কবি জসীমউদ্‌দীনের সঙ্গে শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের পরিচয় ১৯২৯ কি ১৯৩০ সালের দিকে। জসীমউদ্‌দীন তখন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমএর শিক্ষার্থী। আর শেরেবাংলা তখন রাজনীতিতে কিছুটা কোণঠাসা; কংগ্রেস ও মুসলিম লীগে আস্থা হারিয়ে তিনি তখন বাংলার কৃষক-প্রজাদের সংহত করার প্রচেষ্টায় রত। যাঁর সুবাদে এ পরিচয়পর্ব সম্পাদিত হয়, তাঁর নাম সৈয়দ আবদুর রব। শেরেবাংলার স্মৃতিচারণা করে রচিত জসীমউদ্‌দীনের এক লেখায় এই প্রায়বিস্মৃত মহান মানুষ সৈয়দ আবদুর রব সম্পর্কেও কিছুটা জানা যায়। প্রাসঙ্গিকতা বিবেচনায় এখানে তাঁর সম্পর্কে সামান্য আলোকপাত জরুরি মনে করি।

১

ঘটনাক্রমে কবি জসীমউদ্‌দীন ও সৈয়দ আবদুর রবের জন্মসাল ও জন্মস্থান একই: ১৯০৩, ফরিদপুর। জসীমউদ্‌দীনের গ্রাম তাম্বূলখানা, আর আবদুর রবের গেরদা। অল্প বয়সেই আনুষ্ঠানিক পাঠে ইস্তফা দেন সৈয়দ রব। তারপর ১৯২৮ সালে ফরিদপুর শহরে ক্ষুদ্র পরিসরে গঠন করেন খাদেমুল এনছান সমিতি। ফরিদপুরের স্থানীয় জমিদার মোহাম্মদ ইউসুফ আলী ছিলেন এই সমিতির সভাপতি। আর সম্পাদক ছিলেন সৈয়দ আবদুর রব নিজে। সমিতির উদ্দেশ্য ছিল: সমাজসেবা, শিক্ষার প্রসার, সামাজিক সুসম্পর্কের বিকাশ, সামাজিক অন্ধত্ব ও ধর্মীয় কুসংস্কার থেকে মুক্তি, হিন্দু-মুসলমান সম্প্রীতির বিকাশ এবং সামাজিক সংগঠনসমূহকে শক্তিশালীকরণ। উদ্দেশ্য থেকে পরিষ্কার, তত্কালীন সমাজে যেসব সংকট বিরাজ করছিল, তার প্রায় প্রতিটিকেই আমলে নেওয়ার চেষ্টা করেছে এই সংগঠন।

ফরিদপুর থেকেই সারা দেশে সমিতির কার্যক্রম চালানোর চেষ্টা করছিলেন সৈয়দ রব। পরবর্তী সময়ে ১৯৩২ সালে প্রধান কার্যালয় কলকাতায় স্থানান্তর করা হয় এবং নতুন নাম দেওয়া হয় কেন্দ্রীয় খাদেমুল এনছান সমিতি। সমিতির পক্ষ থেকে প্রকাশিত হয় মুয়াজ্জিন ও সার্ভেন্ট অব হিউম্যানিটি নামে দুটি বাংলা ও ইংরেজি ত্রৈমাসিক পত্রিকা। ফরিদপুরে থাকার সময়ই তিনি পত্রিকা দুটি প্রকাশ শুরু করেন। জসীমউদ্‌দীন স্বয়ং এবং কাজী নজরুল ইসলাম, বেগম রোকেয়াসহ তখনকার দিনের খ্যাতনামা অনেক লেখকের লেখা মুয়াজ্জিন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। একটা সমিতির পক্ষ থেকে বের হওয়া পত্রিকায় এমন গুরুত্বপূর্ণ লেখাজোখার সমাবেশ ঘটা সত্যি বিরল। তাতে একটা ব্যাপার বোঝা যায়, অধুনা আমরা এনজিও বলে যে অলাভজনক প্রতিষ্ঠান পাই, তা থেকে এনছান সমিতির কার্যক্রম ও উদ্দেশ্য ভিন্ন। নিজের লাভালাভের চেয়ে সমাজের সমস্যাকে গভীরভাবে বোঝার ও সত্যিকার নিরসনের ব্যাপারেই অধিক মনোযোগী ছিল এই খাদেমুল এনছান সমিতি।

