মধ্যপ্রাচ্যে উদারনীতি বা লিবারেল চিন্তাভাবনার বিকাশ ঘটছে—কথাটি শুনলে কারও কারও কাছে বাস্তবতাবিরোধী মনে হতে পারে। ধরেই নেওয়া হতো, মধ্যপ্রাচ্যের মানুষ বোধ হয় উদারনীতিতে আর আগ্রহী নয়—তারা যেন এক সম্পূর্ণ ভিন্ন, ধর্মকেন্দ্রিক ‘সত্যের শাসনব্যবস্থায়’ অভ্যস্ত।

এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে, এমন একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা যেখানে ধর্মীয় মৌলবাদীরা নিজেদের ইচ্ছেমতো ধর্ম ব্যাখ্যা করার অধিকার দাবি করে, ব্যক্তিস্বাধীনতাকে ধর্মীয় নির্দেশের নিচে স্থান দেয়, পুরুষতান্ত্রিকতাকে উসকে দেয় এবং নারীদের পোশাকের ওপর নানা কড়াকড়ি আরোপ করে।

কিন্তু চরম স্বৈরাচারী শাসনের আড়ালেও রচিত হচ্ছিল অন্য এক ইতিহাস। ২০০০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের পাঁচটি প্রধান দেশে আমি ধারাবাহিক কিছু জরিপ পরিচালনা করি। মানুষ কেন নির্দিষ্ট কিছু মূল্যবোধ লালন করে এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা কীভাবে বদলাচ্ছে, তা বোঝার জন্য মিসর, ইরান, ইরাক, সৌদি আরব ও তুরস্কের জনগণের প্রতিনিধিত্বশীল নমুনার ওপর মুখোমুখি সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়।

শাসকগোষ্ঠী যতটাই গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের গণদাবি দমন করার চেষ্টা করেছে, এই দেশগুলোর মানুষ ততটাই ক্রমবর্ধমানভাবে উদারনৈতিক মূল্যবোধের দিকে ঝুঁকেছে।

জরিপে বিভিন্ন বিষয়ে মতামত জানতে চাওয়া হলেও প্রধানত তিনটি দিকের ওপর ভিত্তি করে আমরা ১৫টি প্রশ্নের মাধ্যমে উদারনৈতিক মূল্যবোধ পরিমাপের চেষ্টা করি: আত্মপ্রকাশমূলক ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য, লিঙ্গসমতা এবং ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতি। মা-বাবার পছন্দের বদলে ভালোবেসে বিয়ে করার স্বাধীনতা, সন্তানের মধ্যে আনুগত্য বা ধর্মীয় বিশ্বাসের চেয়ে স্বাধীনতা ও কল্পনাশক্তির বিকাশকে প্রাধান্য দেওয়া এবং নারীদের পছন্দের পোশাক পরার অধিকার—এসবের ভিত্তিতে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য মাপা হয়।

বহুবিবাহ, স্বামীর প্রতি স্ত্রীর অন্ধ আনুগত্য এবং রাজনীতি, কর্মসংস্থান ও শিক্ষায় পুরুষদের অগ্রাধিকার-সংক্রান্ত প্রশ্নের মাধ্যমে লিঙ্গসমতা নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গি জানা হয়। অন্যদিকে রাজনীতি থেকে ধর্মকে আলাদা রাখা, পশ্চিমা ধাঁচের শাসনব্যবস্থা, ইসলামি সরকার এবং শরিয়াহ আইনের মতো বিষয়ে উত্তরের ওপর ভিত্তি করে পরিমাপ করা হয় ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির অবস্থান।

এরপর প্রতিক্রিয়াগুলো একত্র করে ১ থেকে ৪ স্কেলে প্রতিটি দেশের জন্য একটি ‘উদারনীতি সূচক’ তৈরি করা হয়, যেখানে উচ্চ নম্বর উদারনীতির প্রতি অধিক সমর্থন নির্দেশ করে।

শাসকগোষ্ঠী যতটাই গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের গণদাবি দমন করার চেষ্টা করেছে, এই দেশগুলোর মানুষ ততটাই ক্রমবর্ধমানভাবে উদারনৈতিক মূল্যবোধের দিকে ঝুঁকেছে।

