বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য ও উন্নয়ন সহযোগী দেশ জাপান। বর্তমানে এই দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ বছরে প্রায় সাড়ে ৩০০ কোটি ডলারের কাছাকাছি। এই মোট বাণিজ্যের মধ্যে বাংলাদেশের রপ্তানির অংশ প্রায় ৪০ শতাংশ এবং বাকি ৬০ শতাংশের মতো হলো আমদানি।

বাংলাদেশ থেকে প্রধানত ওভেন ও নিট পোশাক এবং চামড়াজাত পণ্য জাপানে রপ্তানি করা হয়। অন্যদিকে, জাপানের কাছ থেকে আমদানি করা হয় লোহা, ইস্পাত, জাহাজ, যানবাহন ও বিভিন্ন ধরনের যন্ত্রপাতি। জাপানি বাজারে রপ্তানির পরিমাণ আরও বৃদ্ধি করতে চলতি বছরের ৬ ফেব্রুয়ারি ‘অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি’ (ইপিএ) স্বাক্ষর করেছে বাংলাদেশ। তবে এই চুক্তির সুফল এখনো রপ্তানি খাতে পুরোপুরি প্রতিফলিত হয়নি।

জাপানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করতে চার দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে সেই দেশে গিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এই সফরের অংশ হিসেবে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে বৈঠকের পাশাপাশি গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টয়োটার কারখানা এবং জেরার এলএনজি টার্মিনাল পরিদর্শনের কথা রয়েছে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর কর্মসূচিতে।

জাপানি সংবাদমাধ্যম নিক্কেই এশিয়া জানিয়েছে, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে বাংলাদেশের বেসরকারি খাতে ১ ট্রিলিয়ন জাপানি ইয়েন (৬৩৫ কোটি মার্কিন ডলার) বিনিয়োগ করতে আগ্রহী জাপান। বিশেষ করে অটোমোবাইল, অন্যান্য ম্যানুফ্যাকচারিং শিল্প এবং বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের ক্ষেত্রে দেশটির উদ্যোক্তারা বিনিয়োগে বিশেষ আগ্রহ দেখিয়েছেন।

রপ্তানির শীর্ষে পোশাক, আমদানিতে ইস্পাত

বাংলাদেশ ব্যাংক এবং রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) দেওয়া তথ্যানুসারে, ২০১৬–১৭ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে জাপানে ১০১ কোটি ২৯ লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি করা হয়েছিল। সর্বশেষ ২০২৫–২৬ অর্থবছরে এই রপ্তানির পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩৬ কোটি ডলারে। এই হিসাব অনুযায়ী, গত এক দশকে জাপানে বাংলাদেশের রপ্তানি বেড়েছে প্রায় ৩৫ শতাংশ। বিপরীতে, একই সময়ের ব্যবধানে জাপান থেকে আমদানি বেড়েছে প্রায় ১০ শতাংশ।

ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে জাপানে প্রায় ৪০০ ধরনের পণ্য রপ্তানি করা হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশটি তৈরি পোশাক খাতের। এছাড়া চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানির অন্যতম উল্লেখযোগ্য খাত। পাশাপাশি হিমায়িত মাছ ও জলজ প্রাণী, দুগ্ধজাত পণ্য, ফলমূল ও বাদাম, চা-কফি-মসলা, শস্য, তেলবীজ ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যসামগ্রীও জাপানে রপ্তানি হয়। রপ্তানি পণ্যের তালিকায় আরও রয়েছে আসবাব ও প্রকৌশল পণ্য, ইলেকট্রনিকস ও ইলেকট্রিক্যাল যন্ত্রপাতি, বয়লার ও মেশিনারিজ; বিভিন্ন ধাতু ও ধাতুসামগ্রী, রাসায়নিক ও প্লাস্টিক পণ্য, রাবার, ওষুধ, সাবান, খেলনা ও খেলাধুলার সামগ্রী, ঘড়ি, কাঠের পণ্য, কাগজ ও মুদ্রিত বইপত্র।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে জাপান থেকে প্রায় ১৮৮ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করা হয়েছে। আমদানি করা পণ্যের মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশ হলো লোহা ও ইস্পাত, যা মোট আমদানির ৩৭ শতাংশ। আমদানির দ্বিতীয় শীর্ষ তালিকায় রয়েছে বিভিন্ন ধরনের যানবাহন ও এর যন্ত্রাংশ। এছাড়া জাহাজ, নৌকা, ভারী যন্ত্রপাতি, বয়লার, খনিজ জ্বালানি, তেল ও বিটুমিনাস পদার্থ, চিকিৎসা যন্ত্রপাতি, প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম সুতা, প্লাস্টিক সামগ্রী, ফটোগ্রাফিক ও সিনেমাটোগ্রাফিক পণ্যসহ আরও অনেক পণ্য আমদানির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে জাপান থেকে ৫২ লাখ ডলারের নিট এফডিআই এসেছে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ বিনিয়োগ এসেছে ট্রেডিং খাতে এবং দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বিনিয়োগ এসেছে তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল খাতে। এছাড়া পেট্রোলিয়াম ও গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, ওষুধ ও রাসায়নিক খাত, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও মৎস্য খাতেও কিছু জাপানি বিনিয়োগ এসেছে। এর আগে ২০২৪–২৫ অর্থবছরে জাপান থেকে সাড়ে পাঁচ কোটি ডলারের বেশি এফডিআই এসেছিল। উল্লেখ্য, ২০১৮ সালে জাপান টোব্যাকো ১৪৭ কোটি ৬০ লাখ ডলার বিনিয়োগের মাধ্যমে একটি বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান অধিগ্রহণ করে। এছাড়া মিতসুই অ্যান্ড কোম্পানি, সুমিতোমো করপোরেশন, মিৎসুবিশি, মারুবেনিসহ বাংলাদেশে নিবন্ধিত জাপানি কোম্পানির সংখ্যা বর্তমানে প্রায় ৩৫০টি।

জাপান ব্যাংক অব ইন্টারন্যাশনাল কো–অপারেশনের (জেবিআইসি) তথ্য অনুযায়ী, জাপানি বিনিয়োগকারীদের কাছে ব্যবসা প্রসারের জন্য সেরা ২০টি সম্ভাবনাময় দেশের তালিকায় টানা তিন বছর ধরে রয়েছে বাংলাদেশ। অন্যদিকে, জাপানি বিনিয়োগ সহায়তাকারী সংস্থা জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের (জেট্রো) এক জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৭২ শতাংশ জাপানি কোম্পানি বাংলাদেশে তাদের ব্যবসা সম্প্রসারণে আগ্রহী। জাপানি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে ইতিমধ্যে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (জাপান অর্থনৈতিক অঞ্চল) গড়ে তোলা হয়েছে।

জাপানের বিনিয়োগ সম্ভাবনা সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে জাপান–বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (জেবিসিসিআই) সাবেক সভাপতি তারেক রাফি ভূঁইয়া বলেন, ‘এখন অনেক বেসরকারি জাপানি প্রতিষ্ঠানও বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহী। এই বিনিয়োগ এলে স্থবির অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার হবে। এ জন্য বাংলাদেশকে কিছু নীতি পদক্ষেপ নিতে হবে। উভয় দেশের পার্লামেন্টে দ্রুত ইপিএ অনুমোদন (র্যাটিফিকেশন) করিয়ে তা কার্যকর করতে হবে। এ ছাড়া আমাদের দীর্ঘমেয়াদি নীতি গ্রহণ ও তা বহাল রাখতে হবে।’