ফরিদপুর থেকেই সারা দেশে সমিতির কার্যক্রম চালানোর চেষ্টা করছিলেন সৈয়দ রব। পরবর্তী সময়ে ১৯৩২ সালে প্রধান কার্যালয় কলকাতায় স্থানান্তর করা হয় এবং নতুন নাম দেওয়া হয় কেন্দ্রীয় খাদেমুল এনছান সমিতি। সমিতির পক্ষ থেকে প্রকাশিত হয় মুয়াজ্জিন ও সার্ভেন্ট অব হিউম্যানিটি নামে দুটি বাংলা ও ইংরেজি ত্রৈমাসিক পত্রিকা।

জসীমউদ্‌দীন জানাচ্ছেন, খাদেমুল এনছান সমিতির কার্যক্রম সম্প্রসারণে কলকাতার নিকটস্থ কোনো স্থানে ফজলুল হক ত্রিশ-চল্লিশ বিঘা জমি মঞ্জুর করে দেন। এর পর থেকে ১৯৪৬ সালের ১৫ আগস্ট নাগাদ ভালোই চলছিল সমিতির কার্যক্রম। তারপর ঘটে কলকাতা দাঙ্গার ঘটনা। সমিতির অফিস পুড়িয়ে দেওয়া হয়, সৈয়দ রব নিজেও আহত হন। ১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি পৃথক দেশ সৃষ্টির পর তিনি ফরিদপুরে তাঁর নিজ গ্রামে ফিরে আসেন। এর মধ্য দিয়েই তাঁর সমিতির কার্যক্রমের একপ্রকার যবনিকাপাত ঘটে। তারপরও তিনি পুনরায় শুরু করার আপ্রাণ চেষ্টা করেন। কিন্তু কাউকেই তিনি আর পাশে পাননি।

জসীমউদ্‌দীন লিখেছেন, ‘স্বাধীনতার পূর্বে মুসলমানদের মধ্যে যে স্বজাতিপ্রেম ছিল, স্বাধীনতার পরে তাহা কর্পূরের মতো উড়িয়া গেল। লম্বা বাঁশের লাঠি আর পা পর্যন্ত আলখাল্লা পরিয়া রব বড় মিয়া, ছোট মিয়া কতজনের দুয়ারে ঘুরিল। দেশ যখন স্বাধীন হইয়াছে, তখন আর সেবা সমিতির প্রয়োজন কি। দেশের মন্ত্রী বাহাদুরেরা অনেক বড় বড় সমস্যা লইয়া ব্যস্ত। খাদেমুল ইনসান সমিতির কথা তারা ভাবিবেন কেন? মুসলমান সমাজে কেহ মরিলে মুর্দ্দা দাফন করিবার জন্য কখনো লোকের অভাব হয় না। কিন্তু অসুস্থ লোকের সেবা করিতে আমাদের ইমানদার ভাইদের একজনকেও দেখা যায় না। সেই কাজ রব আরম্ভ করিয়াছিল। জাতি–ধর্মনির্বিশেষে তার সেবার হস্ত সর্বত্র প্রসারিত হইত।’

১৯৫৪ সালে নদীভাঙনে সমস্ত সহায়–সম্পত্তি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েন সৈয়দ আবদুর রব এবং তাঁর শরীরে বাসা বাঁধে নানা রোগ। ১৯৬৯ সালের ২১ ডিসেম্বর তারিখে, হিন্দু-মুসলমান সম্প্রীতি ও সামাজিক সুসম্পর্ক সংহতকরণের অপূর্ণ বাসনা নিয়েই তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