জরিপের সূচকগুলো মধ্যপ্রাচ্যে উদারনীতির লক্ষণীয় বৃদ্ধির চিত্র তুলে ধরে, যদিও ক্ষেত্র ও দেশভেদে পরিবর্তনের মাত্রা আলাদা ছিল। এই পরিবর্তিত মূল্যবোধ বাস্তবেও রূপ নিয়েছে রাজনৈতিক আন্দোলনে—যার সবচেয়ে বড় প্রমাণ ২০২২ সালের ‘নারী, জীবন, স্বাধীনতা’ আন্দোলন এবং ২০২৫-২৬ সালের দেশব্যাপী গণবিক্ষোভ, যেখানে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে হাজার হাজার আন্দোলনকারী প্রাণ হারিয়েছেন বলে জানা যায়।

মিসরে ইসলামি সরকারকে ‘খুব ভালো’ মনে করা উত্তরদাতার হার ২০১১ সালের ২৫ শতাংশ থেকে কমে ২০২০ সালে ১৬ শতাংশে নেমে এসেছে; একইভাবে শরিয়াহ আইনকে ‘খুব গুরুত্বপূর্ণ’ মনে করা মানুষের হার ২৮ শতাংশ থেকে কমে ১৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে ইরাকে ইসলামি সরকার ও শরিয়াহ আইনের প্রতি শক্ত সমর্থকের হার ২০০৪ সালের ৩০ ও ৩৪ শতাংশ থেকে কমে ২০১১ সালে যথাক্রমে ১৫ ও ১৪ শতাংশে নেমে আসে।

রাজনৈতিক সংবেদনশীলতার কারণে সৌদি আরবে সরকারব্যবস্থা-সংক্রান্ত অনেক প্রশ্ন বাদ দেওয়া হলেও অন্যান্য ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তনের চিত্র এসেছে। যেমন শরিয়াহ আইন বাস্তবায়নকে ‘খুব গুরুত্বপূর্ণ’ মনে করা মানুষের হার ২০০৩ সালে ৭৩ শতাংশ থাকলেও ২০১১ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৩৫ শতাংশে।

২০০০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে আমরা মিসরে পাঁচটি, ইরানে তিনটি, ইরাকে সাতটি, সৌদি আরবে দুটি এবং তুরস্কে তিনটি জরিপ পরিচালনা করি। এ ছাড়া ২০১১ সালের পর ইরাকে ‘আরব ব্যারোমিটার’ এবং ২০২০ সালে ইরানে ‘ওয়ার্ল্ড ভ্যালুজ সার্ভে’ পরিচালিত জরিপের নির্দিষ্ট ফলাফলও আমরা বিবেচনায় নিই, যার প্রশ্নগুলো আমাদের জরিপের মতোই ছিল। এই তথ্যগুলো রাজনৈতিক ঘটনাবলি এবং জনমতের মধ্যে এক অবিশ্বাস্য বৈপরীত্য ফুটিয়ে তোলে।

মিসরের উদারনীতি সূচকের স্কোর পুরুষদের মধ্যে ২ দশমিক শূন্য ৯ থেকে বেড়ে ২ দশমিক ২৮ এবং নারীদের মধ্যে ২ দশমিক শূন্য ৮ থেকে বেড়ে ২ দশমিক ৩৯ হয়েছে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা গেছে রাজনীতি থেকে ধর্মকে আলাদা করা এবং পশ্চিমা ধাঁচের শাসনব্যবস্থা গ্রহণের সমর্থনের ক্ষেত্রে।

উত্তরদাতাদের জিজ্ঞেস করা হয়েছিল যে তারা ধর্ম ও রাজনীতিকে আলাদা করলে এবং সরকারব্যবস্থা পশ্চিমা দেশগুলোর মতো হলে মিসর আরও উন্নত হবে—এ বিষয়ে একমত কি না। ধর্ম ও রাজনীতি আলাদা করার পক্ষে সমর্থন ২০০৭ সালের ৪৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০১১ সালে ৫৬ শতাংশ, ২০১৬ সালে ৮২ শতাংশ এবং ২০২০ সালে ৮১ শতাংশে পৌঁছায়। আর পশ্চিমা ধাঁচের শাসনব্যবস্থার প্রতি সমর্থন ২০০৭ সালের ৩০ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২০ সালে অবিশ্বাস্য ৮২ শতাংশে গিয়ে দাঁড়ায়।

