শীতের কনকনে ঠান্ডা আর কুয়াশাভেজা সকাল পেরিয়ে প্রকৃতিতে ধীরে ধীরে চলে আসে বসন্ত। বসন্তের ছোঁয়ায় গাছে গাছে নতুন পাতা, মিষ্টি রোদ আর চারপাশের সজীবতা আমাদের মনকে নিমিষেই ভালো করে দেয়। শীত থেকে বসন্তে ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে কেবল আবহাওয়াই বদলায় না, বরং আপনার শরীরেও কিছু পরিবর্তন আসতে পারে।

ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের শরীর ও মনেও অদ্ভুত সব পরিবর্তন ঘটে। শীত থেকে বসন্তে পা রাখলে আমাদের শরীর ভেতর থেকে কীভাবে বদলে যায় এবং এই সময় কীভাবে নিজের যত্ন নেওয়া উচিত সেসব বিষয়ে জেনে নিন-

মন মেজাজ ও এনার্জিতে পরিবর্তন আসে

শীতকালে দিন ছোট থাকে আর রোদও পাওয়া যায় কম। এর ফলে অনেকেরই মন সবসময় একটু বিষণ্ণ হয়ে থাকে। কাজে কোনো এনার্জি পাওয়া যায় না। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘সিজনাল অ্যাফেক্টিভ ডিসঅর্ডার’ বা সংক্ষেপে স্যাড।

কিন্তু বসন্ত আসার পর যখন দিন বড় হতে শুরু করে আর চারদিক আলো ঝলমলে হয়ে ওঠে তখন আমাদের মন-মেজাজ ফুরফুরে হয়ে যায়। বসন্তকালে পর্যাপ্ত রোদ পাওয়া যায়, তখন আমাদের শরীর বেশি পরিমাণে ভিটামিন ডি তৈরি করতে পারে। এটি আমাদের মস্তিষ্কে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। ফলে মন ফুরফুরে হয়ে ওঠে, ক্লান্তি ভাব দূর হয় আর শরীরে নতুন এক প্রাণশক্তি চলে আসে।

ঘুমের অভ্যাসে পরিবর্তন আসে

শীতের দিনে আমরা সাধারণত বেশিক্ষণ ঘুমাতে পছন্দ করি। এসময় আমাদের শরীর একটু অলস থাকে। কম্বল মুড়িয়ে আরাম করে সারাদিন শুয়ে থাকতেই ভালো লাগে।

কিন্তু বসন্তের দিনগুলোতে আমাদের শরীরের বায়োলজিক্যাল ক্লক বা সার্কাডিয়ান রিদম নতুন করে রিসেট হতে শুরু করে। অনেক সময় রাতে ঘুমাতে একটু দেরি হতে পারে। তবে দিনের বেলায় ঠিকমতো রোদ গায়ে লাগাতে পারলে ঘুমের মান ও স্বস্তি অনেকটাই বেড়ে যায়। সারাদিন চাঙা থেকে রাতে ভালো ঘুম হতে পারে।

খাবারে রুচি ও পছন্দ বদলায়

শীতকালে শরীর নিজেকে গরম রাখার জন্য ভারী ও বেশি ক্যালরিযুক্ত খাবার পছন্দ করে। কিন্তু বসন্ত আসলেই শরীরে অন্য রকম এক পরিবর্তন শুরু হয়। তখন আর ভারী খাবার খেতে ভালো লাগে না। তাজা ফলমূল, শাকসবজি আর হালকা খাবার খেতেই তখন ভালো লাগে। এ ছাড়া শরীরে পানির চাহিদাও বেড়ে যায়। ফলে বেশি বেশি পানি বা তরল খাবার খেতে ইচ্ছে করে।

ত্বকের যত্নে নতুন রুটিন

শীতের শুষ্ক বাতাসে আমাদের ত্বক খসখসে ও নিষ্প্রাণ হয়ে পড়ে। বসন্ত আসার সঙ্গে সঙ্গে বাতাসে আর্দ্রতা বৃদ্ধি পায়, যা ত্বককে আর্দ্র রাখতে সাহায্য করে। ত্বকের আর্দ্রতা ধরে রাখার ভারী ক্রিমের পরিবর্তে ত্বকের জন্য তখন হালকা ময়েশ্চারাইজার দরকার হয়। এসময় ত্বক আরও কোমল মনে হয় আর টানটান ভাবও কমে যেতে পারে।

তবে আবহাওয়া পরিবর্তনের কারণে অনেকের ত্বকে কিছুটা সংবেদনশীলতা বা র‍্যাশের সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই ত্বকের প্রতি একটু যত্নশীল থাকা দরকার।

অ্যালার্জির সমস্যা হঠাৎ বেড়ে যেতে পারে

যাদের একটু অ্যালার্জি আছে, তাদের জন্য বসন্তকাল বেশ ঝামেলার হতে পারে। এসময় গাছপালা, ঘাস এবং ফুল থেকে পরাগরেণু বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে ঘন ঘন হাঁচি, নাক বন্ধ থাকা, চোখ চুলকানো বা সর্দি-কাশির মতো সমস্যা দেখা দেয়। ঋতু বদল অনেক সময় আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ওপরও কিছুটা চাপ সৃষ্টি করে।

শরীরকে সুস্থ রাখতে আপনার করণীয় কী?

ঋতু বদলের এই সময়ে শরীরের সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলা খুব কঠিন কিছু না। একটু সচেতন হলেই নিজেকে সুস্থ ও সতেজ রাখা সম্ভব।

খোলা বাতাসে সময় কাটান: সকালের মিষ্টি রোদে কিছুটা সময় হাঁটাহাঁটি করুন। এটি আপনার ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি পূরণের পাশাপাশি মন ভালো রাখতে বেশ ভালো কাজ করবে।

হাইড্রেটেড থাকুন: শীতের তুলনায় বসন্তে পানির চাহিদা বাড়ে। তাই সারাদিন পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি, ডাবের পানি বা ফলের রস পন করতে পারেন।

ফ্রেশ ও পুষ্টিকর খাবার খান: শীতের ভারী খাবার বাদ দিয়ে পাতে রাখুন তাজা শাকসবজি, ফলমূল এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্টসমৃদ্ধ খাবার। এটি আপনার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করবে।

অ্যালার্জি থেকে সাবধানে থাকুন: যাদের পরাগরেণু বা ধুলোবালিতে অ্যালার্জি আছে, তারা বাইরে বের হলে মাস্ক ব্যবহার করতে পারেন। ঘরের জানালা বন্ধ রেখেও কিছুটা রক্ষা পাওয়া যেতে পারে।

নিয়মিত হালকা ব্যায়াম: ঘর থেকে বেরিয়ে একটু হালকা এক্সারসাইজ বা সাইক্লিং শুরু করতে পারেন। এটি মেটাবলিজম বাড়িয়ে শরীরকে চাঙা রাখবে।

শীতের জড়তা কাটিয়ে বসন্ত আমাদের জীবনে যেমন নতুন রঙের ছোঁয়া আনে। এর পাশাপাশি আমাদের শরীরকেও মানিয়ে নেওয়ার সুযোগ দেয়। নিজের শরীরের ছোটোখাটো পরিবর্তনের বিষয়টি মাথায় রেখে প্রতিদিনের জীবনে পরিবর্তন আনতে পারেন।

সূত্র: ভেরি ওয়েল হেলথ