২

ফিরে আসা যাক জসীমউদ্‌দীন ও শেরেবাংলার প্রথম মোলাকাতের সেই মুহূর্তে। আগেই বলেছি, সময়টা ১৯২৯-৩০ সাল, মুসলিম লীগ ও কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে নতুন রাজনৈতিক শক্তি গঠনের চেষ্টায় রত শেরেবাংলা। সে রকম একটা সময়ে, সৈয়দ রব একদিন জসীমউদ্‌দীনকে এসে বললেন: ‘আসাম প্রদেশের বানিয়াচং থানায় দারুণ দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছে। সেখানে রিলিফের কাজের জন্য আমরা কর্মী পাঠাইয়াছি। টাকা পয়সার খুব দরকার। অর্থ আদায়ের জন্য আমি একটা বিবৃতি লিখিয়া আনিয়াছি। চল যাই ফজলুল হক সাহেবের সঙ্গে দেখা করিয়া আসি। এই বিবৃতিতে তিনি যদি স্বাক্ষর দেন, তাহা হইলে টাকা পয়সা আদায় করিতে সহজ হইবে।’

ফজলুল হক তখন কলকাতাস্থ ইউরোপিয়ান অ্যাসাইলাম লেনের একটি বাড়িতে থাকেন। তাঁর সেই বাড়িতে গিয়ে হাজির হন জসীমউদ্‌দীন ও সৈয়দ রব। রব তাঁর বিবৃতিতে লিখেছেন, বানিয়াচংয়ের লোকজন কী করে কচু খেয়ে, কলার ভাদাইল খেয়ে জীবন ধারণ করছে। জসীমউদ্‌দীন জানাচ্ছেন, ‘শুনিতে শুনিতে হক সাহেবের দুই গাল অশ্রুতে ভিজিয়া গেল। রবের পড়া শেষ হলে অনেকক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া হক সাহেব বলিলেন, “দেখ আমি নিজে যাইয়া বানিয়াচঙের লোকদের অবস্থা দেখিয়া আসিয়া একটি বিবৃতি দিব। তাহাতে কাজ হইবে। না দেখিয়া কোনো বিবৃতি দিলে সহানুভূতি পাওয়া যাইবে না।”’

ফজলুল হকের মেয়র নির্বাচিত হওয়ার সে মুহূর্তকে কবি জসীমউদ্‌দীন তুলনা করেছেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের নেতৃত্বে সম্পাদিত ‘বেঙ্গল প্যাক্ট’–এর সময়ের সঙ্গে। তিনি লিখেছেন, ‘দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন একদিন হিন্দু মুসলিম প্যাক্ট রচনা করিয়াছিলেন। তাহার বদৌলতে বহু মুসলমান কলিকাতা কর্পোরেশনে চাকুরী পাইয়াছিল।

পরে তিনি সত্যিই বানিয়াচং গিয়েছিলেন কি না, তা জসীমউদ্‌দীনের লেখা থেকে আর জানা যায় না। এরপর ১৯৩৫ সালে ফজলুল হক কলকাতা করপোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হলে দ্বিতীয়বার তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন জসীমউদ্‌দীন। দ্বিতীয় সাক্ষাতের কারণটা একটু স্পষ্ট করা যাক।

ফজলুল হকের মেয়র নির্বাচিত হওয়ার সে মুহূর্তকে কবি জসীমউদ্‌দীন তুলনা করেছেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের নেতৃত্বে সম্পাদিত ‘বেঙ্গল প্যাক্ট’–এর সময়ের সঙ্গে। তিনি লিখেছেন, ‘দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন একদিন হিন্দু মুসলিম প্যাক্ট রচনা করিয়াছিলেন। তাহার বদৌলতে বহু মুসলমান কলিকাতা কর্পোরেশনে চাকুরী পাইয়াছিল। দেশবন্ধুর মৃত্যুর পর তাঁর অনুসারীরা ওই প্যাক্ট পদতলে দলিত করেন। খুব সম্ভব সুভাষ চন্দ্রের দলের দ্বারাই ইহা সম্পন্ন হইয়াছিল। হক সাহেব মেয়র হইলে দলে দলে মুসলমানেরা কলিকাতা কর্পোরেশনের চাকুরীর জন্য হক সাহেবের সঙ্গে দেখা করিতে লাগিলেন। কিন্তু এই সময় কর্পোরেশনের একজিকিউটিভ অফিসার ছিলেন মিষ্টার মুখার্জী। হক সাহেবের কথা তিনি প্রায়ই শুনিতেন না।’