এই পরিবর্তনের পেছনের কারণ বুঝতে আমরা ২০১১ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে যাঁদের মতামত বদলেছিল, তাঁদের মধ্য থেকে একটি অংশের সাক্ষাৎকার নিই। যাঁরা তাঁদের আগের উত্তরের কথা মনে করতে পেরেছিলেন, তাঁদের বড় একটি অংশ জানিয়েছেন যে ২০১২ সালের নির্বাচনে জয়ী হওয়া ইসলামি দল ‘মুসলিম ব্রাদারহুড’-এর ওপর মোহভঙ্গের কারণেই তারা রাজনীতি থেকে ধর্মকে আলাদা করার পক্ষপাতী হয়েছেন।

আর যাঁরা পশ্চিমা মডেলের অনুসারী হতে চেয়েছেন, তাঁরা মূলত পশ্চিমা দেশগুলোর অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির কথা উল্লেখ করেছেন এবং আশা প্রকাশ করেছেন যে অনুরূপ ব্যবস্থা গ্রহণ করলে মিসরেও সমৃদ্ধি আসবে। মিসরীয়দের মধ্যে লিঙ্গসমতা ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের প্রতি সমর্থন বাড়লেও তা ছিল কিছুটা ধীরগতির।

তুর্কি জনমতেও উদারনীতির পক্ষে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। ২০১৩ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে তুরস্কের উদারনীতি সূচক পুরুষদের মধ্যে ২ দশমিক ৬৪ থেকে ২ দশমিক ৮৮ এবং নারীদের মধ্যে ২ দশমিক ৭০ থেকে ২ দশমিক ৯১-এ উন্নীত হয়।

মিসর ও তুরস্ক—দুই দেশেই পুরুষদের তুলনায় নারীদের মধ্যে উদারনৈতিক মূল্যবোধ বেশি বিস্তৃত হয়েছে। তবে মিসরে এই পরিবর্তন প্রধানত ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির ক্ষেত্রে দেখা গেলেও তুরস্কে তা ছিল মূলত লিঙ্গসমতা ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের দৃষ্টিভঙ্গিতে।

মজার বিষয় হলো, এরদোয়ান যখন একটি চরম কর্তৃত্ববাদী ও ইসলামপন্থী রাজনৈতিক প্রকল্প বাস্তবায়ন করছিলেন, ঠিক তখনই এই উদারীকরণের ধারা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ২০০৩ সালে জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টির জয়ের পর এরদোয়ানের প্রধানমন্ত্রী হওয়াকে শুরুতে গণতন্ত্রের সঙ্গে ইসলামবাদের সহাবস্থানের প্রতীক হিসেবে স্বাগত জানানো হয়েছিল।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার তোয়াক্কা না করে ক্ষমতার সব প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্য ভেঙে দেন এবং ২০১৭ সালের গণভোটের মাধ্যমে স্বৈরাচারী শাসন শক্ত করেন।

অন্যদিকে এরদোয়ানের শাসনামলে তুর্কিদের মধ্যে নিজস্ব পরিচয়ের ক্ষেত্রে ধর্মের চেয়ে জাতীয় পরিচয় প্রধান হয়ে উঠেছে এবং মসজিদে যাওয়ার প্রবণতা কমেছে। ২০০১ সালে ৬৪ শতাংশ মানুষ নিজেদের প্রাথমিকভাবে ‘মুসলিম’ হিসেবে পরিচয় দিতেন, আর মাত্র ৩৪ শতাংশ নিজেদের ‘তুর্কি নাগরিক’ বলতেন।

২০২০ সালে এসে এটি সম্পূর্ণ উল্টে যায়—মাত্র ২৪ শতাংশ মুসলিম পরিচয়কে প্রাধান্য দেন, যেখানে ৬৩ শতাংশের কাছে তুর্কি নাগরিক পরিচয়টিই প্রধান হয়ে ওঠে। একই সময়ে মসজিদে যাওয়ার হারও কমেছে: সপ্তাহে একাধিকবার মসজিদে যান এমন মানুষের হার ২০০১ সালের ১৯ শতাংশ থেকে কমে ২০২০ সালে মাত্র ১১ শতাংশে নেমে এসেছে।

এরদোয়ান ক্ষমতায় আসার আগেই যেহেতু মসজিদে যাওয়া কমছিল, তাই বলা যায় তার প্রাথমিক জনপ্রিয়তার কারণ ধর্মীয় রক্ষণশীলতা ছিল না, বরং ইস্তাম্বুলের মেয়র হিসেবে তাঁর কাজের রেকর্ড এবং তৎকালীন ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক ব্যবস্থার ওপর মানুষের ক্ষোভ ছিল এর কারণ।

