ইন্দোনেশিয়া বর্তমানে এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ দাবানলের কবলে পড়েছে। গবেষকদের মতে, এই আগুনের তীব্র তাপ এবং সৃষ্ট ধোঁয়ার কারণে দেশটির সুলাওয়েসি দ্বীপে সংরক্ষিত ৬৭ হাজার বছরেরও বেশি পুরোনো প্রাগৈতিহাসিক গুহাচিত্রগুলো দ্রুত নষ্ট হয়ে যাওয়ার চরম ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
তীব্র এল নিনো প্রভাবের ফলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং বৃষ্টিপাতের পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় বন ও পিটল্যান্ডগুলো (জলাভূমির মতো জৈব মাটির এলাকা) আগুনের মুখে পড়েছে। ফলে ২০১৫ সালের পর এবার সবচেয়ে তীব্র দাবানলের মুখোমুখি হয়েছে দেশটি।
এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে সুমাত্রা ও বোর্নিও দ্বীপ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও আগুন সুলাওয়েসি দ্বীপেও ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে দক্ষিণ সুলাওয়েসিতে আগুনের প্রকোপ বেড়েছে, যেখানে চুনাপাথরের গুহাগুলোর ভেতরে বিশ্বের প্রাচীনতম প্রাগৈতিহাসিক শিল্পকর্মগুলো সংরক্ষিত রয়েছে।
দক্ষিণ সুলাওয়েসির মারোস-পাংকেপের একটি গুহায় মানুষের আকৃতি এবং একটি শূকরের ছবি পাওয়া গেছে। অস্ট্রেলিয়ার গ্রিফিথ ইউনিভার্সিটির গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, এই শিল্পকর্মগুলো অন্তত ৫১ হাজার ২০০ বছরের পুরোনো। এছাড়া সুলাওয়েসি উপকূলের মুনা দ্বীপের একটি গুহায় লালচে রঙের হাতের ছাপের খোঁজ মিলেছে, যা অন্তত ৬৭ হাজার ৮০০ বছরের পুরোনো বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মারোস-পাংকেপ গুহার নিকটবর্তী এলাকায় আগুন নেভানোর জন্য নিরলস কাজ করেছেন অগ্নিনির্বাপণকর্মীরা। গুহাটির চারপাশের ন্যাশনাল পার্ক ও ইউনেসকো গ্লোবাল জিওপার্কের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো এর অনন্য কার্স্ট (চুনাপাথরের) ভূমিরূপ। এই ভূমিরূপের ওপর দিয়ে আগুনের কালো ধোঁয়া দেখা গেছে বলে জানা গেছে।
অগ্নিনির্বাপণকর্মী মুহাম্মদ ইকফার জানান, চলতি মাসের শুরুর দিকে ওই নির্দিষ্ট এলাকার কাছে এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে আগুন জ্বলছিল। তিনি বলেন, “আগুন গুহার ৮০০ মিটারের (২ হাজার ৬২৫ ফুট) মধ্যে চলে এসেছিল।”
ইকফার আরও জানান, গত ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে ১৮ অক্টোবরের মধ্যবর্তী সময়ে ন্যাশনাল পার্কটির ২৭০ হেক্টরের (৬৬৭ একর) বেশি এলাকা আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।
গ্রিফিথ ইউনিভার্সিটির প্রত্নতত্ত্ববিদ বাসরান বুরহান সতর্ক করে বলেন, এই দুর্যোগের প্রথম ও সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক প্রভাব হলো তাপ। তিনি জানান, আগুন সরাসরি গুহাচিত্রগুলোতে না লাগলেও তা সেগুলোকে নষ্ট করে দিতে পারে। কারণ, আগুনের তাপে চিত্রগুলোর চারপাশের তাপমাত্রা পরিবর্তিত হয় এবং ক্ষয়ের প্রক্রিয়া আরও ত্বরান্বিত হয়।
এছাড়া আগুনের ধোঁয়ার কারণে গুহাচিত্রের ওপর কালির স্তর তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বুরহান আরও বলেন, “এগুলো গুহাচিত্রের ওপর কালির স্তর তৈরি করে সেগুলোকে ঢেকে দেয়। ফলে চিত্রগুলো ঘোলাটে হয়ে যাবে এবং সেগুলো চেনা কঠিন হয়ে পড়বে।”
ইকফারের দেওয়া তথ্যমতে, গত বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার পার্কের অন্যান্য অংশে আগুন নেভানোর কাজ চালিয়ে গেছেন অগ্নিনির্বাপণকর্মীরা। তিনি আরও জানান, আবহাওয়া অত্যন্ত শুষ্ক এবং এখন পর্যন্ত কোনো বৃষ্টি হয়নি।
বুরহান অত্যন্ত উদ্বেগের সাথে বলেন, “আমরা দ্রুত এ বিষয়ে কিছু না করলে, এ ঘটনার প্রভাব কমাতে কৌশলগত কোনো ব্যবস্থা নেওয়া না হলে মারোস-পাংকেপে থাকা মানব ইতিহাসের অন্যতম বিস্ময়কর প্রমাণটি আমরা হারাব।” তিনি আরও যোগ করেন, “আর সেটি হবে সবচেয়ে লজ্জার বিষয়।”