মাটির পাখি, মাটির গাছপালা আর মাটির মানুষ—কেবলমাত্র মাটি ব্যবহার করেই এক মনোমুগ্ধকর শিল্পের জগৎ ফুটিয়ে তুলেছেন শিল্পী রেহানা ইয়াসমিন। তার এই দৃষ্টিনন্দন মৃন্ময় শিল্পসম্ভার প্রদর্শিত হচ্ছে ২/৬ লালমাটিয়ার দ্য ইলুশনস গ্যালারিতে। সমকালীন চিত্রশালা শিল্পাঙ্গনের উদ্যোগে ‘মাটির মায়া’ শীর্ষক এই ব্যতিক্রমী শিল্পকর্ম প্রদর্শনীটি ১২ দিনব্যাপী আয়োজিত হয়েছে।

এই প্রদর্শনীতে মোট ৪০টি শিল্পকর্ম স্থান পেয়েছে, যার প্রতিটিই পোড়া মাটির তৈরি। শিল্পকলার ভাষায় একে ‘টেরাকোটা’ বলা হয়। তবে প্রচলিত টেরাকোটার সাথে এই কাজগুলোর একটি মৌলিক ও বড় পার্থক্য রয়েছে। সাধারণত টেরাকোটা হয় দ্বিমাত্রিক, যেখানে মাটির ফলকের ওপর খোদাই করে বা ছাঁচের মাধ্যমে রিলিফ পদ্ধতিতে নকশা বা অলংকরণ করা হয় এবং পরবর্তীতে তা আগুনে পোড়ানো হয়। কিন্তু রেহানা ইয়াসমিনের সৃষ্টিগুলো প্রধানত ত্রিমাত্রিক। তিনি ভাস্কর্য তৈরির প্রক্রিয়ায় কাদামাটি দিয়ে এই শিল্পকর্মগুলো নির্মাণ করেছেন এবং এরপর বিশেষ পদ্ধতিতে তা পোড়ানো হয়েছে। এই কৌশলের কারণে কাজগুলো ভাস্কর্যের গুণাবলি লাভ করেছে।

গত ২০ অক্টোবর সন্ধ্যায় বরেণ্য চিত্রশিল্পী ও ইমেরিটাস অধ্যাপক রফিকুন নবী এই প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট শিল্পী কনকচাঁপা চাকমা। প্রদর্শনীটি চলবে আগামী ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত। প্রতিদিন বেলা ৩টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত সাধারণ দর্শকদের জন্য এটি খোলা থাকবে।

প্রদর্শনীর কাজগুলো পর্যবেক্ষণ করে শিল্পী রফিকুন নবী বলেন, “কাদামাটি দিয়ে এ ধরনের কাজ করা বেশ পরিশ্রমসাধ্য। একই সঙ্গে অনেক ধৈর্য ও মনোনিবেশেরও প্রয়োজন। রেহানা ইয়াসমিনের কাজে সৃজনশীলতার পাশাপাশি দক্ষতা ও করণকৌশলের চমৎকার সমন্বয় ঘটেছে। বিষয়বস্তু হিসেবে তিনি প্রকৃতি, মানুষের জীবনযাত্রা ও বিভিন্ন ধরনের পাখি বেছে নিয়েছেন। বিষয়বস্তুর কম্পোজিশনে নিজস্ব ধরন রয়েছে। কাজগুলো দর্শকদের মুগ্ধ করবে।”

দর্শকরা এই প্রদর্শনীতে দৈনন্দিন জীবনের অনেক চেনা দৃশ্য খুঁজে পাবেন। যেমন—গাছের ডালে কিংবা দালানের কার্নিশে বসে থাকা কাক, কিংবা বিভিন্ন অবস্থানে থাকা পায়রা। কোনো পায়রা তাদের খোপে, কোনোটি গাছের গুঁড়ির পাশে অথবা পুরোনো দালানের জানালার পাশে বসে আছে। এছাড়া শালিক ও প্যাঁচার অবয়বও এখানে স্থান পেয়েছে। শিল্পী অত্যন্ত নিপুণভাবে এসব পাখির শারীরিক ভঙ্গি এবং তাদের চারপাশের পরিবেশ ফুটিয়ে তুলেছেন। পাশাপাশি ছাগল নিয়ে একটি ছোট সিরিজ তৈরি করেছেন তিনি, যেখানে কসাইখানায় বাঁধা ছাগল, ছাগল নিয়ে ঘরে ফেরা নারী কিংবা বাড়ির উঠানে বসে থাকা ছাগলের দৃশ্য দেখা যায়।

