত্বে অধিকাংশ মানুষকে হারাতে পারে। ওয়েলসে মানুষ ও ঘোড়ার মধ্যে প্রায় ৩৫ কিলোমিটারের একটি বার্ষিক দৌড় প্রতিযোগিতা হয়, যেখানে সাধারণত ঘোড়াই জেতে, যদিও কিছু বছর মানুষও এগিয়ে থাকে।

সব প্রাণীকে একইভাবে তুলনা করা যায় না কেন?

প্রাণীর দৌড়ের ক্ষমতা নির্ভর করে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর।

সর্বোচ্চ গতি: প্রাণীটি অল্প সময়ের জন্য কত দ্রুত দৌড়াতে পারে।

ত্বরণ: স্থির অবস্থা থেকে কত দ্রুত গতি বাড়াতে পারে।

সহনশীলতা: কতক্ষণ বা কত দূর পর্যন্ত গতি ধরে রাখতে পারে।

শরীরের আকার ও পেশি: শরীরের ওজন, পেশির ধরন ও শক্তি ব্যবহারের ক্ষমতা দৌড়ের ওপর প্রভাব ফেলে।

পরিবেশ ও ভূখণ্ড: সমতল রাস্তা, বালু, ঘাস বা পাহাড়ি পথে দৌড়ের ফল আলাদা হতে পারে।

গবেষকেরা প্রায় ৩৫০ প্রজাতির স্থলচর প্রাণীর দৌড়ের গতি বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, সবচেয়ে বড় প্রাণীই যে সবচেয়ে দ্রুত হবে, তা না। বড় শরীরকে গতি দিতে বেশি শক্তি প্রয়োজন হওয়ায় অনেক প্রাণী তাদের সম্ভাব্য সর্বোচ্চ গতিতে পৌঁছানোর আগেই ক্লান্ত হয়ে পড়ে।

কোন প্রাণীর সঙ্গে মানুষ দৌড়ে জিতবে, তার উত্তর নির্ভর করে দৌড়ের দূরত্ব, প্রাণীর প্রজাতি, গতি ও সহনশীলতার ওপর। স্বল্প দূরত্বে চিতা, উটপাখি, জিরাফ কিংবা জেব্রার সঙ্গে মানুষের পেরে ওঠা কঠিন। তবে হাতির মতো বড় প্রাণীর ক্ষেত্রে ত্বরণের পার্থক্য স্বল্প দূরত্বের হিসাবকে কিছুটা বদলে দিতে পারে।

দীর্ঘ দূরত্বে মানুষের ঘামের মাধ্যমে শরীর ঠান্ডা রাখার ক্ষমতা ও সহনশীলতা সুবিধা দেয়। কিন্তু সেখানেও হাস্কি কুকুর বা প্রশিক্ষিত ঘোড়ার মতো প্রাণীর সঙ্গে পাল্লা দেওয়া সহজ না। অর্থাৎ, দৌড়ের প্রতিযোগিতায় শুধু সর্বোচ্চ গতি না, কত দ্রুত সেই গতি পাওয়া যায় এবং কতক্ষণ ধরে রাখা যায়, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

সূত্র

BBC Future: The Animals You Can't Outrun, and the Ones You Can

Nature Ecology & Evolution: A general scaling law reveals why the largest animals are not the fastest