সুন্দরবনের নদী ও খালে বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকারের প্রবণতা থামছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। বন বিভাগের পক্ষ থেকে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে, জেলেদের আটক করা হচ্ছে এবং বিষ ও নিষিদ্ধ জাল জব্দ করে মামলা করা হলেও বিভিন্ন এলাকায় এই অসাধু কর্মকাণ্ডের খবর পাওয়া যাচ্ছে। পরিবেশ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ আশঙ্কা করছেন, এতে কেবল মাছ নয়, অন্যান্য জলজ প্রাণীরও ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে এবং দীর্ঘমেয়াদে সুন্দরবনের জলজ বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে। একই সঙ্গে এই বিষাক্ত মাছ মানুষের খাদ্যতালিকায় প্রবেশ করলে জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বন বিভাগ সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, গত ২৮ সেপ্টেম্বর সকালে খুলনা রেঞ্জের নলিয়ান স্টেশনের আওতাধীন মার্কি খালে একটি অভিযান চালানো হয়। সেখানে বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকারের অভিযোগে চার জেলেকে আটক করা হয়। আটককৃতরা হলেন রফিকুল ইসলাম (৫২), আয়ুব আলী গাজী (৫৫), দিদারুল গাজী (৩০) ও হামিদ গাজী। অভিযানের সময় তাদের কাছ থেকে বিষ প্রয়োগ করে ধরা ৮০ কেজি চিংড়ি জব্দ করা হয়।
এরপর ১৪ অক্টোবর পশ্চিম সুন্দরবনের ভোমরখালী অভয়ারণ্য এলাকায় বন বিভাগ পুনরায় অভিযান চালায় এবং আরও চার জেলেকে আটক করে। তারা হলেন কয়রার ৫ নম্বর কয়রা গ্রামের আবুল বাসার গাজী (৩৫), মো. হাবিবুল্লাহ হোসেন (৩০), রবিউল ইসলাম (৩৫) ও হামিদ সানা (৪৫)। এই অভিযানে তাঁদের কাছ থেকে চার বোতল বিষ, নিষিদ্ধ ভেসালি ও ঘন ফাঁসের চরপাতা জাল, একটি ডিঙি নৌকা, দা, কুড়াল এবং প্রায় ২০০ কেজি চিংড়ি জব্দ করা হয়।
বন বিভাগের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত তিন মাসে সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগে বিষ প্রয়োগ করে মাছ ধরার অভিযোগে মোট ৩৪টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এসব মামলায় ৩৭ জনকে আসামি করা হয়েছে, যাদের মধ্যে ২৫ জনকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে। এই সময়ে মোট ৫৯টি বিষের বোতল, বিষ প্রয়োগ করে ধরা ১৬৭ কেজি চিংড়ি ও ১০০ কেজি অন্যান্য মাছ জব্দ করা হয়েছে। এছাড়া বন বিভাগ ৮৯টি নৌকা ও ৭০টি অবৈধ মাছ ধরার জাল জব্দ করেছে।
অভিযোগ রয়েছে যে, সুন্দরবনের পূর্ব ও পশ্চিম বিভাগের বিভিন্ন নদী-খালে ‘রিপকর্ড’ নামের একটি কীটনাশক প্রয়োগ করে চিংড়ি শিকার করা হচ্ছে। পাশাপাশি ঘন ফাঁসের চরপাতা ও নিষিদ্ধ ভেসালি জাল ব্যবহার করে নির্বিচারে ছোট মাছ ধরা হচ্ছে। ছিচখালি, বুন্দ, কেওড়াসুতি, হংসরাজ, দুধমুখ, দোবেকি, পাটকোষ্টা, চালকি, মার্কি, আন্দারমানিক, শাপখালি, বাটলু, নোটাবেকি ও কাটেশ্বর এলাকার নদী-খালে এ ধরনের কর্মকাণ্ডের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এছাড়া পশুর নদী, জয়মনি, কচিখালি, হড্ডা, মার্কি, নীলকমল, শাপখালি, বজবজা, আন্দারমানিক ও খাসিটানা এলাকাতেও বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকারের অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সবগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
নলিয়ান ফরেস্ট স্টেশনের কর্মকর্তা ও ফরেস্ট রেঞ্জার আলামিন হোসেন বলেন, “অভিযানে বিষ, নিষিদ্ধ জাল ও মাছ শিকারে ব্যবহৃত বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে।”
পশ্চিম সুন্দরবনের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এজেডএম হাসানুর রহমান জানান, বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকার বন্ধে বন বিভাগের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তিনি বলেন, “গত জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত তিন মাসে এ ধরনের অভিযোগে ৩৪টি মামলায় ৩৭ জনকে আসামি করা হয়েছে। পাশাপাশি বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকারের কারণে সুন্দরবনের কী ক্ষতি হচ্ছে এবং ওই মাছ খেলে মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর কী প্রভাব পড়তে পারে, সে বিষয়ে জেলেদের সচেতন করতে কর্মশালার আয়োজন করা হচ্ছে।”
সুন্দরবন অ্যাকাডেমির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আনোয়ারুল কাদির মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “বিষ প্রয়োগ করে মাছ ধরলে শুধু লক্ষ্যবস্তু মাছ নয়, অন্যান্য জলজ প্রাণীও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিষাক্ত পদার্থ পানিতে ছড়িয়ে পড়লে জলজ বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে। দূষিত মাছ খাদ্য হিসেবে গ্রহণের মাধ্যমে মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।”
তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন, সুন্দরবনে ব্যবহৃত বিষের রাসায়নিক উপাদান, পানিতে এর স্থায়িত্ব এবং জীববৈচিত্র্য ও মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর প্রকৃত প্রভাব নির্ধারণ করতে হলে বিস্তারিত বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা প্রয়োজন।
উপকূলের বহু জেলের জীবিকা সুন্দরবনের নদী-খালের মাছের ওপর নির্ভরশীল। ফলে বিষপ্রয়োগ করে মাছ শিকার অব্যাহত থাকলে তা মৎস্যসম্পদের পাশাপাশি বননির্ভর মানুষের জীবন-জীবিকাকেও ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। এই পরিস্থিতিতে নিয়মিত নজরদারি ও অভিযান জোরদার করার পাশাপাশি জব্দ করা বিষের রাসায়নিক পরীক্ষা, জলজ পরিবেশের ওপর এর প্রভাব মূল্যায়ন এবং জেলেদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি বলে মনে করেন অধ্যাপক আনোয়ারুল কাদির। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইন অনুযায়ী বিচার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।