তরুণ প্রজন্মের উদ্যোক্তাদের হাত ধরেই বর্তমানে গড়ে উঠছে নতুন নতুন ব্যবসা ও সম্ভাবনার গল্প। তবে একটি উদ্যোগ শুরু করা থেকে শুরু করে সেটিকে দীর্ঘমেয়াদে টিকিয়ে রাখা এবং সাফল্যের সাথে এগিয়ে নেওয়ার পথ মোটেও সহজ নয়। নানা চ্যালেঞ্জ, কঠিন সিদ্ধান্ত এবং অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা কীভাবে তাঁদের স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলছেন—সেই সব অনুপ্রেরণামূলক গল্প নিয়েই মুক্তকণ্ঠ ডটকম ও প্রাইম ব্যাংকের যৌথ উদ্যোগে বিশেষ পডকাস্ট শো ‘লিগ্যাসি উইথ এমআরএইচ: সিজন–৩’। এই বিশেষ পর্বের সঞ্চালনায় ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ রিদওয়ানুল হক এবং অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ফ্যাশন ডিজাইনার ও উদ্যোক্তা সাফিয়া সাথী।
পডকাস্টে অংশ নিয়ে সাফিয়া সাথী বলেন, “বাংলাদেশ মানেই শুধু নির্দিষ্ট কিছু ঐতিহ্যবাহী কাপড়—এভাবে ভাবলে চলবে না। দৈনন্দিন ব্যবহারের আধুনিক পোশাকেও আমাদের কাপড় ব্যবহার করা সম্ভব। আন্তর্জাতিক বাজারে আমাদের কাপড়ের উপস্থিতি আছে; কিন্তু নকশা, পোশাক তৈরির ধরন ও বিশ্বব্যাপী প্রচারের ঘাটতির কারণে আমরা অনেক ক্ষেত্রে বড় ব্র্যান্ড হয়ে উঠতে পারিনি।” গত শনিবার মুক্তকণ্ঠের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোতে এই পর্বটি প্রচারিত হয়।
অনুষ্ঠানের শুরুতেই সঞ্চালক জানতে চান, পরিবারের প্রত্যাশা এবং নিজের ব্যক্তিগত স্বপ্নের মধ্যে সাফিয়া সাথী কীভাবে সমন্বয় ঘটিয়েছেন। এর উত্তরে তিনি বলেন, “আমার বাবা চাইতেন তাঁর সন্তানদের অন্তত একজন আইনজীবী বা ব্যারিস্টার হোক। তাঁকে খুশি করার জন্য কেউ জিজ্ঞেস করলে বলতাম, বড় হয়ে ব্যারিস্টার হতে চাই। কিন্তু মন থেকে আমার আগ্রহ ছিল ফ্যাশন ডিজাইনের প্রতি। বাবাকে না দেখিয়ে লুকিয়ে সেলাই করতাম। বাবা ফ্যাশন ডিজাইনকে তখন খুব সম্ভাবনাময় পেশা হিসেবে দেখতেন না। তবে তিনি চাইতেন, তাঁর মেয়েরা আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হোক। আমি নিজের আগ্রহটা ধরে রেখেছিলাম এবং অবসর সময়ে এ নিয়েই কাজ করতাম।”
সাফিয়া সাথীর ফ্যাশন ডিজাইনিংয়ে পড়ার তীব্র ইচ্ছা থাকলেও তিনি অন্য একটি বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন। এই প্রসঙ্গে সঞ্চালক জানতে চান, সেই সময়ে তিনি কীভাবে নিজের আগ্রহকে ধরে রেখেছিলেন। সাফিয়া সাথী জানান, “আমার ইচ্ছা ছিল ফ্যাশন ডিজাইনিংয়ে পড়ার। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্য বিষয়ে পড়াশোনা শুরু করি। তখন মনে হতো, নিজের প্যাশন থেকে দূরে সরে যাচ্ছি। তবে ফ্যাশনের প্রতি আগ্রহটা কখনো হারিয়ে ফেলিনি। ক্লাসের বাইরে অবসর সময়টুকু পুরোপুরি এ কাজে দিতাম। সেই সময়ই নিজের অনলাইন পেজ শুরু করি। আমার কাছে এটা একধরনের ভালো নেশার মতো ছিল।”
সঞ্চালক এরপর তাঁর শৈশব নিয়ে প্রশ্ন করেন। টাঙ্গাইলে বেড়ে ওঠা এবং তাঁতের শাড়ির জন্য বিখ্যাত এই এলাকার পরিবেশ তাঁর নকশার ভাবনায় কতটা প্রভাব ফেলেছে, তা জানতে চাওয়া হয়। সাফিয়া সাথী বলেন, “সেটা অনেক প্রভাব তো ফেলেছেই। তবে আমাদের পরিবারেও সৃজনশীলতার চর্চা ছিল। আমার বড় ভাইয়েরা ছবি আঁকতেন, ছোটবেলায় আমিও ছবি আঁকতাম। তাঁতের শাড়ির রঙের সমন্বয়, কাপড়ের বুনন ও টেক্সচার আমাকে অনেক অনুপ্রাণিত করে।” তিনি আরও যোগ করেন, “ছোটবেলায় মা যখন তাঁতের শাড়ি কিনতেন, তখন শাড়িগুলোর ভাঁজ খোলা এবং একেকটি নকশা বেরিয়ে আসা দেখার মধ্যে অন্য রকম আনন্দ পেতাম। এখন বুঝতে পারি, ছোটবেলা থেকেই যেকোনো ধরনের কাপড়ের প্রতি আমার আলাদা আকর্ষণ ছিল।”