তবে পরে জাতীয় পরিচয়ের দিকে ঝুঁকে পড়া এবং মসজিদে যাওয়া আরও কমে যাওয়ার ঘটনা প্রমাণ করে যে এরদোয়ানের স্বৈরাচারী মনোভাব চলমান উদারীকরণকে আরও বেগবান করেছে।

অর্থনীতি ও মধ্যবিত্তের বিকাশের সঙ্গে উদারনীতিকে মেলানোর প্রথাগত তত্ত্ব দিয়ে এই ভাবাদর্শগত পরিবর্তন পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা যায় না। কারণ, এক যুগে যে শ্রেণি উদারনীতিকে সমর্থন করে, অন্য যুগে তারা চরমপন্থার দিকে ঝুঁকতেই পারে। (যেমন বিংশ শতাব্দীর শুরুতে মিসরের নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণি ‘এফেনদিয়া’ উদারনীতিকে সমর্থন করলেও পরে তারাই ধর্মীয় সংগঠন মুসলিম ব্রাদারহুডকে সমর্থন দিয়েছিল।) মূলত সমাজে বিদ্যমান অন্যান্য শাসক ভাবাদর্শের মুখোমুখি দাঁড়িয়েই নতুন ধারণা জন্ম নেয়।

রাজনীতিতে যখন কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা মতাদর্শ আধিপত্য বিস্তার করে, তখন তা একই সঙ্গে প্রতিবাদের লক্ষ্যে এবং নতুন ধারণার অনুঘটকে পরিণত হয়। স্বৈরাচারী ক্ষমতার বিপরীতেই জন্ম নেয় রাজনৈতিক সমতার আকুতি; ঠিক যেমন পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোর জবাবে ওঠে লিঙ্গসমতার দাবি, সামাজিক বা পারিবারিক শৃঙ্খলের জবাবে আসে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য প্রকাশ এবং পোশাকের কড়াকড়ির প্রতিবাদে জন্ম নেয় পছন্দের পোশাক পরার অধিকার।

সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যে উদারনৈতিক মূল্যবোধের প্রতি এই আগ্রহ—অর্থাৎ রাজনীতি থেকে ধর্মকে আলাদা করার প্রয়োজনীয়তা, ব্যক্তির নিজস্ব বিচারবুদ্ধির স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্র ও সমাজের মূল একক হিসেবে সমষ্টির বদলে ‘ব্যক্তিকে’ প্রাধান্য দেওয়া—মূলত গড়ে উঠেছে ইসলামি মৌলবাদ ও তাদের জোর করে আচরণ নিয়ন্ত্রণের প্রতিক্রিয়া হিসেবে।

সৌদি আরবে নারীদের চলাফেরার ওপর নিষেধাজ্ঞা বা ইরানি নারীদের ওপর পোশাকের কড়াকড়ি এই ধর্মীয় নিয়ন্ত্রণকে খুব নগ্নভাবে সামনে নিয়ে এসেছিল। নির্দিষ্ট এই কড়াকড়ির বিরুদ্ধে প্রতিরোধই পরে একটি ব্যাপক বিশ্বাস গড়ে তোলে যে ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের বিষয়গুলোতে রাজনৈতিক ক্ষমতার হস্তক্ষেপ কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না।

এই চিত্র মিসর ও তুরস্কেও স্পষ্ট, যেখানে মসজিদে যাওয়া কমার সঙ্গে সঙ্গে উদারনৈতিক মূল্যবোধ, বিশেষ করে ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতি সমর্থন বেড়েছে। কিন্তু সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো ইরান ও সৌদি আরব। ২০০০-এর দশকের শুরুতে আমাদের জরিপে এই দুই দেশেই মসজিদে যাওয়ার হার ছিল সর্বনিম্ন (১ থেকে ৪ স্কেলে গড় মান ছিল ১ দশমিক ৮৬)। ইরানে এই হার সময়ের সঙ্গে আরও কমে ২০২০ সালে ১ দশমিক ৭৯-এ দাঁড়ায়।