কবি জসীমউদ্‌দীন নিজেও সেই চাকরিপ্রার্থীদের দলে ভিড়লেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাঁর এমএ পাসের তত দিনে ৫ বছর হয়ে গেছে। এর মধ্যে একদিন কবি আবদুল কাদির তাঁকে জানালেন, ‘কলিকাতা কর্পোরেশনে প্রাইমারী শিক্ষকদের জন্য একটি ট্রেনিং কেন্দ্র আছে। সেখানে বাংলার অধ্যাপকের পদ খালি আছে, জসীম তুমি চেষ্টা কর।’ আবদুল কাদিরের কথামতো জসীমউদ্‌দীন ফজলুল হকের সঙ্গে দেখা করেছিলেন। ফজলুল হক চেষ্টাও করেছিলেন তাঁকে চাকরিটা দিতে। কিন্তু সেই মুখার্জী বাবুর চক্করে পড়ে চাকরিটা আর হয়নি।

ফজলুল হক মেয়র থাকাকালে প্রায়ই কলকাতা করপোরেশনে অধিবেশন দেখতে যেতেন জসীমউদ্‌দীন। তিনি মুগ্ধ হয়ে দেখতেন, ফজলুল হক কী করে তার কথার জাদুতে বিহ্বল করে দুই বিবদমান পক্ষকে সমঝোতায় নিয়ে আসতেন। তিনি জানাচ্ছেন, ‘কলিকাতা কর্পোরেশন তখন নানা দলে বিভক্ত। একদল যাহা বলিতেন অপর দল তাহা অগ্রাহ্য করিতেন। হক সাহেব মেয়রের আসন হইতে তাহাদের মনান্তর দূর করিতে প্রাণপণ চেষ্টা করিতেন। কোনো সভ্য সভায় প্রস্তাব দিলেই হক সাহেব তাকে বলিতেন দেখুন মিস্টার...আপনার প্রস্তাবটি যদি আমি এইভাবে সামান্য একটু পরিবর্তন করি তাহাতে কেমন হয়? সভ্যটি তত্ক্ষণাৎ বলিয়া উঠিতেন “বেশ আমি এই পরিবর্তন গ্রহণ করিলাম।”’

জসীমউদ্‌দীনের লেখা থেকে স্পষ্ট যে মেয়রের পদে আসীন থাকলেও প্রশাসনিক ক্ষমতার জায়গায় ফজলুল হক ছিলেন প্রায় অক্ষম। মূল ক্ষমতা ছিল অন্যদের হাতে। যার কারণে বঞ্চিত ও নিপীড়িত মুসলমানদের জন্য তিনি তেমন কিছুই করতে পারেননি। করপোরেশনের বেশির ভাগ কাজই সীমাবদ্ধ থাকত ‘ইউরোপীয় আর হিন্দু অধ্যুষিত পাড়াগুলোতে। অন্যদিকে মুসলমান প্রধান বস্তিগুলো থাকত অবহেলিত। হাত-পা বাঁধা থাকায় করপোরেশনে চাকরির ক্ষেত্রেও মুসলমানদের জন্য তিনি কিছুই করতে পারলেন না। যার ফলে একপর্যায়ে মুসলমান সমাজের পক্ষ থেকে তাঁর পদত্যাগের দাবি উঠল। এবং তিনিও কোনো প্রকার দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছাড়াই, মাত্র কয়েক মাসের মাথায়, হাসিমুখে মেয়র পদ থেকে পদত্যাগ করেন।

