আজ ২৪ অক্টোবর, বিশ্বব্যাপী পালিত হচ্ছে ‘বিশ্ব পোলিও দিবস’। পৃথিবী থেকে পোলিও রোগকে সম্পূর্ণভাবে নির্মূল করা এবং একটি পোলিওমুক্ত ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করাই এই বিশেষ দিবসের প্রধান লক্ষ্য।

চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় পোলিওমায়েলাইটিস বা সংক্ষেপে পোলিও হলো একটি ভাইরাসজনিত সংক্রামক রোগ। পোলিওমায়েলাইটিসের টিকা আবিষ্কারক জোনাস সালকের জন্মবার্ষিকীর স্মৃতি স্মরণে প্রতি বছর সারা বিশ্বে এই দিবসটি পালন করা হয়।

মূলত পোলিও রোগ নির্মূলের প্রচেষ্টা এবং এই বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরির লক্ষ্যেই এই দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। উল্লেখ্য যে, পোলিও রোগের কোনো নির্দিষ্ট নিরাময় বা ওষুধ নেই; তাই এই ভয়াবহ রোগ থেকে বাঁচার একমাত্র কার্যকর উপায় হলো সঠিক সময়ে টিকা গ্রহণ করা।

বিশ্ব পোলিও দিবস ২০২৬-এর মূল প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘এক দিন, এক লক্ষ্য: চিরতরে পোলিও নির্মূল’। পোলিও রোগের ভয়াবহতা সম্পর্কে মানুষকে জানানো এবং রোগ প্রতিরোধে টিকাদানের গুরুত্ব সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করাই এই বছরের মূল উদ্দেশ্য।

ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ১৯৮৫ সালে রোটারি ইন্টারন্যাশনাল কর্তৃক বিশ্ব পোলিও দিবস প্রতিষ্ঠা করা হয়। পরবর্তীতে ১৯৮৮ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, রোটারি ইন্টারন্যাশনাল এবং ইউনিসেফের যৌথ সহযোগিতায় বিশ্বব্যাপী পোলিও নির্মূল উদ্যোগের সূচনা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০০২ সালে ইউরোপীয় অঞ্চলকে পোলিওমুক্ত ঘোষণা করেছিল এবং তারপর থেকে তারা এই মর্যাদা ধরে রেখেছে।

১৯৫০-এর দশকে প্রতি বছর সারা বিশ্বে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ পোলিওতে আক্রান্ত হয়ে মারা যেত অথবা পঙ্গু হয়ে যেত। তবে বর্তমানে ব্যাপক টিকাদান কর্মসূচির ফলে এই রোগের প্রকোপ অনেক কমে এসেছে। বর্তমানে পোলিও ভাইরাস কেবল আফগানিস্তান ও পাকিস্তান—এই দুটি দেশেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। যদিও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে মাঝেমধ্যেই এই রোগের প্রাদুর্ভাব লক্ষ্য করা যায়।

বাংলাদেশে ১৯৭৯ সাল থেকে পোলিও টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়। দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর ২০১৪ সালের ২৭ মার্চ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশকে পোলিওমুক্ত দেশ হিসেবে ঘোষণা করে।

স্বস্তির বিষয় হলো, ২০০৬ সালের পর থেকে বাংলাদেশে বন্য পোলিওভাইরাসের কোনো রোগী শনাক্ত হয়নি। বাংলাদেশ তখন থেকেই পোলিওমুক্ত অবস্থান বজায় রেখেছে। বাংলাদেশ সরকারের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই)-এর আওতায় শিশুদের সম্পূর্ণ বিনামূল্যে পোলিওসহ বিভিন্ন জীবনরক্ষাকারী টিকা প্রদান করা হচ্ছে।

তবে গত কয়েক বছর ধরে পোলিওভাইরাসের সংক্রমণ শনাক্ত না হলেও ঝুঁকি পুরোপুরি কাটেনি। কারণ প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তান ও আফগানিস্তানে পোলিওভাইরাসের সংক্রমণ এখনো অব্যাহত রয়েছে। এছাড়া নিয়মিত টিকাদানের আওতার বাইরে থেকে যাচ্ছে অনেক শিশু, যা উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের অভিমত অনুযায়ী, পোলিও নির্মূলের চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জন করতে হলে শুধু জাতীয় পর্যায়ে টিকাদানের উচ্চহার বজায় রাখলেই চলবে না, বরং প্রতিটি শিশুকে অবশ্যই টিকার আওতায় আনতে হবে।

পোলিও নির্মূলের জন্য প্রতিটি শিশুর কাছে টিকা পৌঁছে দেওয়া এবং সম্ভাব্য সংক্রমণ দ্রুত শনাক্ত করা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে দুর্গম ও সুবিধাবঞ্চিত এলাকার শিশুদের টিকার আওতায় আনতে স্বাস্থ্যকর্মী, অভিভাবক, স্বেচ্ছাসেবক ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রয়োজন বলে মনে করা হচ্ছে।