ধর্মীয় নিপীড়ন ইরানিদের মধ্যে একধরনের ‘প্রতিরোধী উদারনীতি’ জন্ম দিয়েছে। তিন দশকের বেশি সময় ধরে ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে ধারাবাহিক প্রতিবাদের মুখোমুখি হতে হয়েছে: প্রথমে ৯০-এর দশকের সংস্কারবাদী আন্দোলন, তারপর ২০০৯ সালের গ্রিন মুভমেন্ট এবং সম্প্রতি ২০২২ সালে বাধ্যতামূলক হিজাব নীতি লঙ্ঘনের অভিযোগে পুলিশ হেফাজতে মাসা আমিনির মৃত্যুর পর দেশব্যাপী গণবিক্ষোভ।

বাইরের বিশ্বের মানুষ মধ্যপ্রাচ্যকে কীভাবে দেখে, এ পরিবর্তনের ফলে সেই দৃষ্টিভঙ্গি বদলানো জরুরি। বহু দশক ধরে পশ্চিমা বিশ্ব মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিকে কেবল দুটি বিকল্পের মধ্যে দেখেছে—হয় একনায়কতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা, না হয় রাজনৈতিক ইসলাম। কিন্তু এই অঞ্চলের মানুষের মনের আসল প্রতিফলন এখন আর সেই সমীকরণে আটকে নেই।

কঠোর স্বৈরাচারী পরিস্থিতিতে অনেকেই জরিপে নিজেদের আসল মতামত লুকিয়ে থাকেন। তা সত্ত্বেও প্রাপ্ত তথ্য বলছে, গত দুই দশকে ইরানিদের ধর্মীয় রীতিনীতির প্রতি টান নাটকীয়ভাবে কমেছে। সন্তানদের মধ্যে ধর্মীয় বিশ্বাস থাকা উচিত—এমনটা ভাবা মানুষের হার ২০০০ সালে ৭১ শতাংশ থাকলেও ২০২০ সালে তা কমে ৫৫ শতাংশে নেমে এসেছে। একই সঙ্গে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর ‘গভীর আস্থা’ থাকা মানুষের হার ৫৯ থেকে কমে ৩৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

নেদারল্যান্ডসভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ‘গামান’ ২০২২ সালে প্রায় ২০ হাজার ইরানির ওপর একটি জরিপ চালায়। সেখানে দেখা যায়, ৮৮ শতাংশ উত্তরদাতা গণতন্ত্রের পক্ষে মত দিয়েছেন, আর ৬৭ শতাংশই শরিয়াহভিত্তিক সরকারের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।

অন্যদিকে ইরাকে ২০০৩ সালের মার্কিন আক্রমণ একটি সমন্বিত জাতীয়তাবোধ এবং শক্তিশালী ইরাকি পরিচয়ের জন্ম দিয়েছে। জরিপে যখন জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, ‘নিজের পরিচয়ের ক্ষেত্রে নিচের কোনটি আপনার জন্য সবচেয়ে প্রযোজ্য: ১. আমি একজন ইরাকি; ২. আমি একজন মুসলিম; ৩. আমি একজন আরব; ৪. আমি একজন কুর্দি; নাকি ৫. অন্যান্য?’ তখন নিজেদের প্রধানত ‘ইরাকি’ হিসেবে পরিচয় দেওয়া মানুষের হার ২০০৪ সালের ২৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২০ সালে ৬৮ শতাংশে গিয়ে পৌঁছায়।

রাজনীতি ও ধর্ম পৃথক করার পক্ষে ইরাকিদের সমর্থন ২০০৪ সালের ৫৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০০৮ সালে ৭৬ শতাংশ এবং ২০১৮ সালে ৮০ শতাংশে দাঁড়ায়।

যদিও মধ্যপ্রাচ্যের এই শাসনব্যবস্থাগুলোয় এখনো জনমতের এই উদারনৈতিক রূপান্তরের পূর্ণ প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না, তবে নিকট ভবিষ্যতে তা দৃশ্যমান হতে পারে। ইতিহাস তো আসলে ধারণার ওপর ভর করেই হেঁটে চলে।

বিংশ শতাব্দীর শুরুতে মিসর, ইরান ও তুরস্কে আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র গঠনের ভিত্তি কিন্তু তৈরি হয়েছিল তারও কয়েক দশক আগে, ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে উদারনীতি, সংবিধানবাদ, জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতার চর্চার মাধ্যমে। পরে ১৯৫২ থেকে ১৯৬৯ সালের মধ্যে মিসর, ইরাক, লিবিয়া ও সিরিয়ায় আরব জাতীয়তাবাদী সরকারগুলোর উত্থান ঘটেছিল বহু আগে সিরীয় চিন্তাবিদ সাতি আল-হুসরি এবং ফিলিস্তিনি শিক্ষাবিদ দরবিশ আল-মিকদাদির সুনির্দিষ্ট মতাদর্শের ওপর ভিত্তি করে।

