ভেনেজুয়েলার বিরোধীদলীয় নেতা মারিয়া কোরিনা মাচাদো প্রায় এক বছর পর গতকাল রোববার দেশে ফিরেছেন। এর আগে তিনি দেশে ফেরার জন্য বেশ কয়েকবার ব্যর্থ চেষ্টা করেছিলেন। এ ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের কিছুটা অবনতি হয়েছিল।

‘আমি এখানে এসেছি। তোমাদের সবার সঙ্গে আছি,’ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এমনটাই লিখেছেন শান্তিতে নোবেলজয়ী এই নেতা।

মাচাদোর প্রেস টিমের শেয়ার করা ছবিতে দেখা যায়, তিনি পশ্চিমাঞ্চলীয় লারা রাজ্যের একটি গির্জায় উপস্থিত হয়েছেন। একজন প্রত্যক্ষদর্শী রয়টার্সকে জানান, একটি এসইউভি (জিপ) গাড়িতে করে যাওয়ার সময় উপস্থিত জনতা জাতীয় সংগীত গেয়ে এবং ‘মুক্তি’ বলে স্লোগান দিয়ে তাঁকে স্বাগত জানান।

মাচাদোর দল জানিয়েছে, তিনি সড়কপথে রাজধানী কারাকাসে যাবেন।

মাচাদোর দেশে ফেরার এই চেষ্টা ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের একটি পরীক্ষা বলা যায়। গত জানুয়ারি মাসে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করার আগে থেকেই এই প্রশাসনকে তিনি মিত্র হিসেবে পেতে চেয়েছিলেন।

গত জুনে রয়টার্স জানিয়েছিল, মার্কিন কর্মকর্তারা অন্তত একবার তাঁকে দেশে ফেরা পিছিয়ে দেওয়ার অনুরোধ করেছিলেন। এরপরও তিনি দেশে ঢোকার জন্য বেশ কয়েকবার ব্যর্থ চেষ্টা করেছেন।

মাচাদো ঠিক কীভাবে দেশে ফিরেছেন, সে সম্পর্কে তাঁর দল বিস্তারিত কিছু জানায়নি।

ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোর সাবেক ডেপুটি ও বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজের প্রতি ট্রাম্প বারবার সমর্থন জানিয়েছেন। একই সঙ্গে দক্ষিণ আমেরিকার এই দেশটিতে মার্কিন কোম্পানিগুলোর তেল উৎপাদন ও অন্যান্য ব্যবসায়িক চুক্তিরও প্রশংসা করেছেন তিনি।

গত সেপ্টেম্বরে ট্রাম্প বলেছিলেন, ভেনিজুয়েলায় এখনই গণতান্ত্রিক নির্বাচনের কথা ভাবার সময় আসেনি।

গতকাল হোয়াইট হাউসে ট্রাম্প জানান, মাচাদোর ফিরে আসার বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না। তিনি এমন ইঙ্গিতও দেন যে যুক্তরাষ্ট্র রদ্রিগেজকেই সমর্থন দিয়ে যাবে।

মাচাদোকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, ‘তিনি খুব ভালো একজন নারী। তবে আমরা ভেনিজুয়েলায় সত্যিই খুব ভালো করছি।’

বিষয়টি জানেন এমন দুজন ব্যক্তি বলেছেন, মাচাদো পানামা থেকে একটি ব্যক্তিগত উড়োজাহাজে করে কলম্বিয়ায় যান। এরপর তিনি সড়কপথে ভেনিজুয়েলায় প্রবেশ করেন।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এক বিবৃতিতে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন নিয়ে যে আপস-আলোচনা হয়েছে, তার সরাসরি ফল হলো মাচাদোর নিরাপদে ভেনিজুয়েলায় ফিরে আসা। এই আলোচনার মাধ্যমেই ইতিমধ্যে শত শত রাজবন্দী মুক্তি পেয়েছেন এবং নির্বাসনে থাকা শত শত বিরোধীদলীয় নেতা দেশে ফিরেছেন।’