জসীমউদ্‌দীন জানাচ্ছেন, ‘যেদিন তিনি মেয়রগিরি হইতে পদত্যাগ করিয়া বাড়ি ফিরিলেন সেই সময় আমি উপস্থিত ছিলাম। দেখিলাম আগের মতোই গালগল্প করিলেন। কতজনকে লইয়া হাসিঠাট্টাও করিলেন। এতবড় একটা মহাসম্মানের পদ যে তিনি ছাড়িয়া আসিলেন এ যেন এক গাছা খড় তাহার গায়ে লাগিয়াছিল তাহা পথে ফেলিয়া দিয়া আসিলেন। মুসলিম জনমতের কাছে এই আত্মত্যাগ পরবর্ত্তী কালে হক সাহেবকে অভূতপূর্ব জনপ্রিয় করিয়া তুলিল।’

জসীমউদ্‌দীনের লেখা থেকে স্পষ্ট যে মেয়রের পদে আসীন থাকলেও প্রশাসনিক ক্ষমতার জায়গায় ফজলুল হক ছিলেন প্রায় অক্ষম। মূল ক্ষমতা ছিল অন্যদের হাতে। যার কারণে বঞ্চিত ও নিপীড়িত মুসলমানদের জন্য তিনি তেমন কিছুই করতে পারেননি। করপোরেশনের বেশির ভাগ কাজই সীমাবদ্ধ থাকত ‘ইউরোপীয় আর হিন্দু অধ্যুষিত পাড়াগুলোতে। অন্যদিকে মুসলমান প্রধান বস্তিগুলো থাকত অবহেলিত।

৩

১৯৩৭ সালের নির্বাচনে ফজলুল হকের নেতৃত্বে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে নব্য প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল কৃষক প্রজা পার্টি। এই নির্বাচনে পটুয়াখালীতে স্যার নাজিমুদ্দীনকে পরাজিত করেন ফজলুল হক। এ ঘটনাকে নানা দিক থেকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করেছে জসীমউদ্‌দীন। ফজলুল হক কলকাতায় ফেরার পর এ উপলক্ষে কলকাতা টাউন হল মাঠে একটি সংবর্ধনা অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়। তাতে জসীমউদ্‌দীন অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। তিনি জানাচ্ছেন, ‘এই সভায় আমি উদাত্ত স্বরে হক সাহেবের প্রশংসা করিয়াছিলাম। কারমাইকেল হোষ্টেলের ছাত্রদের দ্বারা “ও মাঝিরে ঝড় তুফানে চালাও তরী হুসিয়ার” গানটি গাইওয়াছিলাম। তাহাতে সভাস্থলে বিরাট উদ্দীপনার সৃষ্টি হইয়াছিল। এই সভার বক্তৃতা করিতে আমি বলিয়াছিলাম, হক সাহেবের পটুয়াখালী বিজয় শুধু হক সাহেবের বিজয় নয়। দেশের যুক্তিবাদি যুবশক্তির কাছে মোল্লাশক্তির পরাজয়। আমার এ বক্তৃতা লইয়া বহুদিন আজাদ ও Star of India–তে লেখালেখি চলে। আজাদের লেখা প্রতিবাদ করিয়া আমি প্রবন্ধ পাঠাইয়াছিলাম। তাহা ছাপা হয় নাই।’

এই নির্বাচনে কংগ্রেস, মুসলিম লীগ ও কৃষক প্রজা পার্টি কেউই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠনের সুযোগ পায়নি। ফলে জোটবদ্ধ হয়ে সরকার গঠন আবশ্যক হয়ে পড়ে। নানা জল্পনাকল্পনার পর মুসলিম লীগের জোটবদ্ধ হয়ে সরকার গঠন করে কৃষক প্রজা পার্টি, ফজলুল হক হন বাংলার প্রধানমন্ত্রী।

জসীমউদ্‌দীনের স্মৃতিচারণা থেকে জানা যাচ্ছে, ফজলুল হক প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরও মুসলমান তরুণেরা তাঁর কাছে চাকরির জন্য ভিড় করতে শুরু করে। জসীমউদ্‌দীনের ভাষায়, ‘হক সাহেবের প্রকাণ্ড বৈঠকখানায় সকাল হইতেই লোক গমগম করে। সবাই চাকুরীর উমেদার।’ তাঁর লেখায় দেখা যাচ্ছে, মেয়র থাকাকালে যেমন ফজলুল হকের ক্ষমতা সীমিত ছিল, প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরও তাঁর সে অবস্থার বিশেষ পরিবর্তন হয়নি। শুধু চাকরি দেওয়ার ক্ষমতা নয়, অনেক ব্যাপারেই তাঁর হাত-পা বাঁধা ছিল। দুটি ঘটনার মধ্য দিয়ে তা স্পষ্ট করা যেতে পারে।

