সন্তানের অন্তরে ধর্মীয় মূল্যবোধ ও নৈতিকতার বীজ বপন করা প্রতিটি মুসলিম অভিভাবকের একটি পবিত্র দায়িত্ব। তবে এই বীজ কোথায় এবং কীভাবে বপন করা হচ্ছে, তার ওপরই নির্ভর করে ভবিষ্যৎ মহিরুহটি কেমন হবে। সন্তানের জন্য কোনো ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্বাচনের বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল। অনেক সময় আবেগতাড়িত হয়ে জোরজবরদস্তির মাধ্যমে সন্তানকে ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত করার চেষ্টা হিতে বিপরীত হয়ে দাঁড়ায়।

কার কাছ থেকে ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণ করা হচ্ছে, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাবেয়ি মুহাম্মদ ইবনে সিরিন (রহ.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই এই ইলমই হলো ধর্ম; সুতরাং তোমরা লক্ষ করো, কার কাছ থেকে তোমরা তোমাদের ধর্ম গ্রহণ করছ।’ (সহিহ মুসলিম, মুকাদ্দিমা, ১/ ১৪, দারুল ইহইয়ায়িত তুরাস আল-আরাবি, বৈরুত, ১৯৭২)

সন্তানের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাছাইয়ের ক্ষেত্রে একটি প্রায়োগিক নির্দেশিকা নিচে তুলে ধরা হলো। অভিভাবকের প্রধান দায়িত্ব হলো সন্তানের জন্য এমন একজন ধার্মিক ও প্রজ্ঞাবান শিক্ষক নির্বাচন করা, যিনি শুধু কিতাবই পড়াবেন না, বরং নিজের সুন্দর চরিত্রের মাধ্যমে সন্তানকে প্রভাবিত করবেন।

১. আনন্দদায়ক ও মমতাময়ী পরিবেশ: বিশেষ করে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু, যারা সবেমাত্র প্রাক-প্রাথমিক ধাপে পা রেখেছে, তাদের জন্য পড়াশোনার চেয়ে আনন্দটাই মুখ্য। ছোট শিশুদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে খেলার ছলে শেখানোর ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। শিক্ষকের মমতা ও আনন্দদায়ক পরিবেশেই কেবল শিশু কোরআন ও সুন্নাহর প্রতি ভালোবাসা অনুভব করতে পারে। রাসুল (সা.) নির্দেশ দিয়েছেন, ‘তোমরা সহজ করো, কঠিন কোরো না; সুসংবাদ দাও, দূরে সরিয়ে দিয়ো না।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৯)

২. শিক্ষকের মানসিকতা: প্রতিষ্ঠানের বাহ্যিক জৌলুসের চেয়ে শিক্ষকদের যোগ্যতা ও খোদাভীতির দিকে নজর দেওয়া জরুরি। রদ্দুল মুহতার নামে হানাফি ফিকহের একটি প্রামাণ্য গ্রন্থে লেখা হয়েছে, “অভিভাবকের দায়িত্ব হলো সন্তানের জন্য এমন একজন ধার্মিক ও প্রজ্ঞাবান শিক্ষক নির্বাচন করা, যিনি শুধু কিতাবই পড়াবেন না, বরং নিজের সুন্দর চরিত্রের মাধ্যমে সন্তানকে প্রভাবিত করবেন।” (ইবনে আবিদিন, রদ্দুল মুহতার আলাদ দুররিল মুখতার , ৬/৪২৭, দারুল ফিকর, বৈরুত, ১৯৯২)

৩. যেখানে ‘আদব’ শেখানো হয়: যে প্রতিষ্ঠানে শুধু তোতাপাখির মতো আরবি শব্দ মুখস্থ না করিয়ে বরং শিশুর চরিত্র, আদব বা শিষ্টাচার গঠনে জোর দেওয়া হয়, সেটিই আদর্শ। কারণ, আদব ছাড়া ইলম মূল্যহীন। পাশাপাশি সন্তানের প্রথম শিক্ষালয় হলো নিজের ঘর। ঘরের পরিবেশে যদি নামাজ ও ভালোবাসার চর্চা থাকে, তবে সেটিই সন্তানের জন্য সবচেয়ে বড় ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান।

৪. অনাবাসিক প্রতিষ্ঠান অনুসন্ধান: ছোট শিশুদের জন্য আবাসিক প্রতিষ্ঠান বাছাই না করাই শ্রেয়। মহানবী (সা.) থেকেও একই রকম একটি নির্দেশনা পাওয়া যায়। কয়েকজন কিশোর-তরুণ তাঁর কাছে ধর্মীয় শিক্ষার জন্য এলে তিনি তাদের সর্বোচ্চ ২০ দিন থাকার অনুমতি দিয়েছিলেন। এরপর পরিবারের প্রতি তাদের আকুলতা দেখে সস্নেহে বলেছিলেন, ‘তোমরা ফিরে যাও, পরিবারের সঙ্গে গিয়ে থাকো, তাদের ধর্মীয় শিক্ষা দাও এবং ভালো কাজের আদেশ দাও। আর আমাকে যেভাবে নামাজ পড়তে দেখেছ, ঠিক সেভাবে নামাজ আদায় করো।’ (সহিহ্ মুসলিম, হাদিস: ৬৩১)