রুবিও আরও বলেন, ‘আমরা আশা করি সব রাজনৈতিক নেতা এই আলোচনাকে সমর্থন করবেন। কারণ, গত ত্রিশ বছরের মধ্যে ভেনিজুয়েলার কাছে এটাই সেরা সুযোগ, যার মধ্য দিয়ে শুধু একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনই নয়; বরং একটি স্থায়ী গণতন্ত্রও শান্তিপূর্ণভাবে অর্জন করা সম্ভব।’

চূড়ান্ত নির্বাচনের আগে দেশের সর্বোচ্চ আদালত এবং নির্বাচন কমিশনকে নতুন করে সাজানোর লক্ষ্যে এ মাসে বিরোধী দলের একাংশ এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তাদের সর্বশেষ আলোচনায় বসেছিল।

তবে এই আলোচনায় মাচাদোর রাজনৈতিক দল যুক্ত ছিল না।

ভেনিজুয়েলার যোগাযোগবিষয়ক মন্ত্রণালয় সরকারের সব সংবাদমাধ্যম–সংক্রান্ত প্রশ্নের জবাব দিয়ে থাকে। তবে মাচাদোর দেশে ফেরার বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাওয়া হলে তারা তাৎক্ষণিকভাবে এ বিষয়ে কিছু জানায়নি।

ভুক্তভোগীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ

মাচাদোর ফিরে আসার পর উৎসবে মেতেছে তাঁর সমর্থকেরা। কুইসিমেতো শহরে অন্য সমর্থকদের সঙ্গে এ আগমন উদ্‌যাপন করার সময় ৬৯ বছর বয়সী হার্নান আডামস বলেন, ‘মারিয়া কোরিনা মাচাদো ভেনিজুয়েলায় স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করবেন।’

মাচাদোর প্রধান পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা ডেভিড স্মোলানস্কি রয়টার্সকে জানিয়েছেন, গত জুনে ভেনিজুয়েলায় আঘাত হানা ভয়াবহ ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের সঙ্গে দেখা করার পরিকল্পনা রয়েছে মাচাদোর। সেই সঙ্গে তিনি রাজবন্দীদের পরিবার, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং ভেনিজুয়েলার গণতান্ত্রিক আন্দোলনের বিভিন্ন নেতার সঙ্গেও দেখা করবেন।

ডেভিড স্মোলানস্কি আরও বলেন, ‘একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের তারিখ নির্ধারণের জন্য তিনি সক্রিয়ভাবে কাজ করবেন।’

গত মাসে রদ্রিগেজ এবং মার্কিন জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইটের উপস্থিতিতে একটি চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সেখানে আন্তর্জাতিক জ্বালানি প্রতিষ্ঠানগুলো দেশটিতে তাদের প্রকল্প বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

মাচাদো বলেছেন যে একটি ‘দায়িত্বশীল ও গণতান্ত্রিক সরকারই’ বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রয়োজনীয় স্থিতিশীলতা দিতে পারে।

মাদুরো সরকার তাঁকে ভেনিজুয়েলা ছাড়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল। তবে এক বছরের বেশি সময় ধরে প্রায় লুকিয়ে থাকার পর, ২০২৫ সালের শেষের দিকে নোবেল শান্তি পুরস্কার নেওয়ার জন্য তিনি গোপনে দেশ ছাড়েন।

বিদেশে থাকা ভেনিজুয়েলার নাগরিকদের ভোটার নিবন্ধনের তথ্য সংগ্রহ করতে মাচাদোর দল ‘ভেন্টে ভেনিজুয়েলা’ গত শনিবার একটি অ্যাপ চালু করেছে।

দলটির ১৫ জন কর্মী গত ১৮ মাসে এই অ্যাপটি তৈরি করেছেন। দলটি আশা করছে, অ্যাপ থেকে পাওয়া এসব তথ্য পরে তারা একটি সংস্কার করা নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে শেয়ার করতে পারবে, যাতে ব্যবহারকারীদের আনুষ্ঠানিকভাবে ভোটার তালিকায় যুক্ত করা যায়।

মাচাদোর দলের সাবেক প্রেসিডেন্ট প্রার্থী এডমুন্ডো গঞ্জালেস স্পেনে বসবাস করছিলেন। তিনি এক্সে জানিয়েছেন, শিগগিরই তিনি ভেনিজুয়েলায় মাচাদোর সঙ্গে যোগ দেবেন।