একবার জসীমউদ্‌দীন আরও অনেকে কবি কাজী নজরুল ইসলামকে সাহিত্যিক ভাতা দেওয়ার দাবি তুললেন। বহুদিন তাঁরা ফজলুল হককে এ বিষয়ে অনুরোধ জানিয়েছেন। এমনকি ফজলুল হক দার্জিলিং যাওয়ার সময় জসীমউদ্‌দীনসহ আরও অনেকে তাঁকে রাস্তায় ঘিরে ধরলেন, যাতে কাজী নজরুল ইসলামকে সাহিত্যিক ভাতা দেওয়া হয়। তাঁদের কথা অনুযায়ী হক অনেক চেষ্টাও করেছিলেন। তিনি নিজেও নজরুলকে পছন্দ করতেন। কিন্তু শেষমেশ তিনি তা পারেননি। জসীমউদ্‌দীন জানাচ্ছেন, ‘সাহিত্যিক ভাতা তাহাকে [কাজী নজরুল ইসলাম] দিতে হক সাহেব বহু চেষ্টা করিয়াছিলেন কিন্তু তখনকার দিনে প্রধানমন্ত্রীর কাজ যে কত সীমিত ছিল, তাহা কল্পনারও অতীত। তখনকার দিনে বিভাগীয় সেক্রেটারিরা মন্ত্রীদের আদেশ উপদেশ খুব কমই মান্য করিতেন।’

জসীমউদ্‌দীন আরেকটি ঘটনার উল্লেখ করেছেন। এ ঘটনাটা অবশ্য তাঁর ব্যক্তিগত। তিনি একবার ফজলুল হকের কাছে একটা তদবির নিয়ে যান। তাঁর এক আত্মীয় ১০-১২ বছর ধরে ফরিদপুর কালেক্টরিতে অস্থায়ীভাবে কেরানির কাজ করছিল। ফজলুল হক একবার ফরিদপুর আসার পর তিনি তাঁকে তার সেই আত্মীয়ের কথা জানালেন এবং তাঁর চাকরিটা যেন স্থায়ী করা হয়। তাঁর অনুরোধে ফজলুল হক ইংরেজ ম্যাজিস্ট্রেটকে অনুরোধ করলেন যেন তাঁর চাকরিটা স্থায়ী করা হয়। ম্যাজিস্ট্রেট উত্তরে বলেন, ‘আই ডোন্ট ফাইন্ড অ্যানি রিজন টু মেক হিম পার্মানেন্ট।’ পাশেই সোহরাওয়ার্দী বসা ছিলেন। তিনি বললেন, ‘যে লোক ১০/১২ বত্সর সুনামের সঙ্গে চাকুরী করিতেছে, তাহাকে স্থায়ীভাবে নিয়োগ করিলে ক্ষতি কি?’ কিন্তু ম্যাজিস্ট্রেট তাঁর এ কথায় কর্ণপাত করলেন না।

৪

জসীমউদ্‌দীনের এ স্মৃতিচারণা থেকে বাঙালি মুসলমান সমাজের ১৯৪৭ সাল পূর্ববর্তী দুটি দশা সম্পর্কে আমরা ধারণা পাই। এক. চাকরি-বাকরিতে বাঙালি মুসলমান সমাজের অবস্থা। দুই. ক্ষমতায় আসীন হওয়া বাঙালি মুসলমান রাজনীতিবিদদের প্রকৃত ক্ষমতা। দুটি দশাতেই আমাদের হীন অবস্থার সাক্ষ্য দেয় জসীমউদ্‌দীনের স্মতিচারণা।

[email protected]