৫. যাতায়াত সুবিধা: ছোট শিশুদের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাসা থেকে খুব বেশি দূরে হওয়া উচিত নয়। দীর্ঘ যানজট ও যাতায়াতের ক্লান্তি অনেক সময় শিশুর পড়াশোনার স্পৃহা নষ্ট করে দেয় এবং তাকে শারীরিকভাবে দুর্বল করে ফেলে।

অন্যদিকে, কিছু প্রতিষ্ঠান থেকে সন্তানকে দূরে রাখা প্রয়োজন। যেমন:

১. ভীতি সৃষ্টিকারী প্রতিষ্ঠান: এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক। পাঁচ বছরের কম বয়সী কোনো শিশু যদি শিক্ষালয়ে যেতে একেবারেই না চায়, প্রতিদিন সকালে কান্নাকাটি করে এবং এর ফলে সে বেশির ভাগ দিন ক্লাসে ‘গরহাজির’ বা অনুপস্থিত থাকে, তবে বুঝতে হবে সেই প্রতিষ্ঠানে শিশুটি মানসিক স্বস্তি পাচ্ছে না। অভিভাবকেরা অনেক সময় মনে করেন, ‘একটু বড় হলে ঠিক হয়ে যাবে’—এই আশায় জোর করে পাঠালে অবচেতন মনেই ইসলামের প্রতি শিশুর একধরনের নেতিবাচক ট্রমা তৈরি হয়ে যায়। এমন পরিস্থিতিতে জোরজবরদস্তি করা বোকামি; বরং তাকে সেখান থেকে সরিয়ে নেওয়াই যৌক্তিক সিদ্ধান্ত। সমাজবিজ্ঞানী ইবনে খালদুন লিখেছেন, “শিক্ষাদানে অতিরিক্ত কঠোরতা ও জবরদস্তি শিশুর স্বতঃস্ফূর্ততা ও সৃজনশীলতা নষ্ট করে দেয়; শাস্তির ভয়ে শিশু মিথ্যা বলতে শেখে এবং তার আত্মমর্যাদাবোধ ধ্বংস হয়ে যায়।” (ইবনে খালদুন, আল-মুকাদ্দিমা , পৃষ্ঠা ৫৪১, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ১৯৯৩)

২. অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগকারী জায়গা: অনেক প্রতিষ্ঠান ছোট শিশুদের ওপর তাদের বয়সের তুলনায় অতিরিক্ত সিলেবাস ও আমলের চাপ চাপিয়ে দেয়। একটি ছোট শিশু দীর্ঘক্ষণ মনোযোগ ধরে রাখতে পারে না, এটাই তার স্বভাবজাত প্রবৃত্তি। হানাফি ফিকহের নির্ভরযোগ্য ফতোয়াগ্রন্থে স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে যে, “শিশুদের ওপর এমন কোনো শারীরিক বা মানসিক চাপ বা কঠোরতা আরোপ করা যাবে না, যা তাদের ধারণক্ষমতার বাইরে। কারণ ইসলাম শিশুদের ওপর কোনো বাধ্যবাধকতা আরোপ করেনি।” ( আল-ফতোয়া আল-হিন্দিয়া , ৫/৩৫৬, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ২০০০) অতিরিক্ত চাপ শিশুকে ধর্মের প্রতি বীতশ্রদ্ধ করে তোলে।

৩. শুধু বাহ্যিক আমলসর্বস্ব রুক্ষ পরিবেশ: যেখানে শুধু বাহ্যিক ইবাদত (যেমন—পোশাক বা নিয়মের কড়াকড়ি) নিশ্চিত করতে গিয়ে শিশুদের সঙ্গে রূঢ় আচরণ করা হয়, সেখান থেকে সন্তানকে দূরে রাখা আবশ্যক। রাসুল (সা.) শিশুদের সঙ্গে কখনোই রূঢ় আচরণ করতেন না; বরং তাঁরা নামাজরত অবস্থায় তাঁর পিঠে উঠে গেলেও তিনি সিজদা দীর্ঘ করতেন, যেন তাঁরা বিরক্ত না হন। যে প্রতিষ্ঠানে এই নববী মমতার চর্চা নেই, সেখানে শিশুর কোমল হৃদয় বিকশিত হতে পারে না।

সন্তানকে মাদ্রাসায় ভর্তি করেই অভিভাবকের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। প্রতিদিন সে কী শিখছে, শিক্ষকের আচরণে সে আনন্দিত নাকি ভীত—সে বিষয়ে নিয়মিত খোঁজ নিতে হবে। যদি দেখা যায় শিশু কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানে খাপ খাওয়াতে পারছে না বা বারবার ক্লাস ফাঁকি দিচ্ছে, তবে তাকে বকাঝকা না করে তার মানসিক অবস্থা বোঝার চেষ্টা করতে হবে। প্রয়োজনে কিছুদিন বিরতি দিয়ে বা ভিন্ন কোনো আনন্দদায়ক মাধ্যমে (যেমন—বাসায় বসে মমতাময়ী কোনো গৃহশিক্ষকের মাধ্যমে) তার ধর্মীয় শিক্ষার সূচনা করা যেতে পারে।

ধর্মীয় শিক্ষা দেওয়া মানে শুধু কিছু আরবি শব্দ মুখস্থ করানো নয়; বরং মহান আল্লাহর প্রতি শিশুর অন্তরে অকৃত্রিম ভালোবাসা তৈরি করা। একটি ভুল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা রুক্ষ পরিবেশ একটি শিশুকে চিরজীবনের জন্য ধর্মবিমুখ করে দিতে পারে।