নাটোরে অরক্ষিত রেলগেট, রেললাইনের বিভিন্ন ত্রুটি এবং নিয়মিত তদারকির অভাবে প্রায়ই ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটছে। এর ফলে হতাহতের সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি ট্রেনযাত্রী এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক বিরাজ করছে। নিরাপদ যোগাযোগ মাধ্যম হিসেবে রেলব্যবস্থা জনপ্রিয় হলেও এই ধরনের অব্যবস্থাপনার কারণে সাধারণ মানুষের আস্থা দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এক সময়ে নাটোর এলাকায় মোট ৭টি অরক্ষিত রেলগেট ছিল। পরবর্তীতে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে কিছু গেটম্যান নিয়োগ করা হলেও বর্তমানে এখনও দুই-একটি গেট অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, অনেক রেলগেটে কোনো গেটম্যান নেই, এমনকি কিছু জায়গায় কোনো গেটই বসানো হয়নি। এছাড়া রেলগেটের দুই পাশে ঝোপঝাড় ও বড় গাছের আধিক্যের কারণে পারাপারের সময় রিকশা, অটোরিকশা, ভ্যান ও মোটরসাইকেল চালকরা ট্রেনের অবস্থান বুঝতে পারেন না। ফলে অনেক সময় যানবাহন রেললাইনে আটকে যায়, যা মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অন্যদিকে, বড় রেলগেটগুলো দিয়ে ট্রেন অতিক্রম করার সময় গেট বন্ধ থাকায় উভয় পাশে প্রায় আধা কিলোমিটার দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। এতে জরুরি প্রয়োজনেও যাত্রীরা সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছেন না। এছাড়া রেললাইন নিয়মিত তদারকি না করায় স্লিপারের কংক্রিট ভেঙে যাওয়ার মতো গুরুতর ত্রুটি রয়ে গেছে, যা যেকোনো মুহূর্তে বড় দুর্ঘটনার আশঙ্কা বাড়িয়ে দিচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে রেলগেটে স্থায়ী গেটম্যান নিয়োগ, উভয় পাশের ঝোপঝাড় ও গাছপালা অপসারণ, নিয়মিত লাইন পরিদর্শন ও ত্রুটি মেরামত এবং ব্যস্ত রেলগেটগুলোতে ফ্লাইওভার নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
স্থানীয় বাসিন্দা লাল মিয়া, রাকিব হোসেন ও জুয়েল রানা জানান, “রেললাইনের বিভিন্ন স্থানে স্লিপার ভাঙা থাকলেও কর্তৃপক্ষের উদাসীনতার কারণে তা সময়মতো মেরামত করা হয় না। অনেক রেলগেটে গেটম্যান না থাকায় প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে।” তারা দ্রুত লাইন পরিদর্শন, অরক্ষিত গেটে গেটম্যান নিয়োগ এবং ঝুঁকিপূর্ণ স্লিপার সংস্কারের দাবি জানান।
আল আমিন, রিপন সরকার ও রফিকুল ইসলাম জানান, লাইনের দুই পাশে গাছপালার কারণে পারাপারের সময় ট্রেন দেখা যায় না। তারা জানান, “কদিন আগেই মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় তিনজন মারা গেছেন।” তারা রেলগেটের উভয় পাশের অন্তত এক কিলোমিটার এলাকা পর্যন্ত জঙ্গল পরিষ্কার করার দাবি জানান। এছাড়া চালকদের অসচেতনতার কারণে অনেক সময় রেললাইনে গাড়ি আটকে যায় বলে তারা উল্লেখ করেন।
শহীদুল ইসলাম ও রেজাউল করিম জানান, ট্রেন চলাচলের সময় গেট বন্ধ থাকায় দীর্ঘ যানজটে পড়ে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। বিশেষ করে ঢাকা, খুলনা, যশোর ও রাজশাহগামী বিভিন্ন ট্রেন চলাচলের সময় এই যানজট তীব্র আকার ধারণ করে। এই দুর্ভোগ থেকে মুক্তি পেতে ব্যস্ত রেলগেটগুলোতে ফ্লাইওভার বা আন্ডারপাস নির্মাণের দাবি জানান তারা।
ভ্যানচালক শফিকুল ইসলাম জানান, ভাঙা রাস্তার কারণে অনেক সময় ভ্যান রেললাইনের ওপরে গিয়ে আটকে যায়, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়।
নাটোর রেল স্টেশনের অবসরপ্রাপ্ত সহকারী স্টেশন মাস্টার অশোক চক্রবর্তী জানান, অরক্ষিত ও ছোট রাস্তাগুলোতে ঝোপঝাড়ের কারণে ট্রেন দেখতে না পেয়ে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে। কর্তৃপক্ষ এসব জঙ্গল পরিষ্কার করলে দুর্ঘটনা অনেকাংশেই কমে যাবে। এছাড়া নাটোর থেকে ঢাকা রুটে বড় রেলগেটগুলোতে সৃষ্ট যানজট নিরসনে ফ্লাইওভার বা আন্ডারপাস নির্মাণ করা জরুরি। তিনি আরও জানান, লোকবল সংকটের কারণেও অনেক সময় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
এই বিষয়ে কথা বলতে নাটোর রেলওয়ে স্টেশনের দায়িত্বে থাকা স্টেশন মাস্টার রেজাউল করিমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে বক্তব্য দিতে রাজি হননি।