মানুষের জীবন ও পেশাকে কেন্দ্র করেও শিল্পী ভিন্নধর্মী কাজ করেছেন। প্রদর্শনীতে দেখা যাবে একতারা-দোতারা বাজিয়ে গান করা বাউল শিল্পীদের। পাহাড়ি জনপদের এক নারীর ক্লান্ত ভঙ্গিতে গাছের তলায় বিশ্রাম নেওয়ার দৃশ্য রয়েছে। এছাড়া জুমের ফসল নিয়ে ঘরে ফেরা এবং সন্তান কোলে নিয়ে পাহাড়ি পথ চলার দৃশ্যগুলো দর্শকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে। পাশাপাশি দোলনায় দোল খাওয়া যুগল, কিছু অলংকৃত মৃৎপাত্র এবং প্রাচীন দরদালানের অংশবিশেষ প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছে।

প্রদর্শনীর শিল্পকর্মগুলো দেখে শিল্পসমালোচক মঈনুদ্দিন খালেদ মুক্তকণ্ঠকে বললেন, “রেহানা ইয়াসমিনের এই প্রদর্শনীতে বাংলাদেশের পরিচয়টি উঠে এসেছে। প্রকৃতি, মানুষের গৃহস্থালি, চারপাশের পশুপাখি—সব চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেন তিনি। আগুনের তাপে কাদামাটি শুকিয়ে লালচে হয়ে ওঠা, কোথাও কোথাও ধোঁয়া লেগে কালচে ছোপ লাগা আমাদের প্রাচীন পৃথিবীর কথা মনে করিয়ে দেয়। এই কাজগুলো সাধারণ টেরাকোটার বৈশিষ্ট্যকে ছাপিয়ে স্বতন্ত্র ধারার ভাস্কর্যের গুণ অর্জন করেছে। একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের জীবনযাত্রার ও তাদের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের বিষয়টি আছে। ফলে প্রত্নবিদ্যা ও নৃবিদ্যার দৃষ্টিকোণ থেকে এই শিল্পকর্মগুলো দেখলে এর নান্দনিকতা ও স্বরূপ উপলব্ধি করা সহজ হবে।”

উল্লেখ্য যে, এটি শিল্পী রেহানা ইয়াসমিনের প্রথম একক শিল্পকর্ম প্রদর্শনী। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের সিরামিক বিভাগ থেকে এমএফএ ডিগ্রি অর্জন করেছেন। এর আগে তিনি দেশে ও বিদেশে বিভিন্ন দলবদ্ধ প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করেছেন। এছাড়া ২০১৬ সাল থেকে তিনি নারী শিল্পীদের সংগঠন ‘কালারর্স অব থার্টিন’-এর অন্যতম সংগঠক হিসেবে প্রতিবছর নিয়মিত যৌথ শিল্পী প্রদর্শনীর আয়োজন করে আসছেন।

সামগ্রিকভাবে, রেহানা ইয়াসমিনের ‘মাটির মায়া’ প্রদর্শনীতে দর্শকরা বাংলার প্রকৃতি, মানুষ ও লোকজ জীবনের এক নান্দনিক ভাষ্য খুঁজে পাবেন। পরিচিত পশুপাখি, সাধারণ মানুষের জীবনযাপন এবং চেনা পরিবেশকে ত্রিমাত্রিক রূপ দিয়ে পোড়া মাটির শিল্পে তিনি এক স্বতন্ত্র মাত্রা যোগ করেছেন।