জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নতুন কমিটি গঠন করা হয়েছে জামায়াতে ইসলামীর অনুমোদনেই বলে দাবি করেছেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খান। বৃহস্পতিবার (২৩ অক্টোবর) বিকেলে ঝিনাইদহ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটে এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে তিনি এই মন্তব্য করেন।

রাশেদ খান বলেন, “এনসিপি নতুন বন্দোবস্তের স্বপ্ন দেখিয়ে শেষ পর্যন্ত জামায়াতের প্রক্সি সংগঠন হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। কাউন্সিল ছাড়াই কমিটি গঠন, জামায়াতের প্রতি অনুগত ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ পদে রাখা এবং ভিন্নমতাবলম্বীদের অবমূল্যায়নের মাধ্যমে দলটির সাংগঠনিক দুর্বলতা ও নেতৃত্ব কুক্ষিগত করার প্রবণতা প্রকাশ পেয়েছে।”

তিনি অভিযোগ করেন যে, এনসিপির এই নতুন কমিটিতে এমন ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে যারা ছাগলচুরি, ল্যাপটপ চুরি, নারী ও আর্থিক কেলেঙ্কারির অভিযোগে অভিযুক্ত এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় যাদের ভূমিকা বিতর্কিত ছিল। অন্যদিকে, দলটির ভেতরে যারা স্বতন্ত্র রাজনীতির স্বপ্ন দেখেন কিংবা জামায়াতের রাজনীতির বিরোধিতা করেন, তাদের হয় পদাবনতি করা হয়েছে অথবা কমিটিতে কোনো স্থান দেওয়া হয়নি। রাশেদ খানের দাবি, পুরো প্রক্রিয়াটি জামায়াতের অনুমোদনেই সম্পন্ন হয়েছে।

গণতন্ত্রের কথা বলে এনসিপি যে নতুন বন্দোবস্তের স্বপ্ন দেখিয়েছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি। রাশেদ খান বলেন, “অনেক আশা জাগিয়ে নতুন বন্দোবস্তের স্বপ্ন দেখিয়েছিল এনসিপি। কিন্তু গণতন্ত্রের কথা বলা দলটি একটি কাউন্সিল পর্যন্ত না করে নতুন কমিটি করেছে। এর চেয়ে বড় লজ্জার বিষয় আর কী হতে পারে? নতুন কমিটির ধরন দেখে মনে হয়েছে, কিছু আসন ও আসনপ্রতি নির্বাচনি খরচের বিনিময়ে এনসিপি পুরোপুরি জামায়াতের কাছে বিক্রি হয়ে গেছে।”

এনসিপির আদর্শিক অবস্থান নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে তিনি বলেন, দলটি গণঅভ্যুত্থানের আদর্শ ধারণ করে স্বতন্ত্র রাজনীতি করবে নাকি জামায়াতের আদর্শ মেনে তাদের যুব সংগঠন হিসেবে কাজ করবে, তা এখনও অস্পষ্ট। তার মতে, যে দলের নিজস্ব আদর্শ ও রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে এমন অস্পষ্টতা থাকে, ভবিষ্যতে সেই দল কোন পথে এগোবে তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে সন্দেহ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।

আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে যে রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা পূরণে এনসিপি নতুন ধারার রাজনীতি উপহার দিতে পারত বলে মনে করেন রাশেদ খান। তবে নতুন কমিটি গঠনের মাধ্যমে দলটি সেই সম্ভাবনা নষ্ট করেছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। তিনি মনে করেন, জামায়াতের ছায়াতলে থেকে এনসিপির পক্ষে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি স্বতন্ত্র ও শক্তিশালী দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়া অত্যন্ত কঠিন হবে।

দলটির গঠনতন্ত্রের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী বলেন, এনসিপির নিয়ম অনুযায়ী সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে দুই মেয়াদের বেশি থাকার সুযোগ নেই। এই প্রেক্ষিতে তিনি প্রশ্ন তোলেন, নাহিদ ইসলাম ও আখতার হোসেনের বর্তমান মেয়াদই শেষ মেয়াদ হবে কি না। তিনি আরও বলেন, নতুন বন্দোবস্তের নামে দলটি শেষ পর্যন্ত নতুন ভণ্ডামির পথে এগোচ্ছে কি না, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।

পাশাপাশি জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতির তীব্র সমালোচনা করেন রাশেদ খান। তিনি বলেন, ইসলামের নামে রাজনীতি করে একদিকে শরিয়াহ আইন প্রতিষ্ঠার বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে, অন্যদিকে দলটির গঠনতন্ত্রে ক্ষমতায় গেলে শরিয়াহ আইন প্রতিষ্ঠার কথা উল্লেখ রয়েছে। তার ভাষ্যমতে, ক্ষমতায় যাওয়ার স্বার্থে নিজেদের ঘোষিত আদর্শ থেকে সরে আসার এই প্রবণতা রাজনৈতিক দ্বিচারিতার পরিচয় বহন করে।

নির্বাচনের আগে জান্নাতের টিকিট দেওয়ার প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে মুসলমানদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছে জামায়াত বলে অভিযোগ করেন তিনি। একইভাবে, সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সমর্থন পেতে অতীতে ‘হিন্দু মানেই নৌকা, এবার হবে হিন্দু মানেই দাঁড়িপাল্লা’ এমন বক্তব্যের মাধ্যমে তাদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করা হয়েছিল। এই প্রসঙ্গে তিনি কৃষ্ণ নন্দীকে মনোনয়ন দেওয়ার বিষয়টিও উল্লেখ করেন। তবে দাবি করেন, এসব প্রচেষ্টায় বাংলাদেশের মানুষ বিভ্রান্ত হননি।

রাশেদ খান বলেন, মানুষ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস রেখে বিএনপির নির্বাচনি প্রতীক ধানের শীষে ভোট দিয়েছেন। জামায়াতের রাজনৈতিক কৌশল সম্পর্কে মানুষ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন।

পরিশেষে, এনসিপির নতুন কমিটি গঠনকে দলটির স্বতন্ত্র রাজনৈতিক পরিচয়ের জন্য একটি বড় ধাক্কা হিসেবে দেখছেন রাশেদ খান। তার মতে, জামায়াতের প্রভাব থেকে বেরিয়ে এসে গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা ও নিজস্ব আদর্শের ভিত্তিতে রাজনীতি করতে না পারলে এনসিপির পক্ষে দেশের রাজনীতিতে শক্ত অবস্থান তৈরি করা সম্ভব হবে না।