আর বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে ইসলামি রাষ্ট্রগুলোর উত্থানও হয়েছিল আগের সেক্যুলার প্রজেক্টগুলোর ব্যর্থতার মধ্য দিয়ে।

সামাজিক মূল্যবোধ কীভাবে রাজনীতিকে বদলে দিতে পারে, মিসর ও ইরাক তার বড় প্রমাণ। মিসরে মুসলিম ব্রাদারহুডের ব্যর্থতা স্বৈরাচারের বিকল্প হিসেবে ‘রাজনৈতিক ইসলাম’-এর আবেদনকে দুর্বল করে দিয়েছে। এর ফলে মানুষ ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতি ও পশ্চিমা মডেলের দিকে ঝুঁকছে, যা বিদ্যমান স্বৈরাচারী ভাবাদর্শকেই সরাসরি নাকচ করে। এই মানসিকতা হয়তো রাতারাতি গণতন্ত্র এনে দেবে না, তবে এটি ভবিষ্যতের একটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ভিত্তি তৈরি করছে।

সাধারণ মানুষের মধ্যে উদারনৈতিক মূল্যবোধ ছড়ালেই যে রাজনৈতিক উদারীকরণ নিশ্চিত হয়ে যাবে, এমনটা বলা যায় না। কিন্তু এ কথাও সত্যি যে এই অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে ছড়ি ঘোরানো পুরোনো রাজনৈতিক বিকল্পগুলো আজ জনগণের কাছে তাদের গ্রহণযোগ্যতা হারিয়ে ফেলেছে।

বাইরের বিশ্বের মানুষ মধ্যপ্রাচ্যকে কীভাবে দেখে, এ পরিবর্তনের ফলে সেই দৃষ্টিভঙ্গি বদলানো জরুরি। বহু দশক ধরে পশ্চিমা বিশ্ব মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিকে কেবল দুটি বিকল্পের মধ্যে দেখেছে—হয় একনায়কতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা, না হয় রাজনৈতিক ইসলাম। কিন্তু এই অঞ্চলের মানুষের মনের আসল প্রতিফলন এখন আর সেই সমীকরণে আটকে নেই।

মনে রাখা দরকার, মধ্যপ্রাচ্যে উদারনৈতিক মূল্যবোধের এই বিকাশকে শুধু পশ্চিমা সংস্কৃতির প্রভাব হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এই নিবন্ধে যে উদারনৈতিক সচেতনতার কথা বলা হয়েছে, তা গড়ে উঠেছে এ অঞ্চলের নিজস্ব তিক্ত অভিজ্ঞতার আলোকেই।

ইউরোপ বা আমেরিকার কিছু অংশে হয়তো আজ উদারনৈতিক গণতন্ত্রের চর্চা কিছুটা ভাটার টানে, কিন্তু গণতন্ত্রের ইতিহাস কিন্তু শেষ হয়ে যায়নি। মধ্যপ্রাচ্য ইতিমধ্যেই আরব জাতীয়তাবাদ, রাষ্ট্রীয় সমাজতন্ত্র, সেক্যুলার স্বৈরাচার, রাজতন্ত্র, সামরিক শাসন এবং রাজনৈতিক ইসলাম—সবকিছুরই স্বাদ গ্রহণ করেছে।

কিন্তু এদের কোনোটিই জবাবদিহি, বৈধ শাসনব্যবস্থা কিংবা অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি দিতে পারেনি।

আসল প্রশ্ন তাই এখন আর এটা নয় যে মধ্যপ্রাচ্য গণতন্ত্রের জন্য প্রস্তুত কি না; বরং প্রশ্ন হলো, এ অঞ্চলের শাসনব্যবস্থাগুলো অধিকার ও স্বাধীনতার পক্ষে থাকা গণদাবির সঙ্গে তাল মেলাতে পারবে কি না।

মনসুর মোয়াদেল ম্যারিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয় সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক এবং ক্র্যাকস ইন ট্র্যাডিশন: লিবারেল ট্রেন্ডস ইন দ্য মিডল ইস্ট বইয়ের রচয়িতা।

ফরেন অ্যাফেয়ার্স থেকে সংক্ষেপে অনূদিত।