সোশ্যাল মিডিয়ায় ডিজাইন প্রকাশের পর সেগুলো দ্রুত নকল হয়ে যাওয়ার চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমি যখন বিভিন্ন জায়গায় ব্লক দিয়ে কাজ করাতাম, তখন আমার ডিজাইনের যেসব উপাদান সহজে নকল করা সম্ভব, সেগুলো দ্রুত কপি হয়ে যেত। হয়তো একটি ডিজাইনের নমুনা তৈরি করে সোশ্যাল মিডিয়াতে প্রকাশ করেছি, পরের সপ্তাহেই দেখতাম সেটি অন্যরা নকল করে বাজারে নিয়ে এসেছে। এ ধরনের পরিস্থিতি ব্যবসার জন্য কঠিন ছিল। পরে আমি বুঝতে পারি, এমন কিছু নিয়ে কাজ করতে হবে, যেখানে নকশার পাশাপাশি কাজের সূক্ষ্মতা, কারিগরি দক্ষতা ও নিজস্বতা গুরুত্বপূর্ণ।”
বর্তমানে তিনি নিজস্ব ডিজাইনে বিয়ের পোশাক বা ব্রাইডাল ফ্যাশন নিয়ে কাজ করছেন। এই বিশেষ ক্ষেত্রটি বেছে নেওয়ার পেছনে তাঁর ভাবনা সম্পর্কে তিনি বলেন, “আমি চেয়েছি বাংলাদেশের মানুষ যেন বিশেষ অনুষ্ঠান বা বিয়ের পোশাক কেনার জন্য অন্য দেশে যেতে বাধ্য না হন। আমাদের দেশেই দক্ষ কারিগর আছেন, ভালো কাপড় আছে এবং নকশা তৈরির সম্ভাবনাও অনেক। এসবকে কাজে লাগিয়ে এমন পোশাক তৈরি করা সম্ভব, যেগুলো মানুষ বিশেষ দিনে পরতে চাইবেন। আমার লক্ষ্য ছিল দেশীয় উপকরণ ও কারিগরি দক্ষতা দিয়ে স্বতন্ত্র কিছু তৈরি করা।”
ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে অর্থায়ন এবং টিকে থাকার লড়াইয়ের কথা উল্লেখ করে সাফিয়া সাথী বলেন, “শুরু থেকেই ব্যবসাটা নিজের সামর্থ্যের মধ্যে পরিচালনা করার চেষ্টা করেছি। ব্যাংকঋণ পাওয়াও সহজ ছিল না। অনেক সময় একজন ম্যানেজার নিয়োগের পেছনে যে অর্থ ব্যয় হতো, সেই টাকা একজন কারিগরের কাজে দিতে বেশি গুরুত্ব দিয়েছি। আমার কাছে শুধু মুনাফা নয়, কাজের মান ও ব্যবসাটিকে টেকসইভাবে এগিয়ে নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। তাই কোথায় বিনিয়োগ করলে কাজের মান বাড়বে, সেটি ভেবেই সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”
তাঁতের শাড়ি প্রস্তুতকারক এবং কারিগরদের পাশে দাঁড়ানোর বিষয়ে সঞ্চালকের প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, “টাঙ্গাইলে গিয়ে তাঁতিদের জীবনযাপন দেখলে তাঁদের জন্য আরও কিছু করার ইচ্ছা হয়। আমার পক্ষে যতটুকু সম্ভব, তাঁদের কাছ থেকে সরাসরি বেশি পণ্য অর্ডার করার চেষ্টা করি, যাতে তাঁদের ব্যবসা সচল থাকে। কাজ শেষ হওয়ার আগেই আমি সাধারণত ৮০ শতাংশ অর্থ দিয়ে দিই। কারও বিল আটকে রেখে পণ্য নেওয়ার চেষ্টা করি না। আমার কাছে কারিগরদের ন্যায্য মূল্য দেওয়া এবং তাঁদের কাজের প্রতি সম্মান দেখানো খুব গুরুত্বপূর্ণ।”
আড্ডার শেষ পর্যায়ে একটি ব্র্যান্ডের দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের জন্য পরবর্তী প্রজন্মের কাছে জ্ঞান হস্তান্তরের গুরুত্ব নিয়ে কথা হয়। ভবিষ্যতে নিজের নামের বাইরে প্রতিষ্ঠানটিকে কীভাবে এগিয়ে নিতে চান, সে বিষয়ে সাফিয়া সাথী বলেন, “আমার পরিকল্পনা হলো, ব্র্যান্ডটি আমার নামে থাকলেও এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করা, যাতে পরবর্তী প্রজন্ম বা আমার দলের সদস্যরা কাজগুলো এগিয়ে নিতে পারেন। আমাদের অনেক নকশা আছে, যেগুলো সময় পেরিয়েও প্রাসঙ্গিক থাকবে। সেগুলোর যথাযথ নথি তৈরি করা দরকার, যাতে ভবিষ্যতেও সেগুলো নিয়ে কাজ করা যায়। এ জন্য আমার একটি একাডেমি খোলার পরিকল্পনা আছে। পাশাপাশি কারিগর ও কর্মীদের দল আরও বড় করতে চাই, যেন আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারি।”